মাস্কের দেশ বাংলাদেশ!

প্রকাশিত: ৯:৪৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৭, ২০২০

বশির হোসেন খান, ঢাকা:

বাংলাদেশে রাতারাতি মাস্কের চাহিদা বেড়ে গেছে। দেখা দিয়েছে সঙ্কটও। কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে সরকার। করোনা ভাইরাস নিয়ে উদ্বিগ্ন না হতে সবাইকে আহবান জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, রাজধানীতে নকল ও নিম্নমানের স্যানিটাইজারে সয়লাব। দেদার বিক্রি হচ্ছে এসব ভেজাল সুরক্ষা সামগ্রী। রাতারাতি মাস্কের চাহিদা যাওয়া দেখা দিয়েছে কৃত্রিম সংকট। র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চলতি মাসের শুরুতেই উত্তরায় একটি প্রতিষ্ঠানের গুদামে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরির নকল এন-৯৫ মাস্ক উদ্ধার করা হয়। অথচ বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকদের জন্য প্রস্তুতকৃত এ মাস্কের ধরণ এক ও অভিন্ন হওয়ার কথা।

সুত্র জানায়, স্যাভলনের মতোই কিন্তু তা আসল স্যাভলন নয়। জনপ্রিয় এই ব্র্যান্ডের নামে বিক্রি হচ্ছে নকল পণ্য। এই তালিকায় আছে ‘স্যালভন’, ‘স্যাভলিন’, ‘স্যাভলক্স’, ‘স্যাভল’, ‘স্যাভরন’, ‘স্যাভোলন’, ‘স্যাভেনল’সহ অনেক নাম। করোনা ভাইরাসকে পুঁজি করে নকল পণ্যে বাজার ভরে ফেলেছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এতে ভোক্তারা যেমন প্রতারিত হচ্ছে, তেমনি নকল পণ্য ব্যবহারে বাড়ছে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি। বাজারে অভিযান চললেও ভুঁইফোড় ব্র্যান্ডের অনৈতিক কারবার থামছে না। করোনা থেকে রক্ষাকারী এসব সামগ্রী মানুষ যাচাই না করেই কিনে ব্যবহার করছেন।

এসব সুরক্ষা সামগ্রী নিরাপত্তার বদলে জীবন হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। জানা গেছে, পিপিই, মাস্ক, অক্সি মিটার, পোর্টেবল ভেন্টিলেটর, স্যানিটাইজার, হ্যান্ডগ্লাভস বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামে নকল ও মানহীন পণ্য যেখানে-সেখানে বিক্রি হচ্ছে। দামও লাগামহীন। যদিও এসব পণ্যসামগ্রীর লাগাম টানতে বিভিন্ন বাহিনী নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। কিন্তু কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না এসব ভেজাল সুরক্ষা সামগ্রীর বিক্রি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের মতো জীবাণু থেকে রক্ষা সামগ্রী ব্যবহারে নিজেকে জীবাণুমুক্ত রাখা যায়। কিন্তু এসব সামগ্রী নকল করে বাজারজাত করছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। বিভিন্ন কোম্পানির নাম ব্যবহার করে নকল পণ্য বিক্রি হচ্ছে ফুটপাতসহ বিভিন্ন দোকানে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব নকল পণ্য ব্যবহার করে জীবাণুমুক্ত হতে গিয়ে উল্টো ত্বকের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হ্যান্ড স্যানিটাইজার জাতীয় পণ্যে ৭০ শতাংশের নিচে অ্যালকোহল থাকলে তাতে হাত জীবাণুমুক্ত হবে না। তাই ভালোভাবে দেখেশুনে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের পণ্য রেজিস্টার্ড দোকান থেকে কিনতে বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাজারে অভিযান জোরদারের পাশাপাশি ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ হাসপাতালে ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া গ্লাভস, মাস্কসহ অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করে তা রিসাইকেল করে পুনরায় বিক্রি করছেন। সংশ্নিষ্টদের পরামর্শ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রীর দাম ও মান নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন আইনি নজরদারি দরকার। নতুবা পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। করোনার এই দুর্যোগেও অসাধুরা মানুষের বাঁচা-মরা দেখবে না, হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এতে ভোক্তারা যেমন প্রতারিত হচ্ছেন, তেমনি নকল পণ্য ব্যবহারে বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি। ব্যবহারকারীরা বলছেন, যারা মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে পকেট কাটছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়কের পাশে ফুটপাতে টেবিল বসিয়ে অস্থায়ী দোকান ও ভ্যানে করে বিক্রি হচ্ছে মানহীন নকল মাস্ক, পিপিই, হাত জীবাণুমুক্ত করার সামগ্রীসহ বিভিন্ন সুরক্ষা পণ্য। করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষ এসব নকল সুরক্ষাসামগ্রী কিনছে। দেশীয় কম্পানিগুলো তাদের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় এবং ওষুধের দোকানে নিয়মিত না পাওয়ার সুযোগে এক দল অসাধু ব্যবসায়ী নকল করে বাজারে বিক্রি করছে বলে জানা যায়। আসল হ্যাক্সিসল, হ্যান্ড রাবের বোতল সংগ্রহ করে রং মেশানো পানি ভরে বাজারে বিক্রি করছে মুনাফালোভীরা। অনেক বোতলের ওপর কিছু লেখা নেই; কিন্তু হ্যান্ড রাব ও হ্যাক্সিসল বলে বিক্রি করছে। নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত দাম।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বোতলের গায়ে হ্যান্ড রাব লেখা জীবাণু মুক্ত করার তরল ৩৫০ মিলিলিটার ১৬০ টাকা, ১০০ মিলি ৭০ টাকা। মি. মাসেল হ্যান্ড স্যানিটাইজার ১০০ মিলির বোতলের গায়ে দাম লেখা আছে ২০০ টাকা। তবে বিক্রেতারা বিক্রি করছেন ১৮০ টাকায়। ব্লু-লাইফ হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতলের গায়ে দাম লেখা নেই। তবে ৫০ মিলি ১০০ টাকা বিক্রি করা হচ্ছে। বেশির ভাগ পণ্যের উৎপাদন ও মেয়াদের কোনো তারিখ নেই। পণ্যগুলো কোন প্রতিষ্ঠান আমদানি করছে, তা-ও কোথাও উল্লেখ নেই। গত ১০ জুন নকল ও অনুমোদনহীন স্যানিটাইজার বিক্রির অভিযোগে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার ৪টি দোকানকে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করেছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে প্রায় ৫ লাখ টাকা মূল্যমানের নকল ও অনুমোদনহীন স্যানিটাইজার জব্দ করা হয়েছে।

র‌্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, করোনার সুরক্ষা সামগ্রী এবং ওষুধ নিয়ে নানামুখী অনৈতিক বাণিজ্য হচ্ছে। কেউ কেউ ভেজাল ও মানহীন পণ্য তৈরি করছে। আবার কেউ দেশের বাইরে থেকে এনে কয়েকগুণ দাম রাখছে। এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের লাগাম টানতে বেশ কিছু অভিযান চালানো হয়েছে। শিগগিরই আবার ভেজাল সুরক্ষা সামগ্রীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।

তিনি আরো বলেন, চীন থেকে নকল এন-৯৫ মাস্ক আমদানি করে বিক্রি করা হচ্ছে, এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হচ্ছে। এই অভিযোগ রয়েছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক আবদুুল জব্বার মন্ডল বলেন, গত ২২ মার্চ থেকে ভেজাল সুরক্ষা সামগ্রীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, আদেশ অমান্য করার কারণে একই ব্যক্তি তিন মাসের জেল এবং ৫০ হাজার টাকা জিরিমানার দন্ডে পড়তে পারেন।

Sharing is caring!