মুক্তিযোদ্ধা আক্কাস ভাই ৭১ এর আগস্টের সেই দিনে

প্রকাশিত: ১:২৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৯, ২০২০

তপন চক্রবর্তী ॥
সময়টা ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহের শেষ দিকে এক জেলে নৌকায় করে বাকেরগঞ্জের নেয়ামতি থেকে ভারতের উদ্দেশে পাড়ি দিলাম। নৌকায় হিন্দু মুসলমান কয়েক জন মাঝি, কয়েকটি হিন্দু পরিবার, আমি, আওয়ামী লীগ নেতা কাশিনাথ দত্ত এবং আরো কয়েকজন ছিলেন। বলেশ্বর রুপসা রাইমঙ্গল নদীর আর সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে সপ্তাহখানের পরে পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে পৌঁছলাম।

এর মধ্যে একটি ভয়াবহ বিপদের মুখোমুখি হয়েছিলাম যখন আমাদের নৌকা বিশাল রুপসা নদী পাড়ি দিচ্ছিল। রুপসা নদী যেখনে প্রায় ২য় মাইল পাশে নৌকা যখন নদীর মাঝে তখন হঠাৎ দেখতে পেলাম আমাদের পিছন দিকে ছুটে আসছে একটা দ্রুতগামী বড় পাকপেট্রোল বোট। অতি দ্রুত প্রায় ১০০ গজের মধ্যে চলে এল। হিন্দু পরিবারের মধ্যে কয়েকটি মেয়েও ছিল। সবাই ভিতরে চলে গেল আমরা পাটাতনে শুয়ে থাকলাম। দাড়ি লতিফ দাড় বাইতে থাকল। আমাদের সাথে একটা থ্রি নট থ্রি লাইফেল ছিল আর ২০ রাউন্ড গুলি।

কাশীনাথ আমাকে বলল দাদা গুলি করেন কিন্তু আমি চুপ করে শুয়েই থাকলাম। থ্রি নট থ্রির গুলিতে কিছুই হবে না কিন্তু পেট্রোল বোটের মেশিনগানের ঝাঁক গুলিতে কাঠের নৌকা আর আমরা সব শেষ হয়ে যাব। নদীর মাঝে বাঁচার সুযোগ নেই কিন্তু মাত্র গজ ৫০ দূরে থাকতে হঠাৎ পেট্রোল বোট ঘুরে অন্য দিকে চলে গেল মনে হয় কোন জরুরী নির্দেশ এসেছে, যার জন্য পেট্রোল বোট চলে গেল আর আমরাও নতুন জীবন পেলাম। এর দুই দিন পর আমরা পশ্চিম বঙ্গের ক্যানিন এ পৌঁছে গেলাম। রাইফেলটা পুলিশ থানায় জমা দিয়ে আমরা চলে গেলাম।

খোঁজ খবর নিয়ে আমি কয়েক দিন পরে সীমান্তবর্তী শহর বনগাওতে গিয়ে হাজির হলাম উদ্দেশে আক্কাস ভাইর সাথে দেখা করা। আক্কাস ভাই মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং এর জন্য রিক্রুটিং করে যাচ্ছেন। ট্রেনে করে বনগাও শহরে গিয়ে পৌঁছলাম বেলা তখন প্রায় তিনটা। ট্রেনে টিকেট কাটিনি চেকার জিজ্ঞেসা করল বলেছি জয়বাংলা থেকে এসেছি চেকার আর কিছু বলেনি।

বনগাওয়ে তখন বন্যা, শহরের রাস্তায় কোমর সমান জল। হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে জলের মধ্য দিয়ে হেঁটে আক্কাস ভাইর অফিসে গিয়ে পৌঁছালাম। শহরের মধ্যে তখন নৌকা চলে আক্কাস ভাইয়ের অফিসের মধ্যে পায়ের গোড়ালি সমান জল। অফিস বলতে একটা ১৫ ফুট লম্বা ১২ ফুট চওড়া একটি রুম তার মধ্যে একটা ছোট টেবিল দুইটা হাতল ছাড়া চেয়ার একটা আধা ভাঙ্গা খাট এখানেই আক্কাস ভাই দিন রাত পার করে যাচ্ছেন। বন্যার মধ্যে শহরে বেশীর ভাগ এলাকায় বিদ্যুত নেই আক্কাস ভাই হ্যারিকেন জ্বালিয়ে কাজ করেন। একটা রেজিস্ট্রি খাতায় নাম লিখছেন আর কাগজে ক্যাম্পের কথা লিখে সিল দিয়ে ট্রেনিং এর জন্য মুক্তিযোদ্ধাকে ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।

আমার বাবা আইনজীবী সুধীর চক্রবর্তী কে আমাদের বরিশাল শহরের বাসা থেকে ২ তারিখ রাতে পাক আমি ধরে নিয়ে যায় আর সে রাতেই নদীর পাড়ে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। আক্কাস ভাই ভারতে বসেই এ খবর পেয়েছিলেন আর আমার কাছে দুঃখ করলেন তারপর বললেন কয়েকদিনের মধ্যে একটা গ্রুপকে বিহারে ট্রেনিং এ পাঠান হচ্ছে এর সাথে তুমিও চলে যাও। এরপর আক্কাস ভাই বলেন চল রাতের খাওয়া আর বিকালের চা এক সাথে খেয়ে আসি। আমি বললাম এখনও তো পাঁচ টাও বাজেনি এর মধ্যেই রাতের খাওয়া কেন। আক্কাস ভাই বলেন না এরপর অন্ধকার হয়ে আসলে খেতে যাওয়া সমস্যা বিশেষ করে জলের মধ্যে দিয়ে। এতটুকু রুমের মধ্যে আক্কাস ভাই কিভাগে আছেন বাথরুম করেন কোথায় এসব আর জিজ্ঞাসা করিনি। একটু বিশুদ্ধ খাবার জলেরও ঠিক নেই অসুস্থ হলে কোন চিকিৎসা হবে তারও ঠিকনেই ঠিক শুধু একটি তা হল স্বাধীন বাংলাদেশ।

একটি দূরে হোটেল কি খেয়েছিলাম তা আজো মনে আছে। ভাত ডাল বেগুন ভাজা তরকারি আর মাছের ঝোল। ভাতটা বেশী করেই খেয়েছিলাম পরের খাওয়া কখন হয় কে জানে। যাবার আগে আক্কাস ভাই দশটা টাকা দিলেন বললেন কিছু খেয়ে নিও। এরপর জড়িয়ে ধরলেন তার আবেগটা বুঝতে পারলাম। আর দেখ হবে কিনা তার ঠিক নেই। অবশ্য আক্কাস ভাই আমি আমরা যুদ্ধ শেষে ফিরে এসেছিলাম কিন্তু অনেক হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা ফিরে আসেননি। আক্কাস ভাইর মত হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধার আত্মাত্যাগের ফসল এই স্বাধীন বাংলাদশে।

 

Sharing is caring!