শেবাচিমে পরিচালকের অগোচরে মেয়াদ উত্তীর্ণ ডিভাইসে ১০ মাস যাবত প্রেগনেন্সি পরীক্ষা !

প্রকাশিত: ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে নারীদের গর্ভধারণ নিশ্চিতকরণ ডিভাইসের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে প্রায় এক বছর পূর্বে। কিন্তু সেই ডিভাইস দিয়েই চালিয়ে নেওয়া হয় গর্ভধারণ নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা কার্যক্রম।
প্যাথলজি বিভাগের দায়িত্বরতরা রহস্যজনক কারণে বিষয়টি গোপন রাখলেও রোগীর স্বজনদের চ্যালেঞ্জের মুখে অনিয়মের বিষয়টি প্রকাশ পায়। ফলে প্রায় এক বছরের মাথায় এসে মেয়াদ উত্তীর্ণ ডিভাইসগুলো অপসারণ করে নেয় কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগ উঠেছে ডিভাইস সরবরাহকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে প্যাথলজি বিভাগের দায়িত্বরতরা মেয়াদ উত্তীর্ণ ডিভাইস দিয়েই চালিয়ে নিচ্ছিলেন গর্ভবতী নির্ধারণের পরীক্ষা কার্যক্রম। এর মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। তবে বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার তিন দিন অতিবাহিত হলেও রহস্যজনক কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, ‘সবশেষ ২০১৯ সালের শুরুর দিকে শেবাচিম হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে হাসপাতালের সেন্ট্রাল স্টোর থেকে সরবরাহ করা হয়েছিল নারীদের গর্ভধারণ নিশ্চিতকরণ পরীক্ষার ডিভাইস। ওই একই বছর দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ডিভাইস সরবরাহ করেছিলেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এক বছর পূর্বে সরবরাহকৃত ওই ডিভাইস এর তৈরির মেয়াদকাল ২০১৭ সালের অক্টোবর মাস এবং মেয়াদ উত্তীর্ণের সময় ছিল ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে। সে হিসেবে ১০ মাসের অধিক সময় আগে মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে সরবরাহকৃত ওই ডিভাইস। কিন্তু এর পরেও বিষয়টি গোপন রেখেই মেয়াদ উত্তীর্ণ ডিভাইস দিয়ে চলছিল নারীদের গর্ভধারণ পরীক্ষার কার্যক্রম।

এর ফলে নির্ভুল রিপোর্ট তৈরি নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে গর্ভবতী নন এমন নারীদের পরীক্ষার রিপোর্ট পজেটিভ (গর্ভবতী) এবং গর্ভবতী নারীদের পরীক্ষার ফলাফল আসে নেগেটিভ (গর্ভবতী নন)। প্রায় এক বছর ধরে গোপনে এমন অনিয়ম চললেও সবশেষ গত বুধবার (০৮ জুলাই) কাজল বেগম নামের এক রোগীর স্বজনদের চ্যালেঞ্জের মুখে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

প্যাথলজি বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, ‘ওই দিন পিরোজপুরের স্বরূপকাঠী থেকে আসা আনিসুর রহমান চিকিৎসকের পরামর্শে তার স্ত্রী কাজল বেগমের গর্ভধারণ পরীক্ষা করান হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে। সেখান থেকে দেওয়া পরীক্ষার রিপোর্টে তিনি গর্ভবতী বলে নিশ্চিত হন।

তবে প্যাথলজি বিভাগ থেকে দেওয়া রিপোর্ট নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয় রোগী এবং তার স্বজনদের। তাই ফার্মেসি থেকে প্রেগনেন্সি পরীক্ষার “কুইক টেস্ট’ ডিভাইস দিয়ে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা করলে ফলাফল নেগেটিভ আসে। ফলে বিষয়টি নিয়ে কাজলের শংকা আরও বেড়ে যায়। তাই তিনি পুনরায় হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে তৃতীয় বারের মতো পরীক্ষা করান এবং তৃতীয় রিপোর্টে তিনি গর্ভবতী নন বলে ফলাফল আসে।

এদিকে একেক বারের পরীক্ষায় একেক রকম রিপোর্ট কাজল বেগম ও তার পরিবারকে মানসিকভাবে ভীত সন্ত্রস্ত করে তোলে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাম করে দেখতে পান কাজল বেগম গর্ভবতী নন। সেই সাথে হাসপাতালে পরীক্ষার রিপোর্ট নির্ভুল বলে প্রমাণিত হয়।

এর পর পরই কাজলের স্বামীসহ পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগকে চ্যালেঞ্জ করলে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, প্যাথলজি বিভাগে যে ডিভাইস দিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে তার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে প্রায় এক বছর আগে। হাসপাতাল পরিচালককে বিষয়টি অবগত করা হলে বুধবার তাৎক্ষণিকভাবে তিনি প্যাথলজি বিভাগের সকল ডিভাইস অপসারণ করেন।

তবে প্রকাশ পাওয়ার তিন দিন অতিবাহিত হলেও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে দাবি করেছেন হাসপাতাল পরিচালক ডা. মো. বাকির হোসেন। তবে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এস.এম মনিরুজ্জামান বলছেন, ‘বিষয়টি জানার পর পরই ডিভাইসগুলো অপসারণ করে হয়েছে। এর পেছনে কারোর উদাসীনতা বা অনিয়ম রয়েছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অপরদিকে হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, প্যাথলজি বিভাগের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সিনিয়র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আশিষ কুমার সোম। এক বছর আগে তিনিই ইন্ডেন করেন ‘প্রেগনেন্সি ডিভাইস”। তাছাড়া মেয়াদ উত্তীর্ণের বিষয়টি আশিক কুমার সোমসহ প্যাথলজি বিভাগে কর্মরত সকল টেকনোলজিস্টরাই অবগত। এর পরেও বিগত ১০ মাস ধরে ওই ডিভাইস দিয়েই পরীক্ষা করে আসছিলেন তারা।

প্যাথলজি বিভাগের দায়িত্বশীল কয়েকটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, মেয়াদ উত্তীর্ণ ডিভাইস দিয়ে পরীক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার পেছনে সংশ্লিষ্ট বিভাগের ইনচার্জ আশিষ কুমার সোম এর ইন্ধন রয়েছে। তিনি ডিভাইস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে এ অনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এ জন্য আশিষ কুমার সোম একাই নন, বরং প্যাথলজি বিভাগে দায়িত্বরত অন্যান্য টেকনোলজিস্টরাও সুবিধা ভোগ করেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আশিষ কুমার সোম এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে। করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়ায় তিনি কর্মস্থলে আসছেন না বলে জানিয়েছেন তার অবর্তমানে দায়িত্ব পালন করা সিনিয়র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. মজিবর রহমান।

তিনি বলেন, ‘ডিভাইস এর মেয়াদ উত্তীর্ণ এটা আমরাও জানা ছিল না। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পরে এ বিষয়ে আশিষ কুমার সোমকে জিজ্ঞাসা করেছি। আশিষ মেয়াদ উত্তীর্ণ ডিভাইসের বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানালেও তারা গুরুত্ব দেয়নি। তাই ওই ডিভাইস দিয়েই আমরা রোগীদের পরীক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিয়েছি।

অপরদিকে প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মলয় কৃষ্ণ বড়াল দাবি করেছেন, ‘প্রেগনেন্সি টেস্ট ডিভাইসটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তাছাড়া প্যাথলজি বিভাগ থেকে ইতিপূর্বে আমাকে বিষয়টি জানানোও হয়নি। কেন তারা বিষয়টি গোপন রেখে মেয়াদ উত্তীর্ণ ডিভাইস দিয়ে পরীক্ষা কার্যক্রম চালিয়েছে সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ওই ডিভাইস দিয়ে যাতে আর কোন পরীক্ষা না করা হয় সে বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Sharing is caring!