সরকারি বরিশাল কলেজের নাম অপরিবর্তিত রাখার আন্দোলনে ভিন্নমাত্রা

প্রকাশিত: ১০:০৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০২০

*পুরো জেলায় ছড়িয়ে যাবে গণস্বাক্ষর কার্যক্রম
*পুনরুদ্ধার হবে মহাত্মা অশ্বিনীর বেদখল সম্পত্তি
*মুক্তিযোদ্ধা ও সামাজিক-সংস্কৃতিক সংগঠনের সংহতি প্রকাশ

 

শফিক মুন্সি ॥ সরকারি বরিশাল কলেজের নাম অপরিবর্তিত রাখার চলমান আন্দোলন দিনকে দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। কলেজটির সাবেক – বর্তমান শিক্ষার্থী, নগরীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন সমূহ এবং নগর আওয়ামীলীগের একাংশের সমন্বয়ে পরিচালিত বর্তমান আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষদের মাঝে। ঐতিহ্যবাহী কলেজটির নাম অপরিবর্তিত রাখার দাবিতে চলমান গণস্বাক্ষর কর্মসূচির নবম দিনে গতকাল নগরীতে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড কাউন্সিল ও কলেজটির সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার বেলা ১১ টায় নগরীর সদর রোডের অশ্বিনী কুমার (টাউন) হলের সামনে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।

সমাবেশ থেকে আন্দোলনের নতুন রূপরেখা ঘোষণা করা হয়। কলেজটির নাম অপরিবর্তিত রাখার চলমান গণস্বাক্ষর কার্যক্রম ছড়িয়ে যাবে জেলার সমস্ত উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এছাড়া মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের যেসকল সম্পত্তি বেদখল করা হয়েছে সেগুলো পুনরুদ্ধার করবেন এই আন্দোলনকারীরা। এর মধ্যে সরকারি বরিশাল কলেজের বেদখল হওয়া একটি ছাত্রাবাস পুনরুদ্ধার করে সেটায় মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের নাম যুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি বরিশাল কলেজের নাম পরিবর্তন করার জন্য ১০১ সদস্য বিশিষ্ট বাস্তবায়ন কমিটিকে তাদের বর্তমান অবস্থান থেকে সরে আসার আহবান জানিয়েছেন কলেজটির নাম অপরিবর্তিত রাখার চলমান আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ।

সমাবেশে মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান হাওলাদার বলেন, ‘দেশের যেকোনো স্থানের মানুষ বরিশালের ব্যাপারে জানতে আগ্রহী হলে তাঁর সামনে সরকারি বরিশাল কলেজের নাম উঠে আসে। কলেজটি বরিশালবাসীর অন্যতম পরিচায়ক হয়ে উঠেছে। যারা এই কলেজটির নাম পরিবর্তন করতে উৎসাহী তারা আসলে বরিশালকে ভালোবাসেন না’। এসময় বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগ নেতা রইজ আহমেদ মান্না বলেন, ‘প্রয়োজনে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সরকারি বরিশাল কলেজের নাম পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র রুখে দেয়া হবে’।

এ ব্যাপারে সরকারি বরিশাল কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহমেদ খান বলেন, ‘আমরা বরিশাল কলেজের নাম অপরিবর্তিত রাখার দাবিতে জেলার সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলমান গণস্বাক্ষর কার্যক্রমের কর্মকা- ছড়িয়ে দেবো’। তিনি জানান, কলেজটির একটি ছাত্রাবাস বেদখল আছে। সেটি পুনরুদ্ধার করে ঐ ভবনের নাম মহাত্মা অশ্বিনী কুমারের নামে করা হবে।

মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের বেদখল হওয়া সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে শরিক হয়েছেন বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমানও। তিনি গতকালের সমাবেশে একাত্মতা ঘোষণা করে বলেন, ‘সরকারি বরিশাল কলেজের সামনের পুকুর ও একটি ছাত্রাবাস বর্তমানে বেদখল অবস্থায় আছে। এগুলো পুনরুদ্ধার করে তাঁর নামে করা হবে’।

কলেজটির নাম অপরিবর্তিত রাখার চলমান আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেছে বরিশাল জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড। সংগঠনটির আহবায়ক হাসান মাহমুদ বাবু জানান, ঐতিহ্যবাহী সরকারি বরিশাল কলেজের নাম পরিবর্তনের পাঁয়তারা বরিশালবাসী কখনো মেনে নেবে না। ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া এই কলেজের নাম অপরিবর্তিত রাখার দাবিতে যা যা করা প্রয়োজন তারা সেগুলো করবেন।

কলেজটির নাম অপরিবর্তিত রাখার চলমান আন্দোলনের অন্যতম নেতা বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন। তিনি জানান, তাদের এই আন্দোলনের সাথে দেশের সূর্য সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা, বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ, নগরীর সুধী সমাজ ও সংস্কৃতিজনেরা একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। এর বিপরীতে যারা ১০১ সদস্য বিশিষ্ট সরকারি বরিশাল কলেজের নাম পরিবর্তন বাস্তবায়ন কমিটি করেছেন তাদের বেশিরভাগ সদস্যই জানেন না যে তারা নাম পরিবর্তনের কমিটিতে আছেন।

তিনি বলেন, ‘একটি কলেজের নাম পরিবর্তনের ইস্যুতে বরিশালবাসীকে বিভক্ত করে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেবার জন্য একটি পক্ষ কাজ করছে। তাদের উদ্দেশ্য কখনো স্বার্থক হবে না’। তিনি এসময় সরকারি বরিশাল কলেজের নাম পরিবর্তন বাস্তবায়ন কমিটির সকলের প্রতি আহবান জানান, তারা যেন বরিশালবাসীকে আর বিভ্রান্ত না করেন। এছাড়া যদি সত্যিই অশ্বিনী কুমার দত্ত কে তারা ভালোবাসে তবে যেন কলেজটির নাম অপরিবর্তিত রাখার দাবিতে একাত্মতা ঘোষণা করে মহান এই মানুষটির বেদখল হওয়া সম্পত্তি রক্ষায় কাজ করেন’।

উল্লেখ্য, স্থানীয় সংস্কৃতিজনদের দাবির প্রেক্ষিতে গত ফেব্রুয়ারি থেকে বরিশাল জেলা প্রশাসন কলেজটির নাম পরিবর্তনের জন্য চিঠি চালাচালি শুরু করেন উপর মহলে। গত ২৯ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয় কলেজটির বর্তমান নাম পরিবর্তন করে ‘মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত সরকারি কলেজ’ নামে রাখার জন্য সুপারিশ সহ মতামত চায় বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের কাছে। এসব গোপনীয় প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে তেমন কোন উচ্চবাচ্য ছিল না বরিশালে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকা ‘আজকের বার্তা’ সর্বপ্রথম গত ৫ জুলাই ‘পাল্টে যাচ্ছে সরকারি বরিশাল কলেজের নাম’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। এর পরই প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তনের বিষয়টি সবার সামনে আসে।

Sharing is caring!