শেবাচিম হাসপাতালে ফের নিয়োগ বাণিজ্যের আলামত!

প্রকাশিত: ১১:০৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২১

স্টাফ রিপোর্টার ॥ এক নিয়োগ বাণিজ্যের ঘটনায় গোটা দেশ কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক ডা. নিজাম উদ্দিন ফারুক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুল জলিল। সেই ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন মামলাও করেছে। যা এখনো বিচারাধীন রয়েছে।
পূর্বের নিয়োগ কেলেঙ্কারি না ঘুচতেই নতুন করে আলোচনায় আসলেন শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. বাকির হোসেন ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান। তারাও পূর্বের পরিচালক এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তার দেখানো পথে হেঁটেই তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণির ৩২টি পদে নতুন করে তারা জনবল নিয়োগের পাঁয়তারা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ক্ষেত্রে নিয়োগ নীতিমালার তোয়াক্কা করছেন না তারা। এমনকি স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ ঠেকাতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে জেলা কোটা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে বরিশাল বিভাগের পাঁচটি জেলা। শুধুমাত্র প্রশাসনিক কর্মকর্তা ভোলা জেলার বাসিন্দা হওয়ায় ওই জেলার কোটা রাখা হয়েছে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে।

আবার পরিচালক এবং প্রভাবশালী কর্মচারীদের চাকরি দিতে ভিন্ন পন্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বাসিন্দা বরিশালের হলেও ঘনিষ্ঠজনদের আবেদনে ঠিকানা দেয়া হচ্ছে ভোলা, গাজীপুর এবং টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলার। এমনকি ভুয়া ঠিকানা দিয়ে আবেদন করা ওইসব ব্যক্তিদের আবেদন বৈধতাও দিয়েছে নিয়োগ কমিটি। যারা আগামী ৫ জানুয়ারি মেডিকেল কলেজে অনুষ্ঠিতব্য নিয়োগ পরীক্ষায় বসছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

 

সূত্র মতে, ২০১৫ সালে অবসর গ্রহণের আগ মুহূর্তে তৎকালীন পরিচালক ডা. মো. নিজাম উদ্দিন ফারুক আলোচিত প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুল জলিল এর সহযোগিতায় শেবাচিম হাসপাতালে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীর ১৭২ পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ২১২ জনকে নিয়োগ দেন। এ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগের ভিত্তিতেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ওই নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়। পরে অবশ্য উচ্চাদালতের রায় নিয়ে হাসপাতালে যোগদান করেন নিয়োগপ্রাপ্তরা। তবে পরিচালক ডাঃ মোঃ নিজাম উদ্দিন ফারুক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল জলিলের বিরুদ্ধে আনিত দুর্নীতির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক। ওই মামলাটি নিষ্পত্তি না হতেই আগামী ৭ মার্চ অবসর গ্রহণের আগ মুহূর্তে রহস্যজনকভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছেন বর্তমান পরিচালক ডা. মো. বাকির হোসেন।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য সূত্রে জানাগেছে, গেলো বছরের ডিসেম্বরে হাসপাতালে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীর ১২টি ক্যাটাগরির ৩২টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা, মাদারীপুর ও বাগেরহাট জেলার কেউ আবেদন করতে পারবেন না বলে উল্লেখ করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ মিজানুর রহমানের গ্রামের বাড়ী ভোলা জেলায়। এর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি তৈরির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভোলা জেলাকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন তিনি।

 

অপরদিকে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বরিশাল জেলায় কোটা না থাকলেও বছরের পর বছর ধরে এ হাসপাতালে নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত কতিপয় স্টাফ এবারও নিয়োগ বাণিজ্যে মেতে উঠেছেন। তারা বিভাগের বাইরের বিভিন্ন জেলার ঠিকানা দিয়ে নিয়োগপত্র জমা দিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ মোঃ বাকির হোসেন’র ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত মোঃ আবুল কালাম ওরফে তাজুল। যার বাড়ি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায়। একই উপজেলার সন্তান হাসপাতাল পরিচালকও। তাজুলের বর্তমান ঠিকানা নগরীর ধানগবেষণা এলাকায়। চাকরির বয়সসীমা ২ বছর পূর্বে শেষ হওয়ায় তাজুলও ড্রাইভার পদে চাকরির আবেদন করেছেন। আসল ঠিকানা গোপন করে তার ঠিকানা দিয়েছেন গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মাজুখান গ্রামের।

একইভাবে হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে কর্মরত অফিস সহকারী সৈয়দ আবদুল নান্নান তার মেয়ে সৈয়দা তাজিন আক্তারকে চাকরি দিতে বরিশালের ঠিকানা গোপন করে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের বানীপুর এলাকার বাসিন্দা উল্লেখ করে টেলিফোন অপারেটর পদে আবেদন জমা দিয়েছেন। ইতিপূর্বে বিতর্কিত নিয়োগেও তার পরিবারের পাঁচ সদস্যকে অবৈধ পন্থায় চাকরি পায়িয়ে দেন। তাছাড়া মেয়ে তাজিন বর্তমানে ব্লাড ব্যাংকে অস্থায়ী ভিত্তিতে ল্যাব সহকারী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

 

একই ভাবে গেলো নিয়োগে বরিশালের ঠিকানায় ছেলেকে চাকুরী পাইয়ে দেয়ার পর মেয়ে মারজানা আক্তার শর্শীকে টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ারের মাদারকোল গ্রামের বাসিন্দা পরিচয় দিয়ে টেলিফোন অপারেটর ও লিলেন কিপার পদে দুটি আবেদন করিয়েছেন হাসপাতালের ৪র্থ শ্রেণি কর্মচারী সমিতির সভাপতি মোঃ মোদাচ্ছের কবির।
হাসপাতালের বর্তমান প্রধান সহকারী মোঃ আলমগীর হোসেন সিকদার বরিশালের বাসিন্দা। তিনি ভোলা জেলার চরনোয়াবাদ, ৪নং ওয়ার্ড’র উত্তর চরনোয়াবাদ সড়কের বাসিন্দা পরিচয় দিয়ে তার মেয়ে অর্পিতা ইয়াসমিনকে টেলিফোন অপারেটর ও হিসাব রক্ষক সহকারী পদে আবেদন করিয়েছেন।

 

এভাবেই বরিশালের বাসিন্দা হয়েও বিভিন্ন জেলার ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরির আবেদন করেছেন অনেক প্রার্থী। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও রহস্যজনক কারণে কোন রকম যাচাই বাছাই ছাড়াই তাদের আবেদনগুলোর বৈধতার পাশাপাশি পরীক্ষার প্রবেশপত্র দিয়েছে। এ ব্যাপারে আলাপকালে হাসপাতাল পরিচালক ডাঃ মোঃ বাকির হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘পাবলিক সার্ভিস কমিশন হিসাব নিকাশ করে বরিশাল বিভাগের ভোলা বাদে অন্য জেলার কেউ আবেদন করতে পারবে না বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে। শুধু বরিশালের পাঁচটি জেলায় নয়, এর পাশাপাশি বাগেরহাট ও মাদারীপুর জেলার কোটাও রাখা হয়নি এ নিয়োগে।

 

তিনি বলেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিজানুর রহমান তো কারও চাকরি করে না। আর আমরাও তার আন্ডারে না। সে নিয়োগ কমিটির মেম্বারও না। সে নিয়োগের ব্যাপারে শুধু সহায়তা করতে পারে। আর যারা ভুয়া ঠিকানা দিয়ে আবেদন করেছেন তাদের আবেদন বাতিল অথবা ভাইভায় গিয়ে বাতিল হয়ে যাবে। আমরা তো এনআইডি কার্ড দেখবো। এখানে ৫ সদস্যের কমিটি রয়েছে। যেখানে ডিসি সাহেবের প্রতিনিধি এডিসি সাহেবও রয়েছেন। আপনারা শতভাগ নিশ্চিত থাকতে পারেন, আমরা প্রভাব মুক্ত থাকবো।