সিডর তাণ্ডবের ১৩ বছর অতিবাহিত হলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি উপকূলবাসী

প্রকাশিত: ৫:১২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৪, ২০২০

মামুন হোসেন, ভাণ্ডারিয়া প্রতিনিধি ॥

আগামীকাল ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর’র তাণ্ডবের ১৩ বছর পূর্তি। ২০০৭ সালে দেশের ১১ জেলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলে আঘাত হানে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডর। সেই ঝড়ে বিশেষ করে বাগেরহাট,বরগুনা,পটুয়াখালী,পিরোজপুর, ঝালকাঠী জেলার সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন। প্রায় ১০ লাখ ঘরবাড়ী ও সোয়া দুই লাখ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে যায়। গবাদি পশু মারা যায় প্রায় আড়াই হাজার। উপকূলীয় লাখ লাখ মানুষ বাড়ীঘর হারিয়ে পথে বসতে হয়। আজও ভোলেননি উপকূলবাসী সে মর্মস্পর্শী দিনের কথা। সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনও শরীর শিউরে ওঠে।

যখনই ১৫ নভেম্বর আসে, তখনই উপকূল থেকে শোনা যায় স্বামী-হারা স্ত্রীর করুণ আর্তনাদ, স্ত্রী-হারা স্বামীর করুণ বিলাপ, মা-হারা সন্তানের কান্না, সন্তান-হারা, মা-বাবার আকুতি যেন মানুষের হৃদয়ে কেঁপে ওঠে। সেদিন কত লাশ যে ভেসে গেছে গভীর সাগরে, স্বজনরা তাদের লাশও খুঁজে পাননি। আজও তারা কাঁদছেন। তাদের কান্না যেন কেউ থামাতে পারছে না। সম্পদ-হারা, গৃহ-হারাদের অনেকেই আজও ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি; পরিশোধ করতে পারেননি ব্যাংক ঋণ। ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ, রাস্তার অনেকটাই এখনও সংস্কার হয়নি।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যায় সর্বনাশা ঘূর্ণিঝড় সিডর, ঘণ্টায় যার গতিবেগ ছিল ১২০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার। সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। আবহাওয়া অফিস বারবার সংকেত দিচ্ছিল মহাবিপদসংকেতের। এসব খবর রেডিও, টেলিভিশন ও স্থানীয়ভাবে মাইকিং করায় লোকজন আগেভাগেই ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে চলে যান। রাত ১১ টার দিকে ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানে সুন্দরবনে। তছনছ হয়ে যায় সুন্দরবন।

ঘূর্ণিঝড় সিডর সুন্দরবন আক্রমণ করে কিছুটা দুর্বল হয়ে উপকূলে আঘাত হানে। আবহাওয়াবিদরা পরে জানিয়ে ছিলেন, ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ এতটাই ছিল যে, প্রথমে সুন্দরবন আক্রমণ না করলে পুরো উপকূল ধ্বংস হয়ে যেত। শুধু পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলায় সিডরের জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নেয় ৯৭ জনকে। নিখোঁজ হন শত শত মানুষ। আশ্রয়হীন হয় প্রায় ২০ হাজার পরিবার, মারা যায় বিপুল সংখ্যক গবাদি পশু, বিধ্বস্ত হয় বেড়িবাঁধ, রাস্তাঘাট, ব্রীজ কালভার্ট।

পরদিন সকালে চোখমেলে দেখাযায় ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার পরিবার ও নিহতদের লাশের পাশে স্বজনদের আহাজারি। এ ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে গাছপালা উপড়ে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে, বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে তার ছিন্নভিন্ন হয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে কয়েক মাস, টেলিফোন সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উপজেলার ৭ টি ইউনিয়নের হাজার হাজার ঘরবাড়ি, প্রায় ৫ শতাধিক ছোট বড় ব্রীজ কালভার্ট, ২ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ৯৭ জন মানুষ নিহত সহ অফিস আদালত, হাটবাজার সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সিডরের ১৩ বছর অতিক্রান্ত হলেও ভা-ারিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকশ পরিবার এখনো গৃহ নির্মাণ করতে পরেনি। আজো এসব পরিবার গুলো পলিথিন ও খড়কুটো- বাঁশ দিয়ে ঝুপড়ি তৈরীকরে বসবাস করছে।

সিডরের পর পর এসব পরিবারদের পুনর্বাসনের সহায়তা হিসেবে ৫ হাজার টাকা করে পেলেও তা ওই সময় অভাব অনাটনে খরচ করে ফেলেন। তবে, সিডরের ১৩ বছর পার হলেও সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত কেউ কেউ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারলেও উপকূলের অনেককেই এখনো ঝুপড়ি ঘরেই বসবাস করতে হচ্ছে। পরে ক্ষতি কাটাতে এসব এলাকায় রাস্তাঘাট ও বেড়িবাঁধ পুনর্নির্মাণের মতো উন্নয়নমূলক প্রকল্প যেসব নেয়া হয়েছে,তেমনি কৃষি,পশু পালনে অনেক প্রশিক্ষণ মূলক প্রকল্পও নেয়া হয়। বিশুদ্ধ পানির জন্য টিউবওয়েল বসানোসহ গ্রামের দুর্গম এলাকাগুলোতে সাইক্লোন শেল্টার তৈরি করা হয়েছে,যেগুলো সারা বছর স্কুল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

উপজেলার চরখালী গ্রামের স্বামী হারা ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ রাহেলা বেগম বলেন, সিডর আমার ঘর কেড়ে নিছে। সেই থেকে বড় অভাবে আছি। শুনছি সরকার এতো ঘরবাড়ী দ্যায়, কিন্তু আমি আজ পর্যন্ত পেলাম না। অনেক কষ্টে এই ঝুপড়ি ঘরে নদীর পাড়ে জীবন যাপন করছি। তিনি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্থানীয় এমপি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু’র কাছে একটি ঘর চেয়েছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অসুস্থ রাহেলা এক মুহূর্তেও জন্য হলেও একটি নতুন ঘর দেখতে চান বলে আশা করেন।

অপর এক গৃহবধূ কুলসুম জানান, আগে ম্যোগো ভোটের সময় লাগতো, এখন-তো তাও কেউ জিগায় না, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কঁচার পাড়ে পরিবার নিয়ে ভাঙাচোরা ঘরে বসবাস করছি দেহার কেউ নেই। এ ছাড়া ওই এলাকার অভাবী পারুল, দিনমজুর দুলাল, স্বামী পরিত্যক্তা রাশিদা, নাছিমা জানান, য্যাগো আছে হেরাই সাহায্য পায়, গরীবের পাশে কেউ থাকেনা।

তারা বলেন, বাঁচার তাগীদে জীবনযুদ্ধে করছেন তারা। উপজেলার হরিন পালা আদর্শ গ্রামের মনোয়ারা বেগমের স্বামী শাজাহানকে ভয়াল সিডর কেড়ে নেয়, সে দিন রাতের ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মনোয়ারা বেগম ও তার পরিবার। পশারিবুনিয়া গ্রামের আঃ মান্নানের স্ত্রী তার নিহত ছেলেকে এখনও খুঁজে ফেরেন। সিডরে স্বজনহারা কিছু পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায় ভয়াবহ সিডরের ১৩ বছর অতিক্রান্ত হলেও নিহত স্বজনদের জন্যে কান্না আজো থামেনি।

উল্লেখ্য, যখনই উপকূলের মানুষ সিডরের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছেন তখনই একের পর এক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে থাকে উপকূলে। গত ২০০৮ সালে ঘূর্ণিঝড় নার্গিস, ২০১৩ সালে ঘূর্ণিঝড় মহাসেন, ২০১৫ সালে ঘূর্ণিঝড় কোমেন, ২০১৬ সালে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু, ২০১৭ সালে ঘূর্ণিঝড় মোড়া, ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঘূর্ণিঝড় ফণি ও সর্বশেষ ২০১৯ সালে উপকূলে আঘাত হানে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বুলবুল, ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় নাকলি ও ঘূর্ণিঝড় আম্পান। ফলে ঘুরে দাঁড়ানোর হাজার চেষ্টা করলেও উপকূলবাসী তা পেরে ওঠেনি।

তারা প্রতিনিয়ত বৈরী আবহাওয়ার সাথে জীবন যুদ্ধ করে বেঁচে আছে।