শোকের সাগর বুকে চাপা এক বটবৃক্ষ

প্রকাশিত: ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০২০

শফিক মুন্সি  :: স্বাধীনতা বিরোধী এক শ্রেণীর মানুষের চক্রান্ত আর একদল সেনাসদস্যের বিপথগামিতা। দক্ষিণ বঙ্গের আওয়ামী রাজনীতির অভিভাবক খ্যাত আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ’কে করেছে পিতৃ, সন্তান ও স্বজনহারা। কাছের মানুষদের হারিয়ে সাগর সমান শোক দিনের পর দিন বয়ে বেড়াচ্ছেন নীরবে-নীভৃতে। ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে সন্তানহারা এই বাবা বরিশালের হাজারো আওয়ামী নেতাকর্মীদের নিজের সন্তান হিসেবে বুকে টেনে নিয়েছেন বলেই জানা গেছে। পরিবার – স্বজন হারিয়ে দলকেই বানিয়েছেন নিজের পরিবার। সংগ্রাম – বিপ্লবে বরিশাল অঞ্চলে যারাই আওয়ামীলীগের জন্য খেটেছেন তাদের মাথার ওপরে ছায়া দিয়েছেন বটবৃক্ষ সুলভ অভিভাবকের মতো।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর ওপর হামলার আগেই হামলা হয় মিন্টো রোডের সেরনিয়াবাত পরিবারে। সেখানে সর্বপ্রথম যাকে উদ্দেশ্যে করে গুলি চালানো হয় ঘাতকেরা ধারণা করেছিল তিনি হাসানাত আব্দুল্লাহ। কিন্তু অলৌকিকভাবে সেদিন প্রাণে বেঁচে যান তিনি। প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁকে হারাতে হয়েছে পিতা তৎকালীন পানি,সেচ ও বিদ্যুৎ সম্পদ মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, দুই বোন বেগম আরজু মনি ও বেবী সেরনিয়াবাত, ভাই আরিফ সেরনিয়াবাত, চাচাতো ভাই শহিদ সেরনিয়াবাত এবং মাত্র চার বছরের সন্তান সুকান্ত আব্দুল্লাহ বাবু সেরনিয়াবাতকে। এছাড়া সেদিন তিনি হারিয়েছেন তাঁর মামা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ অন্যান্য কাছের পরিজনকে। তবে অজানা কারণে এসব ব্যাপারে তিনি কখনো গণমাধ্যমের সামনে কথা বলেন নি। রাজনীতির জন্য আত্মত্যাগের চূড়ান্ত উদাহরণ সৃষ্টি করলেও এই বিষয় নিয়ে কখনো করেন নি আত্মপ্রচার।
১৫ই আগস্ট যখন সেরনিয়াবাত পরিবারের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল ক্রিসেন্ড ব্যান্ড দলের সদস্য লোলিত দাশ। এই ব্যক্তি নিজেও সেদিন ঘাতকের ১১ টি বুলেট বিদ্ধ হন। তিনি জানান, ঐদিন শহিদ সেরনিয়াবাতকে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ভেবেই প্রথমে গুলি করা হয়। কারণ শহিদ সেরনিয়াবাতের কোলে ছিলেন সুকান্ত আব্দুল্লাহ এবং তিনি (শহিদ সেরনিয়াবাত) দাঁড়িয়েছিলেন সাহান আরা বেগমের (হাসানাত আব্দুল্লাহর স্ত্রী) পাশে। এছাড়া শহিদ সেরনিয়াবাত এবং হাসানাত আব্দুল্লাহর চেহারার মধ্যে বেশ সাদৃশ্য ছিল।

তিনি (লোলিত) বলেন,‘ঘাতকেরা সেরনিয়াবাত পরিবারের সকলকে দোতলার ঘর থেকে নীচে নামিয়ে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়। তারপর হাসানাত আব্দুল্লাহ ভেবে শহিদ সেরনিয়াবাতকে প্রথম গুলি করে হত্যা করে। ঐ দিন সেখানে শহিদ সেরনিয়াবাত উপস্থিত না থাকলে ১৫ আগস্ট ট্র্যাজেডির প্রথম শাহাদাৎ বরণকারী হতেন আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ’।

৭৫ এর আগেও আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহকে হত্যার চেষ্টা করা হয় বলে জানিয়েছেন বরিশাল জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড.তালুকদার মোঃ ইউনুস। তিনি জানান, ১৫ আগস্ট ট্র্যাজেডির আগেও বরিশাল নগরীর বিবির পুকুর পাড়ে তার ওপর দুষ্কৃতকারীরা গুলি বর্ষণ করে। কিন্তু সে যাত্রায় আল্লাহর মেহেরবানীতে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। মানুষের দোয়া ছিল বলেই বিভিন্ন বিপদ থেকে এভাবে অলৌকিক ভাবে রক্ষা পেয়েছেন আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ।

আওয়ামীলীগের এই নেতা উল্লেখ করেন, বিভিন্ন সময়ে তিনি (হাসানাত) ও তাঁর পরিবার মৃত্যুর মুখে পতিত হলেও সবসময় তাঁরা থেকেছেন নিভৃতচারী। আজ যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা নিজেদের ঢোল নিজেরা পেটাতে ব্যস্ত সেখানে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এবং তাঁর পরিবার সবসময় সকল ত্যাগ তিতিক্ষা নিয়ে আত্মপ্রচার বিমুখ থেকেছেন।

বরিশাল মহানগর আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি অ্যাড. গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল বলেন,‘যারা স্বাধীন বাংলাদেশ চায় নি তারাই আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহকে পিতৃ, সন্তান ও আপনজন হারা করেছে। কিন্তু শোকের সমুদ্র বুকে চেপে দক্ষিণাঞ্চলের আওয়ামী রাজনীতির বটবৃক্ষ হয়েছেন তিনি। এক সন্তানকে হারিয়ে বরিশালের হাজারো আওয়ামী নেতাকর্মীদের নিজের সন্তানের মতো বুকে টেনে নিয়েছেন তিনি’।

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ রুবিনা আক্তার মিরা শৈশব থেকে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এবং তাঁর স্ত্রী সাহান আরা বেগমের সাহচার্যপ্রাপ্ত হয়েছেন। আগস্ট ট্র্যাজেডিতে সন্তানহারা এই দম্পতি কতটা শোক বুকে চেপে দিনযাপন করেছেন তা নজর এড়িয়ে যায় নি এই আওয়ামীলীগ নেত্রীর। তিনি (রুবিনা আক্তার) জানান, এই পরিবারটির সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতায় দেখা গেছে কোনোদিন তারা ১৫ আগস্টের সর্বকনিষ্ঠ শহীদ ছোট্ট সুকান্ত বাবুকে এক মুহ‚র্তের জন্য ভুলতে পারেন নি। তাকে (সুকান্ত বাবু) হারানোর বেদনা এই দম্পতি ভাগ করে নিয়েছেন হাজারো সন্তান সমতুল্য নেতাকর্মীদের বুকে টেনে।

Sharing is caring!