মৃত্যুপুরী শেবাচিম হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ড : ৮৭ দিনে ৭৫ মৃত্যু !

প্রকাশিত: ৫:০৩ অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। প্রায় প্রতিদিনই ওয়ার্ডটি থেকে বের হচ্ছে কারো না করোর নিথর দেহ। এর মধ্যে কেউ মারা যাচ্ছেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে আবার করোর মৃত্যু হচ্ছে উপসর্গ নিয়ে। সবশেষ গতকাল মঙ্গলবার বিকালের দিকে করোনা উপসর্গ নিয়ে আইসিইউতে একজনের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে গত ২৯ মার্চ থেকে গত ৮৭ দিনে করোনা ইউনিটে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৫ জনে। ফলে অনেকটা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে হাসপাতালের করোনা ইউনিট।

শেবাচিম হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। তবে এর আগে থেকেই দেশব্যাপী হাসপাতালগুলোতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে করোনাভাইরাস আইসোলেশন ইউনিট চালুর নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

নির্দেশনার আলোকে দেশের অন্যান্য জেলার এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ন্যায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও চালু করা হয় করোনা আইসোলেশন ইউনিট। প্রথম পর্যায়ে হাসপাতালের জরুরী বিভাগের একটি কক্ষে পাঁচ শয্যার আইসোলেশন ইউনিট চালু করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে ৯ মার্চ হাসপাতালের পূর্ব পাশে নবনির্মিত পাঁচ তলা ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় ২০০ শয্যার করোনা ওয়ার্ড এবং আইসোলেশন ইউনিট চালু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

প্রথম পর্যায় জরুরী বিভাগে স্থাপন করা করোনা ইউনিট থেকে পাঁচটি শয্যা স্থানান্তর করা হয় নতুন ভবনে। এরপর ১৭ মার্চ থেকে শুরু হয় করোনা ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি কার্যক্রম। ওইদিন করোনা উপসর্গ নিয়ে মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া ভোলা জেলার বাসিন্দা রাসেল মোল্লা নামের ব্যক্তিকে করোনা ইউনিটে প্রেরণ করেন চিকিৎসকরা। এদিকে ইউনিটে রোগীর ভিড় বাড়তে থাকার পাশাপাশি দীর্ঘ হতে থাকে মৃত্যুর মিছিল। ইউনিটটি চালুর পরে সর্বপ্রথম গত ২৯ মার্চ করোনার উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া পটুয়াখালীর জাকির হোসেন নামের ব্যক্তির মৃত্যু হয়। সেই থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৫ জনে।

করোনা ওয়ার্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শুরু থেকে গত ৯৮ দিনে মোট ৫৩৬ জন রোগী করোনার উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। যার মধ্যে মঙ্গলবার পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৭৫ জনের। উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে কোভিড-১৯ পজেটিভ আসে ১৮৯ জনের। এর মধ্যে মৃত্যু হয় ২৮ জনের। এছাড়া মৃত্যু হওয়া ৩৯ জনের করোনার রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। তবে ইউনিটটিতে মৃত্যু হওয়া ৮ জনের রিপোর্ট এখনো অপেক্ষমাণ রয়েছে।

অপরদিকে এ যাবত উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৩৯৩ জনের রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। তাছাড়া করোনা পজেটিভ আসা ১৮৯ জনের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন মোট ১১১ জন। সবশেষ গতকাল মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ইউনিটে ভর্তি ছিলেন ১১১ জন। যার মধ্যে আইসিইউতে আছেন ৯ জন। ভর্তি থাকা ৫০ জনের করোনা পজেটিভ। বাকি ৬১ জনের মধ্যে ৫০ জন রিপোর্টের অপেক্ষায় আছেন। বাকি ১১ জনের রিপোর্ট নেগেটিভ আসায় তাদের মধ্যে ৬ জনকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। তবে একই দিন নতুন করে আরও চারজন উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন এ ইউনিটে।

শেবাচিম হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এসএম মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, ‘করোনার উপসর্গ থাকা রোগীদের আমরা সরাসরি করোনা ইউনিটে ভর্তির ব্যবস্থা করেছি। প্রথমে তাদেরকে আইসোলেশনে রাখা হয়। পরে পরীক্ষার রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। যার রিপোর্ট পজেটিভ আসে তাকে করোনা ওয়ার্ডে স্থানান্তর এবং যাদের নেগেটিভ আসে তাদের ছাড়পত্র দিয়ে বাড়ি পাঠানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘করোনা ওয়ার্ডে রোগীদের চিকিৎসা সেবায় সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, নার্স এবং স্টাফরা কর্মরত থাকছেন। তাদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে এরই মধ্যে আমাদের ১২৪ জন স্টাফ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। যাদের মধ্যে ১৫ জন চিকিৎসক, ৭৬ জন নার্স ও বিভিন্ন পর্যায়ের ৩৩ জন তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। তাদেরও চিকিৎসা চলছে বলে জানিয়েছেন সহকারী পরিচালক।