যথাযথ সেবা পান না শেবাচিম করোনা ইউনিটের রোগীরা : আছে নিরাপত্তাহীনতা

প্রকাশিত: ৪:২৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ৫, ২০২০

শফিক মুন্সি ॥ বরিশাল বিভাগের কোটি মানুষের জন্য করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে শুধুমাত্র শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম)। কিন্তু সেখানকার করোনা ইউনিট দিনকে দিন রোগীদের কাছে সেবাকেন্দ্র না হয়ে উল্টো দুর্দশার কারু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে চিকিৎসা নেয়া এবং নিচ্ছেন এমন বেশ ক’জন রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া যায় নানা অভিযোগ।

 

তারা জানান, রোগীর মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসক-নার্সদের কাছে পাওয়া যায় না, অক্সিজেন পেতে দিতে হয় ঘুষ, অবজারভেশন (পর্যবেক্ষণ) রুমে একসঙ্গে করোনা পজিটিভ আর নেগেটিভ রোগীদের গাদাগাদি করে থাকতে হয়, মেয়ে রোগীদের উত্ত্যক্ত করেন ওয়ার্ড বয়রা, এমনকি ওয়ার্ডগুলোর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকেও নেই কারো খেয়াল। হাসপাতালটির পরিচালক সবগুলো অভিযোগ অস্বীকার না করলেও জানালেন নিজেদের নানা অভাব আর অক্ষমতার কথা।

গত ২৮ জুন করোনা আক্রান্ত হয়ে সেখানে ভর্তি হন হাসপাতালটিরই একজন নারী ইন্টার্ন চিকিৎসক। তিনি অভিযোগ করেন ভর্তি হবার পরদিন রাত থেকেই সেখানকার দুজন ওয়ার্ডবয় তাকে উত্ত্যক্ত করা শুরু করেন। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিত অভিযোগও দায়ের করেন এই নারী। তিনি আরো উল্লেখ করেন, সেখানে চিকিৎসারত আরো অনেক নারীর সঙ্গেই অযথা ঘনিষ্ঠ হতে চান সেখানকার দায়িত্বরত পুরুষ কর্মচারীরা। এমনকি পর্যাপ্ত নারী ওয়ার্ড অ্যাটেনডেন্টও (পরিচর্যাকারী) থাকেন না সেখানে।

গত জুন মাসের শেষদিকে করোনা উপসর্গ নিয়ে সেখানে ভর্তি হয়ে অবজারভেশন রুমে চিকিৎসা সেবা নেন ব্যাংক কর্মকর্তা ফিরোজ আলম। তাঁর স্ত্রী জানান, উপসর্গ নিয়ে যারাই করোনা ইউনিটে ভর্তি হন সবাইকে অবজারভেশন রুমে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। এখানে বাইরে থেকে রোগীর স্বজনেরাও নিয়মিত আসতে পারেন। এমন ব্যবস্থার কারণে যারা শনাক্ত কিংবা আক্রান্ত নন তাদের মধ্যেও করোনা জীবাণু সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। তিনি আরো উল্লেখ করেন, এখানকার বাথরুম-টয়লেট এমনকি রুমের ফ্লোর জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা হয় না দিনের পর দিন।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অবস্থায় গত সপ্তাহে শেবাচিম করোনা ইউনিটে ভর্তি হন এক সংস্কৃতিকর্মী। ভর্তির পরে নার্সরা এসে অক্সিজেন দিয়ে চলে যান। এরপরে কোনো চিকিৎসক কিংবা নার্সের দেখা পাননি তিনি। গত শনিবার সকালে শ্বাসকষ্ট বৃদ্ধি পাওয়ায় ছটফট করছিলেন। খবর পেয়ে এক গণমাধ্যমকর্মী বিষয়টি হাসপাতালের পরিচালককে বলায় চিকিৎসক গিয়ে দেখে আসেন তাঁকে।

আর হঠাৎ অক্সিজেন স্যাচুরেশন (গ্রহণ ক্ষমতা) কমে যাওয়া এক রোগীর স্বজন জানান ওয়ার্ড বয়দের অবৈধ উপার্জনের কথা। তিনি বলেন, ‘আমার নিকটাত্মীয় গত মে মাসের মাঝামাঝি করোনা আক্রান্ত হয়ে শেবাচিম করোনা ইউনিটে ভর্তি হন। তার প্রয়োজনে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করতে প্রতিবার সেখানকার দায়িত্বরত ওয়ার্ডবয় নিয়েছেন পাঁচশো টাকা। কিন্তু এই পরিষেবা বিনামূল্যে দেবার কথা’।

এসব ব্যাপার নিয়ে কথা হয় শেবাচিম পরিচালক ডাঃ বাকির হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, বর্তমানে সেখানকার চিকিৎসক-নার্সসহ প্রায় দেড়শো জন করোনা আক্রান্ত। এছাড়া দীর্ঘদিন বিভিন্ন পদে নিয়োগ বন্ধ থাকায় আছে জনবল সংকট। এসব কারণে যথাযথ সেবা প্রদানে হিমসিম খেতে হচ্ছে। আর নারী রোগীদের নিরাপত্তাহীনতার সমাধানের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘একজন নারী ইন্টার্নের অভিযোগের ভিত্তিতে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে’।

অন্যদিকে করোনা ওয়ার্ডে নারী ওয়ার্ডবয় বা অ্যাটেনডেন্ট না থাকার কথা স্বীকার করেন তিনি। এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, ‘আমাদের পুরো হাসপাতালেই নারী ওয়ার্ডবয় হাতেগোনা কয়েকজন। যারা আছেন তারা করোনা ওয়ার্ডে ডিউটি করতে চান না’। করোনা রোগীদের এসব সমস্যা সমাধানের জন্য জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে আরো কিছু হাসপাতালকে করোনা চিকিৎসা সেবা প্রদানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান এই চিকিৎসক। তিনি আরো বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কোন রোগীকে আমরা ফিরিয়ে দেই নি। তবে বিভিন্ন সংকটের কারণে যথাযথ সেবা দিতে গিয়ে হিমসিম খেতে হচ্ছে আমাদের। তাই জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ে আরো কিছু হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসা শুরু করা গেলে আমাদের ওপর চাপ কমতো’।