সুবিধাবঞ্চিতদের স্বপ্ন পূরণের স্বপ্ন দেখে চট্টলার যাত্রীছাউনি

প্রকাশিত: ৪:৫১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

মানুষের জন্য কিছু করতে না পারলে মানুষ হলাম কেন”- এমন ভাবনা আগামীর বাংলাদেশকে আশাবাদী করে নতুন প্রজন্মের দেশ প্রেম দেখে। একটি দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির সাথে জড়িয়ে থাকে দেশ আর দেশের মানুষের প্রতি মানবতাবোধ। সামাজিক দায়বদ্ধতাকে অস্বীকার করে এগিয়ে যাওয়া যায় না। মানুষে মানুষে শ্রেণি বৈষম্য রয়েছে প্রতিটি দেশে। আর এ বৈষম্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, মায়া আর সাহায্য করার মানসিকতা থাকা খুব প্রয়োজন।

‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ এ কথাকে আত্মিকভাবে ধারণ করে সমাজের সুবিধা বঞ্চিতদের স্বপ্ন পূরণের স্বপ্নকে সত্যি করেছে চট্রগ্রামের একদল তরুণ। যারা অসহায় মানুষের জন্য কাজ করার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে তাদের সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘যাত্রীছাউনি’র মাধ্যমে ৷চট্টলার যাত্রীছাউনি তাদের ‘দুই টাকার দোকান’ কর্মসূচি দিয়ে নগর বাসীর নজর কেড়েছে ইতোমধ্যে। যদিও তারা অনেকটাই নীরবে কাজ করে। মনের তাগিদে মানবপ্রেম বলেই তারা প্রচার বিমুখ। তরুণ উদ্যমী ফরহাদুল ইসলাম জিসান ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর যাত্রীছাউনি সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন মানবতার কল্যাণে কাজ করার উদ্দেশ্যে। এ সংগঠনে তার সহযোদ্ধা হয় চট্টগ্রাম শহরে দীর্ঘদিন ধরে মানবতার কল্যাণে কাজ করে যাওয়া কিছু সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক।

যাত্রীছাউনির চলার পথ শুরু থেকেই বন্ধুর হলেও তারা নিজেদের স্বল্প সামর্থ্য আর মনোবল নিয়ে পথ চলেছে। নিজে ঈদের কাপড় না কিনে সে টাকা দিয়ে সুবিধা বঞ্চিতদের  জন্য ‘দুই টাকার দোকান’ করেছে। আবার পূজাতে পসরা সাজিয়েছে হিন্দু ধর্মালম্বী সুবিধা বঞ্চিতদের জন্য। একইভাবে শীতের সামগ্রী নিয়ে চলে এ দোকান। সাম্প্রতিককালে তাদের এ কার্যক্রমটি   চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের দৃষ্টিগোচর হলে যাত্রীছাউনির পাশে দাঁড়ায় চট্টগ্রামের মানবিক পুলিশ। তাদেরকে পুরস্কৃত করা হয় মানবিক কাজের জন্য।

এতে করে যাত্রীছাউনির তরুণ দলটি আরও এক ধাপ এগিয়ে যায় মানুষের সেবায় ও সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে। ফলশ্রুতিতে তাদের বর্তমান মানবিক কার্যক্রমে সিএমপি পাশে থাকে। গণপরিবহনে নারীদের হয়রানি বন্ধ করতে রাস্তায় প্রচারণা চালানো, রক্ত দান, দুই টাকার উষ্ণতা কার্যক্রমে যাত্রীছাউনির সারথি সিএমপির উদ্যোগ সত্যি প্রশংসনীয়। রুণ সমাজ বিপথে যাচ্ছে এ ধারণাকে বদলে দিতে সিএমপির মত করে এগিয়ে আসতে হবে সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তি এবং অন্য প্রতিষ্ঠানকেও । কেননা মানবিকতাবোধ আর মানুষের জন্য কাজ করার অনুপ্রেরণা পেলে জিসান, হাসিব, রিমনদের মত তরুণরা তাদের মেধা দিয়ে সমাজ থেকে অন্যায় দূর করবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

যাত্রীছাউনির মূল কাজ হলো সুবিধাবঞ্চিত যে কোন বয়সের মানুষকে সহায়তা করা। তাই মধ্যরাতে অচেনা রোগীর জন্য রক্ত  সংগ্রহ করা, অসহায় রোগীর চিকিৎসার জন্য রাস্তায় রাস্তায় ক্যাম্পেইন করা, প্রচণ্ড গরমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রিকশাওয়ালাদের ঠাণ্ডা শরবত ও খাবার স্যালাইন খাওয়ায় যাত্রীছাউনি।এছাড়া সারাবছর ধরে বিশেষ কিছু কর্মসূচি রয়েছে। যেমন ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালবাসা দিবসে তারা সারাদিন পথশিশুদের সাথে কাটায়। শিশুদেরকে গোলাপ দিয়ে তাদের ভালবেসে পাশে থাকার অঙ্গীকার করে। এর সাথে শিশুদের শিক্ষা উপকরণ এবং ব্রাশ, পেস্ট, নেইলকাটার ও সাবান ইত্যাদি বিতরণ করে। পহেলা বৈশাখে নগরীর প্রায় প্রতিটি মোড়ে রিকশাওয়ালাদের ঠাণ্ডা শরবত বিতরণ করে। বিকেলে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

এছাড়া মানবিক কাজে এগিয়ে আসতে উৎসাহ দিতে যাত্রীছাউনি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন চট্টগ্রামের প্রায় সকল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। দেশের প্রাকৃতিক দূর্যোগ যেমন বন্যা, পাহাড় ধসে যাত্রীছাউনি ছুটে যায় বিপদগ্রস্ত মানুষের কাছে। মোবাইল ইন্টারনেটের মোহ আর মাদকের আসক্তি নিয়ে আতঙ্কিত বর্তমান সমাজ। অন্যদিকে, অন্যকে নিয়ে ভাবার সময় নেই এখনকার সমাজের মানুষের। এ পরিস্থিতিতে ‘যাত্রীছাউনি’  স্বপ্ন জাগানিয়া বাঁশি। যার সুরে আছে তরুণ সমাজের মানুষের জন্য ভালোবাসা আর মমত্ববোধ।

Sharing is caring!