সরকারি নির্দেশ ‍উপেক্ষিত : করোনা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বরিশালের কোচিং সেন্টারগুলো

প্রকাশিত: ১১:১৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার  ::

উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পাসকৃত প্রতিটি কিশোর-কিশোরীর স্বপ্ন থাকে একটি ভালো উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবার। সেই স্বপ্ন পূরণে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী জড়ো হয় বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে। অল্প সময়ে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষার বৈতরণী পার হবার আকাঙ্খায় বরিশাল নগরীর কোচিং সেন্টারগুলোতে বর্তমানে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর আনাগোনা। তবে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে অনেক কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে অফলাইনে (শ্রেণীকক্ষে) ক্লাস কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ উঠেছে। নএতে করে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে এসব শিক্ষার্থীর। কিছু কোচিং সেন্টারের এমন উদাসীন কার্যক্রমে সমস্যায় পড়েছেন অন্যান্যরা। তবে যারা সরকারি নির্দেশ অমান্য করছেন তাদের লাগাম দ্রুত টেনে ধরা হবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের তথ্যমতে, এবছর (২০২০) প্রায় ৭০ হাজার শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিকে (এইচএসসি) অটো পাস পেয়েছে। তাদের ফলাফল তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুস। অন্যদিকে গতবছর (২০১৯) উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছে কিন্তু কাঙ্খিত উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারে নি এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম নয়। এসব শিক্ষার্থীদের সহ প্রায় ১ লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ সহ অন্যান্য উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেবার ব্যাপারে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই বৃহৎ শিক্ষার্থী সংখ্যার অধিকাংশই বরিশাল নগরীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কোচিং সেন্টার গুলোর মুখাপেক্ষি। অল্প সময়ে যথাযথ প্রস্তুতির জন্য তারা কোচিং সেন্টার গুলোতে ভর্তি হয়।

আর সরকার থেকে শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে জড়ো করে কোন কার্যক্রম চালানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানছে না নগরীর কিছু কোচিং সেন্টার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও একাধিক কোচিং সেন্টার শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের জড়ো করে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এমন অভিযোগ তুলেছে বরিশালে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে ভর্তিরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এইচএসসি পাস শিক্ষার্থী।

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং গুলোর মধ্যে নগরীর মল্লিক রোডস্থ ইউসিসি এবং কালীবাড়ি রোডস্থ প্যারাগন প্রতিষ্ঠান দুটি বেশ খোলামেলাভাবে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে অফলাইনে (শ্রেণীকক্ষে পাঠদান) ক্লাস কার্যক্রম চালাচ্ছে। সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে একজন অভিভাবক হিসেবে ফোন দেবার পর দুটো প্রতিষ্ঠানই এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। এমনকি অফলাইনে ক্লাস করতে গিয়ে প্রশাসনিক বা আইনি কোন ধরনের জটিলতার শিকার তাদের হতে হচ্ছে না বলেও জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠান দুটির ঊর্ধ্বতনরা। এছাড়া কোনো শিক্ষার্থী স্ব শরীরে ক্লাস করতে গিয়ে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করলেও যেন কোন সমস্যায় না পড়ে সে ব্যাপারেও আশ্বস্ত করেছে তারা।

নগরীর ইউসিসি কোচিং এর পরিচালক ইলিয়াস হোসেন সুমন জানান, তাদের অনলাইন এবং অফলাইন দুই মাধ্যমেই ক্লাস নেয়া হচ্ছে। একই কথা বলেন প্যারাগন কোচিং সেন্টারের পরিচালক রেজাউল করীম। সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অফলাইন ক্লাস পরিচালিত করার সময় যদি পুলিশ উপস্থিত হয় তখন কি করেন- এমন প্রশ্নের জবাবে সুমন বলেন, ‘পুলিশ ধরলে তো আমাকে ধরবে। শিক্ষার্থীদের কোন ভয় নেই’। আর রেজাউলকে পুলিশ বিরক্ত না করলেও সাংবাদিকেরা বিরক্ত করেন বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘কিছু সাংবাদিক ফোন দিয়ে অফলাইনে ক্লাস নেবার ব্যাপারে প্রশ্ন করেন। অনেকে আবার অফিসে চলে আসেন। তবে সকলকে ম্যানেজ করেই সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অফলাইনে শিক্ষার্থীদের শারীরিক উপস্থিতিতে তারা ক্লাস নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

আর এভাবে অফলাইনে ক্লাস শুরু হবার ফলে সমস্যায় পড়ছে সরকারি নির্দেশনা মেনে ব্যবসা পরিচালনা করা কোচিং সেন্টার গুলো। এ ব্যাপারে নগরীর আইকন প্লাস কোচিং সেন্টারের পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন,‘ সরকারি নির্দেশনা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের একসাথে জড়ো করা যাবে না। এতে করে প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে পারে। সরকারি নির্দেশনা এবং শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বিবেচনা করে আমরা অনলাইন ক্লাস কার্যক্রম চালাচ্ছি। কিন্তু যারা এই নির্দেশনা উপেক্ষা করছেন এবং শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন তাদের কারণে ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে আমাদের’।

স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণ না করে শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে জড়ো হওয়া বিপজ্জনক জানিয়ে বরিশালের সিভিল সার্জন ডাঃ মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘করোনা এখনো পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় নি। বরঞ্চ সামনের শীতে প্রকোপ আরো বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করছে সবাই। এমন একটি সময়ে শুধু কোচিং সেন্টার নয়, সর্বত্রই চোখে পড়ার মতো যে ভিড় এবং স্বাস্থ্য বিধি মানার ব্যাপারে উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা বিপজ্জনক’। এমন অবস্থায় শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের আরো সচেতন এবং আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্যোগী হওয়া জরুরী বলেও জানান এই চিকিৎসক।

আর কোচিং সেন্টার গুলোর এমন বেপরোয়া ও উদাসীন কার্যক্রম বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন কার্যক্রম চালাবে বলে জানানো হয়েছে। বরিশালের জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান জানান, সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে যারা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলছে তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করা হবে। আর বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার প্রলয় চিসিম বলেন,‘ সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ আইন বলে সরকারি একটি বিধিমালা আছে। সেটি যারা লঙ্ঘন করবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

এক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে যারা উদাসীন আচরণ করছেন তাদের লাগাম টেনে ধরা হবে’। তবে এই বিষয়ে অভিভাবকদের আরো সচেতন ভূমিকা আশা করছেন প্রশাসনের এই ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা। শিক্ষার্থীদের জীবনের কথা বিবেচনা করে তাদের ঘরের বাইরে বের হবার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহবান জানান তারা।