হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করে শেবাচিমে ভাইভা গ্রহণ : অতঃপর স্থগিত

প্রকাশিত: ১১:০৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২১

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে চলমান নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিতের জন্য দেয়া উচ্চ আদালতের আদেশ মানছে না নিয়োগ কমিটি। বরং তারা ওই আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মঙ্গলবার সকাল থেকে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ভাইভা (মৌখিক) পরীক্ষা নিতে শুরু করেছে।

তবে জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পেতে আবেদন করা শেবাচিম হাসপাতাল পরিচালকের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত আবুল কালাম ওরফে তাজুলের ভাইভা গ্রহণ করেনি নিয়োগ কমিটি। নিয়োগ পেতে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়ায় তাকে ভাইভা বোর্ড থেকে বের করে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকটি সূত্র। উচ্চ আদালতের দেয়া স্থগিতাদেশের ওপর নিয়োগ কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন বিশেষ মহল। পাশাপাশি হাইকোর্টের আদেশ অবমাননা করে নিয়োগ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া আদালত অবমাননার শামিল বলে উল্লেখ করেছেন বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আফজালুল করিম।

 

যদিও দিনের বেলায় হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করে ভাইভা পরীক্ষা গ্রহণ করলেও মঙ্গলবার রাতে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ই-মেইলের মাধ্যমে পত্রিকা অফিসে পাঠানো এক নোটিশের মাধ্যমে কার্যক্রম স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
জানাগেছে, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২টি ক্যাটাগরিতে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর ৩২ জন কর্মচারী নিয়োগের জন্য গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ। এরপর গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৭০০ আবেদনকারীর অংশগ্রহণে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত পরীক্ষায় ৪৪৪ জনকে উত্তীর্ণ দেখিয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি ফলাফল প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ।

 

হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারীর সন্তান ও স্বজন জালিয়াতি করে এই নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নেন বলে অভিযোগ ওঠে। একই সাথে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওইদিন পরীক্ষার হলে তাদের পছন্দের প্রার্থীদের নকল সরবরাহ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালের পরিচালকসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে বরিশাল সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন দুই পরীক্ষার্থী।

এরপরও নিয়োগ কার্যক্রম চলমান রাখায় তারা দু’জন ওই নিয়োগ কার্যক্রম বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। এর প্রেক্ষিতে সোমবার ১৫ ফেব্রুয়ারি বিচারপাতি এ.কে.এম শহীদুল হকের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের একক বেঞ্চ এই নিয়োগ প্রক্রিয়া কেন বাতিল হবে না জানতে চেয়ে রুল জারীর আদেশ দেন। পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়া ছয় সপ্তাহের জন্য স্থগিতের নির্দেশ দেন বলে জানান বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শামীম খালেদ।

 

তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশের একটি কপি সোমবার রাতেই ই-মেইলে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিচালক বরাবর পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
তবে হাইকোর্টের এই আদেশের প্রতি সন্দেহ পোষণ করে মঙ্গলবার নিয়োগ কার্যক্রম চালিয়ে যান শেবাচিম হাসপাতাল পরিচালক ডা. বাকির হোসেনসহ নিয়োগ কমিটি। ওই আদেশের প্রতি সন্দেহ পোষণ করে তিনি লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ভাইভা পরীক্ষা গ্রহণ করেন।

জানতে চাইলে হাসপাতাল পরিচালক সাংবাদিকদের বলেন, ‘আইনজীবীর প্রত্যয়নপত্রে রিটের নম্বর নেই। এটা সঠিক কিনা তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে। আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতের আদেশ পেলে সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন পরিচালক ডা. বাকির হোসেন। তবে হাইকোর্টের আদেশে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সন্দেহ পোষণ করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সিনিয়র আইনজীবীরা। তারা বলেন, হাইকোর্টের এই আদেশ সঠিক। মেডিকেল কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল হাইকোর্টের আদেশের প্রতি সম্মান জানানো। এই আদেশের পরও নিয়োগ কার্যক্রম চালিয়ে মেডিকেল কর্তৃপক্ষ আদালত অবমাননা করেছেন বলে মন্তব্য করেন তারা। তবে হাইকোর্টের যে কোন আদেশ প্রাথমিকভাবে আইনজীবীরা প্রত্যয়ন করেন এবং এই প্রত্যয়ন গ্রহণযোগ্য বলে জানিয়েছেন বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক কাজী মনিরুল হাসান। তিনি বলেন, এই প্রত্যয়ন কোন কর্তৃপক্ষ অবজ্ঞা করলে সেটা আদালত অবমাননার শামিল।

 

বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আফজালুল করিম বলেন, ‘হাইকোর্টের ৪৪ ডিএলআর এর ২১৯ নম্বর পেজে উল্লেখ আছে, প্রাথমিকভাবে আদালতের যে কোন আদেশের প্রত্যয়ন আইনজীবীরা দিতে পারবেন। এটাই নিয়ম এবং গ্রহণযোগ্য। শেবাচিম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উচিৎ ছিল হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়া পর্যন্ত এই নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত রাখা। সেটা না করলে কর্তৃপক্ষ আদালত অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত হবে।

 

এদিকে, হাইকোর্টের আদেশ উপেক্ষা করে সকাল থেকে ভাইভা গ্রহণ করলেও মঙ্গলবার রাতে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিতের নোটিশ প্রদান করেছে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি এ বিষয়ে পত্রিকা অফিসে ই-মেইলের মাধ্যমে বার্তাও পাঠানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে ‘মহামান্য হাইকোর্টের আদেশের প্রেক্ষিতে শেবাচিম হাসপাতালে চলমান নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করা হল।