আজকের বার্তা | logo

১৭ই চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ৩০শে মার্চ, ২০২০ ইং

রঙ বেরঙের ফুলে ফুলে সুশোভিত অলঙ্কারকাঠি গ্রাম…

রঙ বেরঙের ফুলে ফুলে সুশোভিত অলঙ্কারকাঠি গ্রাম…

ফুল সৌন্দর্য ও পবিত্রতার প্রতীক। ফুলকে কে না ভালোবাসে। আর সেই ফুলের চাদরে পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির অলঙ্কারকাঠি গ্রামটি ঢাকা পড়েছে। এ যেন রঙ বেরঙের ফুলে ফুলে সুশোভিত এক গ্রাম। চোখ ধাঁধিয়ে দেয় নানা রং-বেরংয়ের ফুল।আর এটাই এখন শুধু অলঙ্কারকাঠীর অলঙ্কার নয়,সারা দেশের অলঙ্কারে রূপ নিয়েছে।দেখে মনে হবে যেন ফুলের চাদরে ঢাকা পড়েছে এই গ্রামটি। সারি সারি হলুদ, টকটকে লাল, কমলা ও সাদা রং-বেরংয়ের ফুলে ফুলে ভরে গেছে স্বরূপকাঠীর নার্সারিগুলো। যার আনন্দ অন্য কিছুর সঙ্গে মেলা ভার। নয়নাভিরাম এ ফুল দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি তার মন মাতানো সুবাস দেহমন জুড়িয়ে দেয়।

স্বরূপকাঠি-বানারীপাড়া- বরিশালের সড়কের পাশে অলংকারকাঠি গ্রামে যতদুর চোখ যায় সর্বত্রই দেখা যায় নানা রং-বেরংয়ের ফুলের সমাহার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তিন’শত বছর পূর্বে ফুলের সুচনা ঘটলেও এ অ লে ফুলের বাণিজ্যিকভাবে আবাদ শুরু হয় প্রায় অর্ধশত বছর আগে।ওই সময় থেকে স্বরূপকাঠি উপজেলার আকলম, অলংকারকাঠি, কুনিয়ারী, সুলতানপুর, পানাউল্লাপুর,সংগীতকাঠি ও আরামকাঠিসহ ১০ থেকে ১২ টি গ্রামে বানিজ্যিকভাবে নানা প্রজাতির ফুলের চাষ হচ্ছে। অন্য ফসলের চেয়ে অধিক লাভের আশায় প্রতিদিন বাড়ছে ফুলের আবাদ, বাড়ছে ফুল চাষী, গ্রামকে-গ্রাম ছড়িয়ে পড়ছে ফুলের আবাদ।

এ উপজেলায় ১৫৩ হেক্টর জমিতে প্রায় দু’ শতাধিক নার্সারিতে ১০ হাজারের অধিক শ্রমজীবী নারী-পুরুষ ফুল চাষে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছেন।এখানকার বসতি চাষীরা প্রায় ৬০-৭০ বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের বনজ,ফলদ ও ঔষধি গাছের চারার কলম উৎপাদন করে আসছেন।ফুলচাষের পাশাপাশি বাগানের চারপাশের কান্দিতে বনজ,ফলদ ও ঔষধি চারাগুলো ভরা। সরেজমিনে নার্সারিগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, অলংকারকাঠী ব্রিজ থেকে উত্তর শর্ষিনা পর্যন্ত সড়কের দু’ধারে প্রায় ৪০০ বিঘা জমিতে গড়ে ওঠা শতাধিক নার্সারিতে চারা উৎপাদনের ধুম পড়েছে।একই সঙ্গে জমে ওঠেছে ফুলের চারা কেনা বেচা। তিনটি গ্রাম নিয়ে ওই পল্লী গড়ে উঠলেও এরই মধ্যে অলংকারকাঠী নামেই পরিচিতি লাভ করেছে অনেক বেশি । কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করে দিয়েছে নার্সারি গ্রাম অলংকারকাঠী।ওই পল্লীতে সকাল সন্ধ্যা লেগে থাকে ফুল প্রেমী দর্শনার্থীদের উপচে’পড়া ভিড়। যা একবার দেখলে বার বার ছুটে যেতে মন চায় । তাই তো বিভিন্ন এলাকা থেকে ফুলের সৌন্দর্য্য ও সৌরভ উপভোগ করতে এখানে দর্শনার্থীরা বারে বারে ছুটে আসেন। ২০০২ সালে অলংকারকাঠী বেইলি ব্রিজের পশ্চিম পাড়ে কৃষ্ণকাঠীর একখন্ড জমি নিয়ে পানাউল­াপুরের মো. শাহাদাৎ হোসেন প্রতিষ্ঠা করেন বৈশাখী নার্সারি। এর কয়েক বছর পর জাহিদুল ইসলাম পলাশ প্রতিষ্ঠা করেন ছারছীনা নার্সারি। একই সময় গড়ে ওঠে তৌহিদের আশা নার্সারি।

এক এক করতে করতে বর্তমানে ওই সড়কের দু’কিলোমিটারের মধ্যে সড়কের দুই ধারে কোহিনুর নার্সারি, আশা নার্সারি, নিরব নার্সারি, রুবেল নার্সারি, নেছারাবাদ নার্সারি, আদর্শ নার্সারি, ফারিয়া নার্সারি, নেছারিয়া নার্সারিসহ নানা নামের নার্সারি গড়ে উঠেছে। ওইসব নার্সারির মধ্যে রয়েছে স্বরূপকাঠির নার্সারি জগতের পুরোধা আব্দুল হাকিম ও হাচেন আলীর ছেলেদের একাধিক নার্সারি। এক এক করে ওই এলাকায় গড়ে ওঠেছে শতাধিক নার্সারি। এর মধ্যে একই নামে আট বিঘা জমিতে পলাশের দুইটি নার্সারি রয়েছে। ওইসব নার্সারি থেকে প্রতিদিন কয়েক লক্ষ টাকার ফুলের চারা ও বিভিন্ন গাছ-গাছালির চারা দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যায়। বিভিন্ন এলাকার শতশত মানুষ তার নিজের বা সরকারি ঠিকাদারী কাজে সরবরাহের জন্য চারা কলম কিনে নেন। শীত মৌসুম চলে শুধুই ফুলের চারা কলম। ছারছীনা নার্সারি মালিক পলাশ ও আশা নার্সারির তৌহিদ বলেন, বর্তমান বছরে এখানের নার্সারি গুলোতে বিভিন্ন প্রজাতি ও রঙের গোলাপ ছাড়াও ডালিয়া, গাঁদা, বেলী, গ্লাডিওলাস,গোলাপ, রজনীগন্ধা, টিউলিপ, অ্যাস্টার গোলাপ,কলাবতী, জুই, ডেইজি, ডায়াস্থান, জিনিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, পদ্ম, কারনেশন, কসমস, প্যানজি, সূর্যসুখী, স্টারপিটুনিয়া, পপি, অর্কিড়, সিলভিয়া, ভারবেন, লুপিংস, ফ্লক্স, পর্টুলেকা, এন্টিরিনাম লুপিংস, মনিং, ক্যালেন্ডলা, গ্লোরি, সুইটপি, ন্যাস্টারশিয়াম, হলিংকস, জারবেরা ও অ্যাজালিয়া সহ শতাধিক ফুলের চারা পাওয়া যায়।

সৌন্দর্য্যের প্রতীক ফুলের জীবনকাল ক্ষীন হলেও বিশ^জুড়ে রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় দিবসগুলোতে ফুলের শোভাবর্ধন ছাড়া সম্ভাব হয় না। কোনো-কোনো ফুলগাছ ফুলফোটার ৪১দিনের মধ্যে গাছটি মরে যায়, আবার অনেক ফুল গাছের জীবনকাল থাকে প্রায় আড়াই বছর।তবে ফুল শুধূ সৌন্দর্য্যরে শোভাবর্ধন করে না এটি দেশের অর্থকারী ফসলও বটে। মৌমাছি ফুল থেকে মধূ সংগ্রহ, ঔষুধী ফুল থেকে ঔষুধ তৈরী, সূর্যমুখী ফুল থেকে সুগন্ধী তৈল উৎপাদন, টিউলিপ ও অ্যাস্টার ফুল দ্বারা বিভিন্ন ধরনে মূল্যবান সেন্ট তৈরী, সু-গন্ধযুক্ত ফুলের নির্যাস থেকে উন্নতমানের পারফিউম, সেন্ট ও আতর ইত্যাদি তৈরীর প্রায় শতাধিক শিল্পকারখানা দেশে গড়ে উঠায় অর্ধ লক্ষাধিক শ্রমজীবী মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছে।

সারাদেশে ফুল সংশ্লিষ্ট এ সব পণ্য বর্হিবিশ্বে রপ্তানি করে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সারা দেশে প্রায় ৪৯ কোটি টাকার সমমুল্যের মুদ্রা অর্জন করছে বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর সুত্রে জানা যায়, এছাড়াও ফুল চাষের মাধ্যমে ফুল চাষী, ফুল বিক্রিতা, ফুল দোকানী , বড় ব্যবসায়ী, রপ্তানী ব্যবসায়ী, ফুল দ্বারা বিভিন্ন শিল্পকারখানার পণ্য উৎপাদনের শ্রমিক সংখ্যাও প্রায় অর্ধলক্ষ।কৃষি প্রধান দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্র অর্জনের আর একটি সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে এই ফুল চাষ। ফুলঅতীত কালে কেবল মানুষের মনের ক্ষুধা মেটালেও আজকের দিনে ফুল থেকে উপর্জিত টাকা দিয়ে অনেকেরই পেটের ক্ষুধাও মিটাচ্ছেন।

২১ ফেব্রুয়ারী আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস, ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস,২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন, ১৪ ফেব্রুয়ারী ভ্যালেনটাইনস ডে (বিশ্ব ভালোবাসা দিবস) ও বিয়ে সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অ লেও রপ্তানী করা হয় এখানকার ফুল। এক একটি ফুলের চারার দাম ৫ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। নাইট কুইনসহ আরো উন্নত জাতের ফুলের চারা পাওয়া যায় ওইসব নার্সারিতে।

এছাড়াও ওই সড়কের জগৎপট্টি এলাকায় রয়েছে আরো ৫ টি নার্সারি। নার্সারি মালিক শাহাদাৎ হোসেন ও পলাশ জানান, ঢাকার বীজ বিক্রির দোকান ও বিভিন্ন কোম্পানির এজেন্টদের কাছ থেকে বীজ কিনে আশ্বিন মাসে বীজতলা করে বীজ বপন করতে হয়। ১৫/২০ দিন পর চারা গজালে পলিথিন প্যাকেটে স্থাপন করে পানি ও ঔষধ দিতে হয়। ওইসব গাছে অগ্রহায়ণ মাসে ফুল আসতে শুরু করে। চৈত্র মাস পর্যন্ত ফুলের ভরা মৌসুম। ভূমি চাষ থেকে শুরু করে বিক্রি পর্যন্ত মালিক তার নিজস্ব অর্থ ব্যয়ে শ্রমিক, ঔষধ পানির ব্যবস্থা করেন। এজন্য প্রতিটি নার্সারিতে ১০ থেকে ১৫ জন করে শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করে। এসব নার্সারিতে পুরুষের পাশাপাশি নারী শ্রমিকরাও সমানতালে কাজ করে। মহিলাদের ৩০০ টাকা ও পুরুষ শ্রমিকদের ৫০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হয়। সবগুলো নার্সারিতে মাসিক বেতনে বাৎসরিক কর্মচারী রয়েছে।

নার্সারি মালিকরা জানান, ফুলের চারা কলমে নার্সারিতে সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে তিন থেকে দশ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। এত ব্যাপক ফুলের সমাহার দেখে প্রতিটি নার্সারিতে দর্শনার্থীদের প্রচন্ড ভিড় হয়। যা সামাল দিতে মালিকদের হিমশিম খেতে হয়। নার্সারি মালিকরা অনেকে লিখে রেখেছেন এই এলাকায় প্রবেশ, ছবি তোলা বা ফুল ছেড়া নিষেধ। নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা উপেক্ষা করে প্রতিদিন শত শত ফুল নিয়ে যায় ও নষ্ট করে ফেলে দর্শনার্থীরা। নার্সারিতে কাজ করা নারী শ্রমিক কোহিনুর বেগম ও মারুফা বেগম জানান নার্সারিগুলোতে শতাধিক নারী কাজ করেন। স্বামীর রোজগারের সঙ্গে তাদের আয় মিলিয়ে বেশ ভালই কাটছে তাদের জীবন। মালিকরা শ্রমিকদের প্রতি ভাল নজর দেন। তাদের সুখ-দুঃখ দেখেন।

স্থানীয়রা জানান পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ওই পল্লীটি একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হবে। আর এ চাষের প্রসারতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি করেছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানিয়েছে এ শিল্পকে আরও বিকশিত করার জন্য কৃষি অধিদফতরের পক্ষ থেকে সকল ধরনের সহযোগীতা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে নার্সারি মালিকরা যাতে স্বল্প সুদে ঋন পায় তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।

Share Button


দৈনিক আজকের বার্তা

প্রকাশক: মেহেরুন্নেসা বেগম
সম্পাদক: কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল

যোগাযোগ

ঠিকানা: ৫২৫ ফজলুল হক এভিনিউ (কাকলীর মোড়), বরিশাল।
বাণিজ্যিক বিভাগ: 043163954
মোবাইল: 01916582339

Website Design & Developed By

আজকের বার্তার প্রকাশিত-প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।