সংকটে বরিশালের পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা

প্রকাশিত: ৭:৪৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২০

শফিক মুন্সি ::

বরিশাল বিভাগ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে হাজারো তৈরি পোশাক (রেডিমেড) ব্যবসায়ীর বিপণীবিতান। করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে এসব ব্যবসায়ীর অধিকাংশই রয়েছেন সংকটে। অনেকে করছেন এ ব্যবসা ছেড়ে দেবার চিন্তা। সামনে আসতে পারে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ। এতদিন লোকসানে থাকা এসব ব্যবসায়ীকে যদি সামনের শীতে দোকান বন্ধ রাখতে হয় তবে তারা সম্মুখীন হবেন মারাত্মক ক্ষতির। আর বর্তমানের সঙ্গে ভবিষ্যতের ক্ষতি যেন পুষিয়ে নিতে পারেন তাই এসব ব্যবসায়ীর প্রতি সরকার যেন মনোযোগী হয় সেই আহবান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

মোঃ হাসিব (ছদ্মনাম) গত তিন বছর যাবত বরিশাল লঞ্চঘাট এলাকার বহুমুখী সিটি মার্কেটে তৈরি পোশাকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি। দেখেছিলেন কিছুটা সচ্ছলতার মুখ। সারামাসে যা বিক্রি হতো তাতে ব্যাংক লোনের কিস্তি, দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন দিয়ে কিছু টাকা ঘরে নিতে পারতেন। আর দুই ঈদ, দুর্গা পূজা আর শীতের মৌসুমে পোশাক বিক্রি করে হতো অতিরিক্ত লাভ। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি তাঁর গোছানো জীবন এলোমেলো করে দিয়েছে।
লকডাউনের কারণে প্রথমে গত মার্চ থেকে মে প্রায় চারমাস দোকান খুলতে পারেন নি তিনি।

পরবর্তীতে দুই ঈদ ও এখন পূজার মৌসুম চলে যেতে বসলেও বিক্রি হয় নি আগের মতো। দোকানের একজন কর্মচারীকে ছাঁটাই করেও স্বাভাবিক হয় নি উপার্জনের মাত্রা। বাকি পড়েছে পাঁচমাসের ব্যাংক লোনের কিস্তি আর তিন মাসের দোকান ভাড়া। এরমধ্যে সংসার চালাতে গিয়ে আত্মীয় – স্বজন ও বন্ধুদের কাছে ধার করেছেন অনেক। পাওনা টাকা চাইতে অনেকে হাজির হন দোকানে। তাই প্রায়ই দোকান আর মোবাইল ফোনের সংযোগ বন্ধ করে সবার অগোচরে পালিয়ে বেড়ান এই তরুণ উদ্যোক্তা।

তিনি বলেন,‘ ভাই বর্তমান পরিস্থিতি একদম দিশেহারা করে দিয়েছে আমাকে। চক্ষুলজ্জায় পাওনাদারদের এড়িয়ে চলছি। কিভাবে যে সংসার চলছে নিজেও জানি না। এখন জরুরী প্রয়োজনে কোন ওষুধ পর্যন্ত বাকি পাই না। এমন চলতে থাকলে চুরি-ছিনতাই করা ছাড়া উপায় থাকবে না’।

হাসিবের মতো এমন অবস্থা বরিশাল বিভাগের অধিকাংশ তৈরি পোশাকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মানুষের। নগরীর গির্জা মহল্লা, সদর রোড, পুলিশ লাইনস সড়ক ও শের ই বাংলা একে ফজলুল হক এভিনিউতে অবস্থিত প্রায় তিনশতাধিক আধুনিক তৈরি পোশাকের দোকান। রুচিশীল ও সমাজের উঁচুশ্রেণীর ক্রেতারা সাধারণত এসব জায়গার বিপণীবিতান গুলোতে নিজেদের পছন্দের পোশাকটি কিনতে হাজির হন। এদিকে লঞ্চঘাট এলাকার হকার্স মার্কেট ও বহুমুখী সিটি মার্কেটে মধ্য ও নিম্নবিত্ত ক্রেতাদের ঢল থাকে। এই দুই জায়গাতে রয়েছে প্রায় পাঁচ শতাধিক দোকান। বরিশাল সহ আশেপাশের চারটি জেলার (ঝালকাঠি, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা) ক্রেতারা ভিড় করেন নগরীর এসব স্থানে পসরা সাজিয়ে বসা তৈরি পোশাকের দোকান গুলোতে।

এছাড়া নগরীর রূপাতলী, কাউনিয়া, বটতলা ও নথুল্লাবাদ এলাকায় প্রায় দুই শতাধিক ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি পরিসরে তৈরি পোশাকের দোকান খুলে বসেছেন। সাধারণত দুটি ঈদ (ঈদুল ফিতর ও আযহা) এবং একটি পূজার (দুর্গা পূজা) মৌসুমে তৈরি পোশাকের দোকানগুলোতে বিক্রি হয় বছরের অন্য সময়ের চেয়ে বেশি। বছরের এই তিন উৎসবের মৌসুমের উপার্জন দিয়েই বরিশালের বেশিরভাগ পোশাক বিক্রেতাদের পুরো বছর অতিবাহিত হয়। কিন্তু করোনা মহামারির আঘাতে বিগত বছরের সিকিভাগ উপার্জনও এবার হয় নি। তিনটি প্রধান উৎসব চলে যেতে বসলেও বেশিরভাগ পোশাক বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান আছে লোকসানে। এমন তথ্যই জানিয়েছেন এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বরিশালের দোকানিরা।

নগরীর পুলিশ লাইনস এলাকার অন্যতম আকর্ষণীয় তৈরি পোশাকের দোকান সিলভার রেইন। প্রতিবছর ঈদ এবং দুর্গা পূজায় বিশাল অংকের ব্যবসা করে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু এবছর বিগত বছর গুলোর মতো মুনাফা হয় নি বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক বাশার আহমেদ রাকিব। তিনি বলেন,‘ প্রতিবছর ঈদ-পূজার সিজনে দুই থেকে তিন লাখ টাকার বিক্রি হয়। মূলত এসব উৎসবের সিজনের লভ্যাংশ দিয়েই সারা বছর চলতে হয় পোশাক বিক্রেতাদের। কিন্তু এ বছর রোজার ঈদে দোকান এক প্রকার বন্ধ রাখতে হয়েছে, কোরবানির ঈদে উল্লেখযোগ্য কোন বিক্রি হয় নি। আর পূজায় এখন পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকার মালামালও বিক্রি করতে পারি নি’। এমন অবস্থা মোটামুটি বরিশালের সকল পোশাক বিক্রেতার বলেই জানান তিনি।

ফজলুল হক এভিনিউ এলাকার তৈরি পোশাক বিক্রয়কারী একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক ইকরামুল হক গত ছয়মাস যাবত লোকসানে আছেন। তিনি বলেন,‘মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত একদিনের জন্য দোকান খুলতে পারি নি লকডাউনের কারণে। সরকারি নির্দেশনার থাকায় জুলাইয়ের পরও দোকান চালাতে হয়েছে রয়েসয়ে। এদিকে সমাজের কমবেশি সবাই আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ায় নতুন পোশাক কেনার আগ্রহ কম মানুষের। তাই ব্যবসা না থাকায় কর্মচারীদের বেতন, কারেন্ট বিল সহ দোকান পরিচালনা করার আনুষঙ্গিক খরচ চালাতে হচ্ছে পকেটের পয়সা দিয়ে’।

এসব ব্যবসায়ীদের বর্তমান লোকসান মোকাবিলা ও ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দিয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান মোঃ মেহেদী হাসান। ব্যবসা প্রশাসনের এই শিক্ষক জানান, কারেন্ট-পানি বিল সহ সরকারের সঙ্গে সংযুক্ত খরচ গুলো কমানো গেলে এই ব্যবসায়ী শ্রেণী বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছুটা লাভবান হতো।

তবে নতুন বাস্তবতার (নিউ নরমাল) এই সময়ে প্রথাগত ব্যবসা পরিচালনার রীতিনীতি ত্যাগ করাই শ্রেয়। তিনি বলেন,‘ বিশ্বের বড় বড় পোশাকের ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানগুলো এই করোনা পরিস্থিতিতে অনলাইন ব্যবসার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। তাই আসন্ন শীতে যদি পুনরায় লকডাউন অবস্থার সৃষ্টি হয় তখন যেন অন্তত উপার্জন চালু থাকে সেজন্য অনলাইনে পোশাক বিক্রির প্রতি জোর দেয়া প্রয়োজন পেশাদার ব্যবসায়ীদের’।

তবে তৈরি পোশাক সহ সকল ব্যবসায়ীর পাশে সরকার রয়েছে এমন দাবি করেছেন বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার ড. অমিতাভ সরকার।

তিনি জানান, লকডাউন পরিস্থিতিতে যেসকল ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তার ঘরে খাবার না থাকার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল তাদেরকে জরুরী খাদ্য সহায়তা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে যেহেতু জীবন ও জীবিকা দুটোই স্বাস্থ্য বিধি মেনে স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে তাই গুরুতর কোন সমস্যা নেই কারো। তবে ভবিষ্যতে যদি অবস্থা পুনরায় খারাপ হয় তখন সকলের পাশে আবারো সর্বাত্মকভাবে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। তিনি বলেন,‘বর্তমানে সংকটে থাকা কোন ব্যবসায়ী বা তাদের সংগঠন যদি ব্যাংক লোন পরিশোধ কিংবা অন্য কোন জটিল সমস্যায় থাকে তবে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতার চেষ্টা করবো’।

Sharing is caring!