হুয়াওয়ে নিয়ে বেকায়দায় চীন

প্রকাশিত: ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৮, ২০২০

বার্তা ডেস্ক ॥ যুক্তরাজ্য তার ৫জি নেটওয়ার্ক থেকে চীনা কোম্পানি হুয়াওয়েকে নিষিদ্ধ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা চীনের জন্য একটি বড় বেদনাদায়ক আঘাত। অল্প কিছুদিন আগেও চীন তার এ টেলিকম জায়ান্টের বিচরণক্ষেত্র হিসেবে যুক্তরাজ্যকে গণ্য করত। তবে সাম্প্রতিক দুটো ঘটনা এ অবস্থা পুরো উল্টে দিয়েছে। প্রথম ঘটনাটি হলো হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি। গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সাপ্লাইয়ার হুয়াওয়েকে সেমিকন্ডাক্টর (বিশেষত, মোবাইল ফোন সেটের মতো ইলেকট্রনিক ডিভাইস তৈরির ধাতব কাঁচামাল, যেমন সিলিকন) সরবরাহ করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র এত দিন হুয়াওয়ের বিভিন্ন ডিজিটাল যন্ত্র বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত সেমিকন্ডাক্টর বানিয়ে এসেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা দেওয়া বন্ধ করায় হুয়াওয়ের ৫জি বেইস স্টেশনসহ নানা পণ্য উৎপাদন সীমিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কোম্পানিটির ৫জি যন্ত্রপাতির উৎপাদন নিকট ভবিষ্যতে অব্যাহত রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এতে যুক্তরাজ্যের ৫জি নেটওয়ার্ক তৈরিতে হুয়াওয়ে সাপ্লাইয়ার হিসেবে যে কাজ করত, তা আর সম্ভব হবে না।

এ ধরনের একটি কোম্পানিকে সরবরাহকারী হিসেবে রাখার ঝুঁকি কোনো দায়িত্বজ্ঞানহীন সরকারই নিতে চাইবে না। সুতরাং মে মাসে হুয়াওয়ের ওপর যখন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তখন থেকেই তার যুক্তরাজ্যের ৫জি নেটওয়ার্ক থেকে বাদ পড়ার সময় গোনা শুরু হয়ে গেছে। ঠিক কখন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে টেলিফোন করে এ দুঃসংবাদ দেবেন, সেটিই প্রশ্ন হয়ে আছে।

দ্বিতীয় যে ঘটনা বরিস জনসনের জন্য যুক্তরাজ্যে হুয়াওয়েকে নিষিদ্ধ করা সহজ করে দিয়েছে, সেটি হলো হংকংয়ের ওপর চীনের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা আইন চাপিয়ে দেওয়া। গত ২০ জুন চীনের পার্লামেন্টে পাস হওয়া এ কালাকানুন, প্রকৃতপক্ষে সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশ হংকংয়ের স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদাকে শেষ করে দিয়েছে। ১৯৮৪ সালে চীন ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে স্বাক্ষরিত এক চুক্তিতে বলা ছিল, ১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে হংকংকে চীনের হাতে তুলে দেবে। তবে শর্ত হলো তার পরের ৫০ বছর হংকংকে স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্রের মর্যাদা দিতে হবে। সেই ভিত্তিতে ‘এক দেশ দুই নীতি’ চালু ছিল। কিন্তু নতুন এ আইন হংকংয়ের সেই আইনানুগ অধিকার খর্ব করেছে। এটি যুক্তরাজ্যের সঙ্গে চীনের প্রকাশ্য বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

চীনের নেতারা ভেবে থাকতে পারেন, যুক্তরাজ্য চীনকে পাল্টা আঘাত করার সামর্থ্য রাখে না। কিন্তু এটি ভেবে থাকলে তাঁরা নিশ্চিতভাবে ভুল করেছেন। যুক্তরাজ্য হংকংয়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সে জন্য তারা হুয়াওয়েকেই প্রথম টার্গেট হিসেবে নিয়েছে। চীন পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে এবং চীনে যুক্তরাজ্যের যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে, তাদের কাজ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের ব্যাংকিং জায়ান্ট হিসেবে পরিচিত এইচএসবিসি হংকংয়ে তাদের ব্যাবসা পরিচালনায় বাধার মুখে পড়বে। এ ছাড়া চীন লন্ডনের মাধ্যমে তাদের আর্থিক লেনদেন এবং যুক্তরাজ্যের কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রী পাঠানো বন্ধ করতে পারে। কিন্তু এই পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা গ্রহণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে হংকং। হংকংয়ে পরিচালিত এইচএসবিসি যে পরিমাণ রাজস্ব আয় করে, তা পুরো এইচএসবিসির আয়ের অর্ধেকের সমান। তার মানে কী পরিমাণ বাণিজ্যিক লেনদেন এ ব্যাংকের মাধ্যমে হয়ে থাকে, তা সহজেই অনুমেয়। এখন যদি হংকংয়ে ব্যাংকটি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে হংকংয়ের অবস্থান হুমকির মুখে পড়বে। অন্যদিকে যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে, তাই সিটি ব্যাংক কিংবা জেপি–মর্গান চেজকে চীন সুবিধা করে দেবে, তা মনে করার কারণ নেই। আবার চীনের শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্যে পড়তে যাওয়ায় চীন বাধা দিলে সেটি দেশটির নিজের জন্যও মঙ্গল বয়ে আনবে না। বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার চীনা শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করছে। চীন অস্ট্রেলিয়াকেও হুমকি দিয়েছে, তারা সেখানে শিক্ষার্থী পাঠাতে না–ও পারে। আবার যুক্তরাজ্যও নিরাপত্তা ইস্যু দেখিয়ে চীনা শিক্ষার্থী নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ অবস্থায় চীনাদের উচ্চশিক্ষাই বাধাগ্রস্ত হবে। কারণ, কানাডায় বর্তমানে ১ লাখ ৪০ হাজার চীনা শিক্ষার্থী রয়েছে এবং সেখানে এর বেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ নেই। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে হুয়াওয়ের কর্মকর্তাকে বহিষ্কারের সূত্র ধরে কানাডার সঙ্গে চীনের ঝগড়া চলছে।

এখন এটি পরিষ্কার যে চীন ক্রমাগত নিজের শত্রুদেশের সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে। গত কয়েক মাসে ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব খারাপ জায়গায় গেছে। কোভিড–১৯ মহামারির উৎপত্তিস্থলের অনুসন্ধান চালাতে গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। সেই কারণে অস্ট্রেলিয়ার ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপিয়েছে চীন। জাপানের সঙ্গেও চীনের শত্রুতা বেড়েছে। এত দেশকে খেপিয়ে চীনের পক্ষে সামনে এগোনো কঠিন হবে।

Sharing is caring!