আট মাসেও চালু হয়নি শেবাচিমের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট

প্রকাশিত: ১১:০২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৯, ২০২১

খান আব্বাস ॥ দীর্ঘ আট মাসেও চালু হয়নি দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগটি। বিভাগের প্রধান চিকিৎসকের মৃত্যুর পর গত বছরের জুন মাসে ইউনিটটি বন্ধ ঘোষণা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এরপর নতুন চিকিৎসক পদায়ন না হওয়ায় বিভাগটিতে রোগী ভর্তি এবং চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি তারা। বর্তমানে পুড়ে যাওয়া রোগীদের বিকল্প ব্যবস্থায় সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি রেখে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। আর সংকটাপন্ন রোগীদের পাঠানো হচ্ছে ঢাকায়।

 

এদিকে, বিগত আট মাস ধরে বিভাগটি বন্ধ থাকায় এ অঞ্চলে আগুনে পোড়া বা ঝলসে যাওয়া রোগীদের চিকিৎসা সেবায় বিঘ্ন ঘাটছে। অথচ বিভাগটি চালু করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জোরালো কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। তারা শুধুমাত্র মন্ত্রণালয়ের সাথে চিঠি চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

জানাগেছে, ২০১৫ সালের ১২ মার্চ আটটি শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করে বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটটি। বিভাগটিতে রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে ৮ জন চিকিৎসক ও নার্সদের ১৬টি পদ সৃষ্টি হয়। তাছাড়া পর্যায়ক্রমে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ৩২ শয্যায় উন্নীত করা হয় ইউনিটটি।

 

অপরদিকে, ইউনিটটি চালুর পরে সেখানে প্রশিক্ষিত নার্সের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা গেলেও পাঁচ বছরেও দূর করা যায়নি চিকিৎসক সংকট। শুরু থেকে একজন মাত্র সিনিয়র কনসালট্যান্ট দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছিল বিভাগটি। তিনিই ছিলেন ওই বিভাগটির বিভাগীয় প্রধান।

গত বছরের ২৬ এপ্রিল বরিশাল নগরীর কালীবাড়ি রোডে মমতা স্পেশালাইজড হসপিটাল নামক একটি বেসরকারি হাসপাতালের লিফটের নিচ থেকে সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. এম.এ আজাদ সজল নামের ওই চিকিৎসকের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর দু’মাস পরেই বন্ধ হয়ে যায় শেবাচিম হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটটি।
বিভাগটির দায়িত্বে থাকা সিনিয়র স্টাফ নার্সরা জানিয়েছেন, ডা. এম.এ আজাদ সজল এর মৃত্যুতে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটটি চিকিৎসক শূন্য হয়ে পড়ে। তার মধ্যেও মে মাস পর্যন্ত ওয়ার্ডটিতে রোগী ভর্তি করে সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকদের ডেকে এনে এবং অভিজ্ঞ নার্স দিয়ে চিকিৎসা করা হচ্ছিল।

 

কিন্তু এতে রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হচ্ছিল না। তাই জুন মাসের শুরুতে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সেই সাথে ওয়ার্ডটিতে ভর্তির উপযুক্ত রোগীদের বার্ন ইউনিটের পরিবর্তে সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করার জন্য নোটিশ প্রদান করেন হাসপাতাল পরিচালক। সেই থেকে সার্জারি ওয়ার্ডেই চলছে পুড়ে যাওয়া রোগীদের চিকিৎসা সেবা।

 

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় আগুনে পুড়ে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগী আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘আগুনে আমার ডান হাতের একাংশ পুড়ে গেছে। এখানে চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আমাদের ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা নিতে বলেছেন। কিন্তু ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ্য আমার নেই। তাই এখানে বসেই চিকিৎসা নিচ্ছি। এখন বাঁচা-মরা আল্লাহ’র হাতে।

 

আলাপকালে সার্জারি ওয়ার্ডের কয়েকজন চিকিৎসক ও নার্স বলেন, ‘বর্তমানে শীত মৌসুমে পোড়া রোগীর চাপ বেড়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিন দু-একজন রোগী আসছেই। কিন্তু সার্জারি ওয়ার্ডে বার্নের রোগীদের চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এসব রোগীর চিকিৎসার জন্য ভালো এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশের প্রয়োজন। যা সার্জারি ওয়ার্ডে বজায় রাখা সম্ভব নয়। এ কারণে বেশিরভাগ পোড়া রোগীকে এখানে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে।

 

বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সাবেক ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স লিংকন দত্ত জানান, ‘চিকিৎসক না থাকার কারণে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটটি আপাতত বন্ধ রয়েছে। এ বিভাগের রোগীদের এখন সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। এই বার্ন ইউনিটে যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা এখন ওই ইউনিটের মালামাল পাহারা দিচ্ছেন।

 

বিভাগটির বর্তমান ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স লাকি আক্তার বলেন, ‘চিকিৎসক সংকটের কারণে বিভাগটিতে রোগী ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আদৌ বিভাগটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি অবগত নই। পরিচালক স্যার ভালো বলতে পারবেন।

 

বক্তব্য জানতে হাসপাতাল পরিচালক ডা. মো. বাকির হোসেন এর সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ডা. এম.এ আজাদ বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের একমাত্র চিকিৎসক ছিলেন। তার মৃত্যুর পরে চিকিৎসক শূন্যতার কারণে ইউনিটটি আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।
কবে নাগাদ বিভাগটি চালু হতে পারে তার নির্দিষ্ট তথ্য জানাতে না পারলেও উপ-পরিচালক বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এ পর্যন্ত সাত থেকে আটটি চিঠি পাঠিয়েছি। কিন্তু কোন চিঠির জবাব পাইনি। এখন একজন চিকিৎসক পেলেই বিভাগটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দৃষ্টি দিলে খুব দ্রুতই সংকট দূর হবে বলে আশাবাদী তিনি।