শেবাচিম চত্বরে অবৈধ এ্যাম্বুলেন্সে রমরমা বাণিজ্য

প্রকাশিত: ১০:৫৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩১, ২০২১

সরকারি জমিতে অবৈধ স্ট্যান্ড
ট্রিপ পায়না সরকারি এ্যাম্বুলেন্স
আদায় করা হচ্ছে বাড়তি ভাড়া
অবৈধ সিন্ডিকেটের চাঁদাবাজি

খান আব্বাস ॥ বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতাল ঘিরে গড়ে ওঠা অবৈধ এ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট ভাঙছেই না। বরং এর পরিধি দিন দিন আরও বৃহৎ আকার ধারণ করছে। পাশাপাশি হাসপাতাল চত্বরেই সরকারি জমিতে অবৈধভাবে গড়ে তুলেছে অবৈধ এ্যাম্বুলেন্সের স্ট্যান্ড। বছরের পর বছর অবৈধ এ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট আধিপত্য সৃষ্টি করে আসলেও এর বিরুদ্ধে এ্যাকশনে যাচ্ছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। জানাগেছে, ‘দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা সেবার নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান শেবাচিম হাসপাতাল। এ হাসপাতালে সরকারিভাবে তিনটি মাত্র এ্যাম্বুলেন্স সচল রয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তার মধ্যে আবার একটি এ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার হচ্ছে হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যাতায়তের কাজে। বাকি দুটি এ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করা হচ্ছে রোগী আনা-নেয়ার কাজে।

 

ঠিক সেই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্স মালিক সিন্ডিকেট। সরকারিভাবে ভাড়া নির্ধারণ থাকা সত্ত্বেও সরকারি এ্যাম্বুলেন্স সংকটের দোহাই দিয়ে রোগী এবং তাদের স্বজনদের জিম্মি করে বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্সে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। আবার সরকারিভাবে মরদেহ বহনের পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্সেই ভরসা খুঁজে নিতে হচ্ছে। এর ফলে দরিদ্র নিম্নবিত্ত মানুষের বেশি ভাড়ায় এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নেয়াটা রীতিমত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভা-ারিয়া থেকে চিকিৎসা নিতে শেবাচিম হাসপাতালে আসা আবুল কালাম নামের এক রোগীর ছোট ভাই শামীম জানিয়েছেন, ‘চিকিৎসা শেষে ভাইকে বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য সরকারি এ্যাম্বুলেন্সের খোঁজে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা বরিশালে বাইরে যাবে না বলে বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্সের কাছে পাঠিয়ে দেয়। বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিতে গেলে মালিক এবং চালকরা কয়েক গুণ বেশি ভাড়া চেয়ে বসে। অনেক দর কষাকষির পরে সামান্য কিছু টাকা কমে ভাইকে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছি।

 

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, শেবাচিম হাসপাতালের সামনে ৬০-৭০টি’র মত বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। বেশিরভাগের নেই কাগজপত্র। পুরানো মাইক্রোবাসের ছাদে ইমারজেন্সি হুটার এবং গায়ে এ্যাম্বুলেন্স লিখেই মাইক্রোবাসগুলোকে এ্যাম্বুলেন্সে রূপান্তর করা হয়েছে।

 

অপরদিকে, ‘সরকারি নির্র্দেশনা অনুযায়ী একটি এ্যাম্বুলেন্সে যেসব সরঞ্জাম থাকা উচিৎ তার কোনটিই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না অবৈধ এ্যাম্বুলেন্সগুলোতে। থাকার মধ্যে আছে একটি মাত্র স্ট্রেচার এবং মানমাত্র অক্সিজেন সিলিন্ডার। তাও বেশিরভাগ এ্যাম্বুলেন্সে অক্সিজেন সিলিন্ডারও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়াবে। অভিযোগ উঠেছে, দক্ষিণবঙ্গ এ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি নামের একটি ভূঁইফোর সংগঠনের নামে এসব অবৈধ এ্যাম্বুলেন্সের বৈধতা দেয়া হচ্ছে। ওই সংগঠনের নামে গাড়িগুলো চলাচলের জন্য প্রথমে ৪০-৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সংগঠনটির কর্ণধাররা। এরপর মাসে মাসে প্রশাসনিক বিটের নামে আদায় করা হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। যা নিয়ে প্রায়শই ঝগড়া-বিবাদ এমনকি মারামারিতেও লিপ্ত হচ্ছে এ্যাম্বুলেন্স শ্রমিকরা।

 

হাসপাতালের সামনে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এ্যাম্বুলেন্সের কয়েকজন মালিক দাবি করেন, তারা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন। গাড়ি বেশি হওয়ায় অনেক সময় এমন দিন আছে যে ট্রিপ পাওয়া যায় না। অথচ যারা সিন্ডিকেটের হোতা তাদের পকেটে হরহামেশাই টাকা আসছে। তারা জোর করে এক গাড়ির ট্রিপ অন্য গাড়িতে তুলে দিচ্ছে।
তারা আরও অভিযোগ করেন, ‘মাস শেষে আমাদের কাছ থেকে প্রশাসনিক বিটের নামে দেড় হাজার টাকা করে নিচ্ছে দক্ষিণবঙ্গ এ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি নামের সংগঠনের নেতারা। এমনকি তার মাসিক চাঁদাও আদায় করছে আলাদাভাবে। অথচ ওই সংগঠন থেকে আমরা কোন সুযোগ সুবিধা পাই না। তাছাড়া যে সংগঠনের নামে চাঁদা তোলা হচ্ছে সেই সংগঠনেরই কোন বৈধতা নেই।

 

শেবাচিম হাসপাতালের সরকারি এ্যাম্বুলেন্স চালক ইয়ামিন মাতুব্বর বলেন, ‘সরকারিভাবে মাত্র দুটি এ্যাম্বুলেন্স সচল রয়েছে। সরকার নির্ধারিত ভাড়া নিয়েই রোগী পরিবহন করা হচ্ছে এ্যাম্বুলেন্স দুটিতে। বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের কারণে রোগীরা আমাদের কাছে আসতে পারে না। সিন্ডিকেটের লোকেরা চার দিক থেকে ঘিরে ফেলে রোগীদের বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্সের কাছে নিয়ে যায়। এর ফলে সরকারি এ্যাম্বুলেন্স সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগী এবং স্বজনরা। এক কথায় অবৈধ সিন্ডিকেটের কাছে রোগী এবং স্বজনদের পাশাপাশি আমরা সরকারি এ্যাম্বুলেন্স চালকরাও জিম্মি হয়ে পড়েছি।

 

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. বাকির হোসেন এর সাথে। এসময় তিনি বলেন, ‘অবৈধ এ্যাম্বুলেন্স এবং সিন্ডিকেটের বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্তও হয়। কিন্তু মহামারি করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে পিছিয়ে পড়েছে। হাসপাতাল থেকে অবৈধ এ্যাম্বুলেন্স উচ্ছেদ করতে বিভিন্ন দপ্তরে আমরা চিঠি পাঠিয়েছি। শীঘ্রই এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।