মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা রমিজ আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অন্তহীন

প্রকাশিত: ৫:২৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ১, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার ॥ অভিযোগের পাহাড় জমেছে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এসএম রমিজ আহমেদ এর বিরুদ্ধে। করোনাকালীন সময়েও রোগীর অর্থ ও ত্রাণ আত্মসাত এমনকি করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগসূত্রে জানাগেছে, চলতি বছরের গত ২৩-২৯ এপ্রিল জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ উদযাপনের জন্য করোনার পরিস্থিতিতে দরিদ্র পুষ্টিহীন মা ও শিশু খাদ্যের সমন্বয়ে ত্রাণ, মাস্ক বিতরণ ও সচেতনতায় সপ্তাহব্যাপী স্বাস্থ্য বিভাগের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা গত ৫ মে স্থানীয় এমপিকে নিয়ে লোক দেখানো একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। নামমাত্র এই আয়োজন দেখিয়ে বরাদ্দের বাকি অর্থ নিজেই হাতিয়ে নেন ডা. রমিজ আহমেদ।

এছাড়াও হাসপাতালে রোগ দেখাতে আসা রোগীদের নিয়ে ব্যক্তি বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। হাসপাতালে আসা নরমাল ডেলিভারির রোগীদের বিভিন্ন জটিলতার কথা বলে ২০-২৫ হাজার টাকা চুক্তিতে পার্শ্ববর্তী ক্লিনিকে নিয়ে সিজারিয়ান করছেন ডা. রমিজ। কিন্তু বেসরকারি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে দিচ্ছেন না ওটি চার্জ কিংবা শয্যার ভাড়া। এমনকি ক্লিনিকে অর্থের বিনিময়ে সিজার করা রোগীকে পুনরায় সরকারি হাসপাতালে ভর্তি এবং সরকারি ওষুধপত্রই বিতরণ করা হয়।

অপরদিকে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ডা. এস.এম রমিজ আহমেদ ২০১০ সালে এডহক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে ২০১৪ সালে রেগুলার হন। তিনি বিসিএস না করলেও নামের পরে অভিজ্ঞতার জায়গাতে লিখছেন ‘বিসিএস স্বাস্থ্য’। তার অন্যান্য ডিগ্রি নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। কেননা ১৭ বছরের কোমর ভাঙা এক রোগীর ব্যবস্থাপত্রে তিনি পেইনকিলার সিরাপ দুই চামচ করে দু’বার খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন। যা অভিজ্ঞ মহলে হাসির খোরাক জুগিয়েছে।

অপরদিকে নিজ নামে বরাদ্দকৃত সরকারি বাসস্থানে থাকেন না ডা. রমিজ আহমেদ। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের ৩টি এয়ারকন্ডিশন খুলে দুটি হাসপাতালের কনফারেন্স রুমে লাগিয়েছেন এবং সেখানেই বানিয়েছেন নিজের বেডরুম। আর অন্যটি নিজের অফিস রুমে লাগিয়ে আয়েসী জীবন যাপন করছেন। নিজের অবৈধ প্রভাব বিস্তারের জন্য যাকে যেখানে মন চায় অভ্যন্তরীণ বদলী করছেন। বিশেষ করে ওয়ার্ডবয় মো. জসিম উদ্দিন হাওলাদার কে বাল্ব চুরির অভিযোগে নিজ খাস কামরায় ডেকে নিয়ে লাঠিহাতে মস্তানের ন্যায় ভয়ভীতি ও ক্ষতিপূরণের নামে ৩ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন। সকল ডাক্তার, নার্স, জরুরী বিভাগে কর্মরতদের অযৌক্তিকভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান এবং তাদের সাথে খারাপ অঙ্গভঙ্গি, আচার ব্যবহার করে থাকেন এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

এদিকে করোনাকালে তার বিরুদ্ধে অন্যরকম বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। যা নিয়ে অতি সম্প্রতি জাতীয় দৈনিক, আঞ্চলিক এবং অনলাইন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। দৈনিক সমকালে প্রকাশিত ওই সংবাদে তারা লিখেছেন- ডা. রমিজ আহমেদ উপজেলা থেকে রোগীর নমুনা সংগ্রহের জন্য স্পিডবোট ভাড়া বাবদ পাঁচ হাজার টাকা করে বিল হাতিয়ে নিয়েছেন। একদিনে সর্বোচ্চ ছয় জনের নমুনা পাঠানো বাবদ পাঁচ হাজার টাকা করে মোট ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত স্পিডবোট ভাড়া দেখান তিনি। অথচ করোনা সংকটকালীন সময়ে ব্যবহারের জন্য চরগোপালপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সামসুল বারী মনির তার স্পিডবোটটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিনামূল্যে ব্যবহার করতে দিয়েছেন।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ৫ মে পর্যন্ত ৪৫ জন রোগীর নমুনা বরিশালে পাঠানো হয়েছে। প্রতিজনের নমুনার জন্য পৃথকভাবে বিল করে অতিরিক্ত টাকা নেয়ার কথা স্বীকার করে ডা. এস.এম রমিজউদ্দিন বলেন, শুধুমাত্র মেহেন্দিগঞ্জ হাসপাতাল থেকে বরিশাল সিভিল সার্জন কার্যালয়ে নমুনা পৌঁছানোর স্পিডবোট ভাড়া পান তিনি। স্বাস্থ্যকর্মীদের রোগীর বাড়িতে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করতে আসা-যাওয়ার খরচ সরকারিভাবে দেয়া হয়না। ওই খরচের টাকা তোলার জন্য তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মৌখিক সম্মতিতে প্রতিজন রোগীর জন্য পৃথকভাবে ৫ হাজার টাকা বিল করছেন।

গত ২১ এপ্রিল জেলা সিভিল সার্জন বরাবরে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার একটি প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের হস্তগত হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত ১৭টি নমুনা বরিশালে পাঠানো হয়। তারমধ্যে ১১ জনের নমুনা হচ্ছে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রমিজসহ হাসপাতালের ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর। ১৮ এপ্রিল সকাল ও বিকালে দুইবার ডা. রমিজের নমুনা বরিশালে পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দুইজন নার্স ও এক কর্মচারীসহ ৬ জনের নমুনা পাঠানো হয় ১৭ এপ্রিল। এ প্রতিবেদনে প্রতিদিনই সকাল ও বিকালে একাধিকবার বরিশালে নমুনা প্রেরণ দেখিয়ে প্রতিজন রোগীর জন্য খরচ উল্লেখ করা হয়েছে ৫ হাজার টাকা।

একদিনে একাধিক রোগীর নমুনা পৃথকভাবে বরিশালে পাঠানো হয়েছিল কি-না জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রমিজ উদ্দিন বলেন, নমুনা বিকাল ৪টার মধ্যে বরিশালে পৌঁছানোর নির্দেশ রয়েছে। তাই প্রতিদিন বেলা ১২টার মধ্যে সকল রোগীর নমুনা সংগ্রহের কাজ সম্পন্ন ও যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন শেষে বেলা ১টার মধ্যে স্পিডবোট বরিশালের উদ্দেশে রওনা হয়।

পৃথকভাবে পাঠানো দেখিয়ে প্রতিজনের জন্য ৫ হাজার টাকা খরচ উল্লেখ থাকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, মেহেন্দিগঞ্জ থেকে বরিশাল সিভিল সার্জন কার্যালয়ে নমুনা পৌঁছাতে একদিনের যাতায়াত খরচ ৫ হাজার টাকা দেয় উন্নয়ন সংস্থা ইউনিসেফ। কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামে রোগীর বাড়িতে গিয়ে নমুনা সংগ্রহের খরচ সরকারিভাবে দেয়া হয়না। ওই খরচের ঘাটতি মেটাতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মৌখিক আদেশে তিনি পন্থা অবলম্বন করছেন।
তিনিসহ হাসপাতালের কর্মচারীদের নমুনা সংগ্রহে যাতায়াত খরচ ছিলনা স্বীকার করে ডা. রমিজ বলেন, যাতায়াত খরচ বাবদ প্রথম দফায় বরাদ্দ পাওয়া ৩৫ হাজার টাকা পুরোটাই খরচ হয়েছে। নিজের পকেট থেকে আরও ৮৫ হাজার টাকা খরচ করেছেন। চেয়ারম্যান মনির স্পিডবোট দিলেও জ্বালানীসহ অন্যান্য খরচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হয়।

তখনকার সময়ে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মনোয়ার হোসেন বলেছেন, বরিশাল-মেহেন্দিগঞ্জ আসা-যাওয়ায় রিজার্ভ স্পিডবোট ভাড়া ৬ হাজার টাকা। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নিচ্ছেন মাত্র ৫ হাজার টাকা। এসব বিষয়ে কোন অনিয়ম হলে খতিয়ে দেখা হবে বলে সিভিল সার্জন বলেন। তবে আদৌ তার বিরুদ্ধে কোন তদন্ত কিংবা ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি সিভিল সার্জন।

Sharing is caring!