মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চান ক্যান্সার আক্রান্ত জব্বার খান

প্রকাশিত: ৩:৪৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২১

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সাবেক আনসার সদস্য আব্দুল জব্বার খান। দেশের স্বাধীনতা অর্জনে প্রাণপণ লড়াই করেন তিনি। কিন্তু সেই জব্বারের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও। মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়ে বছরের পর বছর বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও উপায় হায়নি তার। বরং মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম লেখাতে গিয়ে বার বারই প্রতারণার শিকার হয়েছেন তিনি।

এখন জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে এক বারের জন্য হলেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেতে চান বরিশাল সদর উপজেলার কাশীপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডস্থ পূর্ব বিল্ববাড়ী এলাকার মৃত আবদুল করিম খানের ছেলে দূরারোগ্যব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে শেষ হতে চলা ৮৫ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল জব্বার খান। এজন্য প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন ৭১’র রণাঙ্গনের সৈনিক জব্বার খান।

 

জানা গেছে, ‘১৯৩৭ সনে কাশীপুরের বিল্ববাড়িতে জন্ম নেয়া আব্দুল জব্বার ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সদ্য বিয়ে করা স্ত্রী সেতারা বেগমকে রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যুদ্ধ চলাকালে ৯ নম্বর সেক্টরের অধীন বরিশালের বাবুগঞ্জ বোর্ড স্কুল, রায় বাড়ী ক্যাম্পে ছিলেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতিচারণ করে আব্দুল জব্বার খান বলেন, ‘তখন আমার কেবল বিয়ে হয়েছে। নতুন বৌকে ঘরে রেখে এক পোশাকে যুদ্ধে চলে যাই। তখন ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর এম.এ. জলিল। সাব সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপটেন ওমর এবং যুদ্ধকালীন কমান্ডার ছিলেন জল কাদের মোল্লা। বাবুগঞ্জের ওহাব খান, মজিদ খানদের সাথে আমি যুদ্ধ করেছিলাম। না খেয়ে, না ঘুমিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলাম। অথচ আজ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারাই অবহেলিত হচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সনদ থাকতেও স্বীকৃতি পাচ্ছেন না।

 

তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘যুদ্ধ শেষে আমাকে একটি সনদও দেয়া হয়েছে। যা এখনো আমার কাছে সযতেœ আছে। অস্ত্র জমা দেয়ার সনদ আছে। অথচ স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাইনি। স্বীকৃতির জন্য কতজনের কাছেই ধর্না ধরেছি। মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম উঠিয়ে দিবে বলে অনেকে টাকাও নিয়েছে। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। বরং আজ দূরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হচ্ছে।

আব্দুল জব্বার খানের স্ত্রী সেতারা বেগম বলেন, ‘যুদ্ধ যখন শুরু হয়েছে তখন আমি নতুন বৌ হয়ে এই বাড়িতে এসেছি। আমরা স্বামী আমাকে রেখে যুদ্ধে চলে যান। যুদ্ধকালীন এক কাপড়ে দিন কাটিয়েছি। মানুষের বাড়ি থেকে গম এনে সিদ্ধ করে ক্ষুধা মিটিয়েছি। দেশ স্বাধীনের পরে আমার স্বামী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোথাও গিয়ে নাম লেখাননি। আজ আমরা বড়ই অসহায়।

 

সেতারা বেগম বলেন, ‘উনি তো যুদ্ধ করেছেন, তার তো সব কাগজপত্রও আছে, তবে তিনি কেন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন না। সারা দেশে কেবল স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধারাই সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন। অথচ আমার স্বামী যুদ্ধ করেও আজ ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা অবস্থায় শয্যাশায়ী হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। ডাক্তার বলেছে তার নাকি ফুসফুসে ক্যান্সার হয়েছে। অর্থাভাবে তার চিকিৎসাও করাতে পারছি না। একমাত্র ছেলের উপার্জনে সংসারের ভরণ পোষণ হচ্ছে। আমরা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাসহ সরকারের কাছে সহযোগিতা চেয়ে অনুরোধ জানান তিনি।
নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলে গর্ব করে আব্দুল জব্বারের একমাত্র ছেলে মো. লিটন বলেন, ‘আমার বাবা একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আনসার বাহিনীতে চাকরি করতেন। বর্তমানে বাবার বয়স ৮৫ বছর। ২০১৭ সালে বরিশালে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইতে বাবার স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেছিলাম। সেখানে ‘ঘ’ শাখায় তার আবেদন জমা আছে। আমি নিজে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেছি। অনেকে বাবাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাইয়ে দেয়ার আশ^াস দিয়ে আমার কাছ থেকে অনেক টাকাও নিয়েছে। কিন্তু কাজ করে দেয়নি।

 

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। অথচ যারা যুদ্ধ করেননি তারা এবং তাদের সন্তানরা আজ মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করছেন। আমি পরিবার নিয়ে অসহায় জীবন যাপন করছি। আমি ঢাকায় একটি সিগারেট কোম্পানীর গাড়ি চালক। এখান থেকে যা উপার্জন তা দিয়ে নুন আনতে পানতা ফুরায়। ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা করানোর মতো টাকা আমার নাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমাদের দাবি জীবনে শেষ বারের জন্য হলেও বাবাকে বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিটুকু পাইয়ে দিক।
জানাগেছে, ‘আব্দুল জব্বার খান স্থানীয়ভাবে একজন আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলেন। বর্তমানে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হওয়ায় তার খোঁজ খবরও নিচ্ছেনা কেউ। চাকরির সুবাদে ছেলে ঢাকায় থাকায় জব্বার খান ও স্ত্রী সেতারা বেগম বাড়িতে একা থাকেন। সেই সুযোগে অসহায় এই পরিবারের বাড়িসহ অন্যান্য সম্পত্তি ক্রমশই বেদখল হয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা চেয়েছেন এ অসহায় দম্পতি।