লালমোহনে তিন জনকে পুড়িয়ে মারার ২ বছর : মূল হোতা অধরা

প্রকাশিত: ৯:২৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৩, ২০২১

এসবি মিলন, লালমোহন প্রতিনিধি ॥ ভোলার লালমোহন উপজেলার খাড়াকান্দি গ্রামে তিন জনকে পুড়িয়ে মারার মূল হোতা ধরা পড়েনি দুই বছরেও। কয়েকদফা তদন্ত শেষে এরই মধ্যে আদালতে চার্জশিটও দাখিল করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। হত্যাকা-ের শিকার ব্যক্তিরা সবাই একদিকে নারী আর অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারের সদস্য হওয়ায় ঘটনার বিচার নিয়ে তেমন কোনো তৎপরতা নেই বাদী পক্ষেরও। তবে এলাকাবাসী বলছেন, মূল হোতাকে ধরে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে না পারলে সমাজে এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা বাড়তেই থাকবে। এ অবস্থায় যে কোনো মূল্যে মূল হোতাকে ধরার দাবী জানিয়েছে এলাকাবাসী।

জানাগেছে, ২০১৯ সালের ১৮ জানুয়ারী শুক্রবার রাতে উপজেলার চরভুতা ইউনিয়নের খাড়াকান্দি গ্রামে নিজ ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন সুরমা বেগম (২৫), তার বড় বোন আংকুরা বেগম (৩৫) ও আংকুরা বেগমের শিশু কন্যা খাদিজা আক্তার (৮)। বাড়িতে কোনো পুরুষ সদস্য না থাকায় সেদিন শীতের রাতে লেপ-তোষক মুড়িয়ে একই বিছানায় ঘুমিয়েছিলেন এই ৩ জন। রাতে তারা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন ঘরের পেছনে সিঁদ কেটে ঘরে প্রবেশ করে ঘুমন্ত অবস্থায় লেপ-তোষকে কেরোসিন ঢেলে তাতে আগুন দিয়ে পালিয়ে যান সুরমার স্বামী রফিকুল ইসলাম (৪৫)। পরে সেই আগুনে পুড়ে প্রথমে মারা যান সুরমা। পরের দিন বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেলে মারা যান সুরমার বড় বোন আংকুরা এবং আংকুরার মেয়ে খাদিজা।

বিভৎস্য ও নারকীয় এ হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর ২০ জানুয়ারী নিহতদের বোন শাহিনুর বেগম বাদী হয়ে লালমোহন থানায় মামলা করেন। মামলার এজাহারে নিহত সুরমার স্বামী রফিকুল ইসলামকে প্রথমে সন্দেহভাজন আসামী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরে মামলার তদন্তে বেরিয়ে আসে ঘাতক আর কেউ নন, নিহত সুরমার স্বামী রফিকুল ইসলামই এই ট্রিপল মার্ডারের প্রধান হোতা। এ ঘটনায় মামলা দায়ের হওয়ার পর থেকে আজও পলাতক ঘাতক রফিকুল ইসলাম। এলাকাবাসী বলছে, অনেক সাধারণ অপরাধীকেও পুলিশ চিরুণী অভিযান চালিয়ে ধরে ফেলে। অথচ এই ট্রিপল মার্ডারের খুনিকে দুই বছরেও ধরতে না পারায় জনমনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

এদিকে দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর ২০২০ সালে ১৩ সেপ্টেম্বর আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও লালমোহন থানার ওসি (তদন্ত) বশির আলম। তিনি জানান, এই ট্রিপল মার্ডারের প্রধান হোতা রফিকের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তার সহযোগী ফরিদকে আটক করে জেলে পাঠানো হয়েছে। লালমোহন থানার ওসি মাকসুদুর রহমান মুরাদ জানান, রফিককে ধরার জন্য সব চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তাকে ধরার জন্য যা করার দরকার তাই করে যাচ্ছে পুলিশ। আশা করা যাচ্ছে সে গ্রেফতার হবে।

ঘাতক রফিকুল ইসলাম লালমোহন উপজেলার পার্শ্ববর্তী বোরহানউদ্দিন উপজেলার দেউলা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের পদ্মপুকুর এলাকার বাসিন্দা মৃত ওসমান ঢালীর ছেলে।

কেনো এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ :
বাদীর বক্তব্য, মামলার এজাহার এবং তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে জানাগেছে, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৬ মাস আগে রফিকুল ইসলাম, লালমোহনে এসে তার প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন রেখে সুরমাকে বিয়ে করেন। এর কয়েকদিন পর সুরমাকে নিয়ে রফিক, স্থানীয় কর্তারহাট বাজারের একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। রফিকের টার্গেট ছিলো দরিদ্র পরিবারের সুরমাকে দিয়ে যৌনবৃত্তি করে টাকা উপার্জন করা। সুরমাকে ভাড়া বাসায় উঠিয়ে রফিক তার পরিচিত খদ্দেরদেরকে বাসায় নিয়ে সুরমার সাথে অনৈতিক কাজের চেষ্টা করতেন। এতে সুরমার ঘোর আপত্তির মুখে পিছু হটেন রফিক। এরই মধ্যে রফিকের পূর্বেকার একাধিক বিয়ের তথ্যও জেনে যান সুরমা। এ নিয়ে সুরমা ও রফিকের মধ্যে দাম্পত্য কলহ দেখা দেয়। এক পর্যায়ে বিয়ের মাত্র তিন মাসের মাথায় সুরমাকে ভাড়া বাসায় ফেলে রেখে পালিয়ে যান রফিক। পরে খালি বাসায় একাকিত্ব জীবনের নিরাপত্তা এবং অর্ধহার-অনাহারে ভুগে সুরমা তার পিত্রালয়ের পরিবর্তে বড় বোন আংকুরা বেগমের ঘরে ঠাঁই নেন এবং বোনদের কাছে রফিকের দুশ্চরিত্রের বিষয়টি প্রকাশ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে অজ্ঞাত স্থান থেকে রফিক মাঝে মধ্যে সুরমাকে ফোন করে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ এবং মেরে ফেলার হুমকী দিতে থাকেন। রফিকের এই হুমকীর কারণে ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারী স্থানীয় ব্র্যাক অফিসের মানবাধিকার ও আইন শাখায় অভিযোগ দেন সুরমা। এতে আরো ক্ষেপে গিয়ে সুরমাকে চিরতরে বিদায় করে দিতে সুযোগ খুঁজতে থাকেন রফিক।

নিহত সুরমার বোন ও মামলার বাদী শাহিনুর বেগম জানান, ঘটনার আগের দিন ২০২৯ সালের ১৭ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার সুরমাকে লালমোহন পৌর এলাকার সওদাগর চৌমুহনীতে নতুন ভাড়া বাসায় ওঠানোর আশ্বাস দিয়ে লালমোহন শহরের করিম রোডে ডেকে নেয় রফিক। সেখানে গেলে একটি হোটেলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা রফিককে আমি ও সুরমা দেখে ফেলি। এসময় রফিক ওই হোটেল থেকে কৌশলে পালিয়ে গিয়ে অন্য স্থান থেকে মোবাইলে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করে মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেয়। পরে বাধ্য হয়ে সুরমা ও আমি গ্রামের বাড়ি বড় বোন আংকুরাদের ঘরে গিয়ে সুরমাকে পৌঁছে দিয়ে আমি আমার স্বামীর বাড়ি চলে যাই। এর পর আবারো রফিক ফোন করে সুরমার অবস্থান জানতে চাইলে সুরমা তার বড় বোন আংকুরা বেগমের বাড়িতে আছে বলে রফিককে জানায়। সেই রাতেই আংকুরার ঘরে সিঁদ কেটে প্রবেশ করে রফিক ঘুমন্ত তিন জনের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আর সেই আগুনে পুড়েই বোন ও ভাগিনিসহ করুণ মৃত্যু ঘটে সুরমার।

বাদী শাহিনুর বেগম আরো জানান, মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে রফিককে প্রধান আসামী না করে রফিকের সহযোগী ফরিদকে প্রধান আসামী দেখিয়েছেনু তদন্তকারী কর্মকর্তা। যা আমাদের কাছে প্রত্যাশিত নয়। আমরা এখন কী করবো তাও বুঝে উঠতে পারছি না। এ বিষয়ে লালমোহন থানার ওসি মাকসুদুর রহমান মুরাদ বলেন, রফিক ও ফরিদ দু’জন একই ধারার অপরাধী। যাকে আটক করা গেছে তার নামটি কেবল এক নম্বরে রাখা হয়েছে। এখানে বিচারের ক্ষেত্রে এক আর দুই এমন কোনো নম্বর বিবেচনা হবে না।