শেষ বয়সেও ভিক্ষায় জীবন সংগ্রাম সন্তান হারা রেহানা‘র

প্রকাশিত: ৩:০৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০

তানিম হাসান ইমন ::

৭৫ বছরের বৃদ্ধা রেহানা বেগম। শেষ বয়সে যার দিন কাটার কথা ছিলো আরাম আয়েশে। কিন্তু সেই সুখ সয়নি এই বৃদ্ধা’র কপালে। জীবনের শেষ বয়সে এসে ভিক্ষার হাত পাততে হচ্ছে মানুষের দ্বারে দ্বারে। সারাদিন ভিক্ষার টাকায় অর্জিত অর্থে চলছে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা ব্যয়ভার। আবার সেই টাকায় চলছে তার জীবন সংগ্রাম।
ভিটা নেই, বাড়ি নেই, নেই মাথা গোঁজার নিজস্ব কোন ঠিকানা। এক ছিলে ছিলো সেও মারা গেছে অনেক আগেই। তাই পেটের দায় এক মুঠো ভাতের জন্য বছরের পর বছর জুড়ে ভিক্ষা করে জীবন পার করছেন রেহানা বেগম।

খোঁজ খবর নিয়ে জানাগেছে, ‘বরিশাল নগরীর সীমান্ত পেরিয়ে কিছুটা অদূরে অবস্থিত বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশার বাদলা গ্রামে স্টীল ব্রিজের নীচে বসবাস করেন বৃদ্ধা রেহানা বেগম।

বরিশাল নগরীর ফরেস্টার বাড়ির পুল সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের সামনে প্রতি শুক্রবার দেখা মেলে এই বৃদ্ধার সাথে। কাউকে দেখলেই ঘোমটা টেনে একটি টাকা ভিক্ষার জন্য হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। সারা দিনের উপার্জন নিয়ে দিনের শেষে বাড়ি ফিরে যান তিনি।

আলাপকালে বৃদ্ধা রেহানা বেগম বলেন, ‘ভিক্ষা করতে মন চায় না। তার পরেও বাধ্য হয়ে পেটের দায়ে ভিক্ষা করতে হচ্ছে। শারীরিক দিক থেকে যখন সক্ষমতা ছিল তখন মানুষের বাসায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতাম। এখন সেই শক্তি নাই। ভারী কাজ করতে পারি না। চোখেও ভালোভাবে দেখি না। তাই বাড়িতে কেউ কাজে নেয় না। এ কারণে ভিক্ষার পথ বেছে নিতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সিরাজ নামের একটি সন্তান ছিলো। সেও মারা গেছে বহু বছর আগে। বর্তমানে মাধবপাশা স্টীল ব্রিজের নীচে একটি কুড়ে ঘরে অতি কষ্টে স্বামীকে নিয়ে জীবন যাপন করছি। স্বামী কাজে অক্ষম। অসুস্থ হয়ে আছেন অনেক বছর ধরে। তার চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিদিন সংসারের ব্যয় আছে।

তাই প্রতিদিন ভোর হলেই লাঠির ওপর ভর করে কয়টা টাকা ভিক্ষার জন্য বেরিয়ে পড়ছি মানুষের দ্বারে দ্বারে। দিনভর শহরের বিভিন্ন স্থানে ভিক্ষা করে যা উপার্জন হচ্ছে তা দিয়েই সংসার এবং স্বামীর চিকিৎসার খরচ কোনভাবে কেটে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থ। কিন্তু ভালোভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না। ভিক্ষা করে যা পাই তা দিয়ে সংসারের খরচই হয় না। যেদিন ভিক্ষা করতে পারি না সেদিন চুলায় আগুন জ্বলে না। অনেক দিন না খেয়েও কাটাতে হয়েছে। কোনরকম আল্লাহ’র দয়ায় বেঁচে আছি।

এদিকে, লাঠিতে ভর করে ভিক্ষা করা এই মানুষটি ঠিকভাবে চোখেও দেখতে পান না, তাই ভিক্ষা করতে গিয়ে অনেক সময় ঘটছে দুর্ঘটনা। আবার বার্ধ্যকের কারণে কথাও বলতে পারছেন না ঠিকভাবে। অথচ বয়সের শেষ সীমায় পৌঁছানো এই নারী স্থানীয়ভাবে বয়স্ক ভাতাসহ সরকারি কোন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন না বলেও দাবি করেছেন।
ভিক্ষুক রেহানা বেগম এর বিষয়ে কথা হয় সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের আঞ্চলিক পরিচালক এ.বি.এম ফারুকের সাথে। তিনি বলেন, ‘ওই বৃদ্ধাকে প্রায় সময় আমাদের এখানে ভিক্ষা করতে দেখছি। তিনি অসহায় এবং যে বয়সে ভিক্ষা করছেন সে বয়সটাতে ওনার বাড়িতে বসে ইবাদত-বন্দেগী করার কথা ছিলো।

তিনি বলেন, ‘আমাদের এখান থেকে ওনাকে যে যার সাধ্য মত সহযোগিতা করছেন। অনেক গ্রাহকও তাকে সহায়তা করে থাকেন। তার পরেও ওই বৃদ্ধাকে প্রতি মাসে কিছু আর্থিক সহায়তা করবেন বলে আশাব্যক্ত করেছেন। তবে এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তর বা বিত্তবানরা যে যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসলে রেহানা বেগম’র মত বৃদ্ধাদের ভিক্ষা করার প্রয়োজন হতো না।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের প্রবেশন অফিসার সাজ্জাদ পারভেজ এর সাথে। তিনি বলেন, ‘ডিসি স্যারের নির্দেশে ইতিপূর্বে আমরা এমন অনেক অসহায় মানুষকে সহযোগিতা করেছি। আমরা চেষ্টা করি তাদের উপকার করার। এ বৃদ্ধার বিষয়টি যখন জেনেছি, তখন দেখছি তার ব্যাপারে কিছু করা যায় কিনা।

Sharing is caring!