মালয়েশিয়ায় রাজনৈতিক সংকট, এক সপ্তাহের ঘটনাক্রম

প্রকাশিত: ১১:১৮ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১, ২০২০

বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ প্রধানমন্ত্রী ডা. মাহাথির মোহাম্মদ ২৪ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করার পর সপ্তাহব্যাপী রাজনৈতিক সংকটে পড়ে মালয়েশিয়া। অবশেষে আজ (রোববার) নতুন প্রধানমন্ত্রী শপথ নেয়ায় সেই সংকটের আপাত অবসান হয়েছে।

মাহাথিরের পদত্যাগ আর তার পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী ৭২ বছর বয়সী আনোয়ার ইব্রাহীমের সঙ্গে গড়া জোটে ভাঙ্গনের মাধ্যমেই সংকটের সূত্রপাত। ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে পাকাতান হারাপান নামের ওই জোট বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়। তারপর ক্ষমতায় আসেন মাহাথির মোহাম্মদ। তবে সম্প্রতি দেশটিতে যে রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয় তার উৎপত্তি মাহাথির ও আনোয়ার ইব্রাহীমের মধ্যকার ভঙ্গুর সম্পর্কের কারণে।

মাহাথির কবে ক্ষমতা ছাড়বেন—এমন প্রশ্ন ওঠার পর থেকেই নানা গুঞ্জন চাউর হয়। সেই ঘটনাক্রম তুলে ধরা হলো-

ফেব্রুয়ারি-২৩
সূত্রের বরাতে রয়টার্স বলছে, এদিন রাজধানী কুয়ালালামপুরে একটি হোটেলে বৈঠকে বসেন দেশটির প্রধান বিরোধী দল ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (উমনোর) পদচ্যুত কিছু নেতা এবং অন্যান্য দলের সদস্যরা। নতুন একটি জোট গঠনের পরিকল্পনা করতেই তাদের এই বৈঠক।

ওইরাতে আনোয়ার ইব্রাহীম বলেন, ক্ষমতাসীন জোটের কিছু নেতা সরকার পতনের চেষ্টা করছেন এবং তাকে প্রধানমন্ত্রিত্ব না দিতেই নতুন সরকার গঠন করা হচ্ছে। সূত্র বলছে, এর আগে ২১ ফেব্রুয়ারি জোটের এক বৈঠকে আনোয়ার সমর্থিত মন্ত্রীরা ক্ষমতা হস্তান্তরের স্পষ্ট দিনক্ষণ জানানোর চাপ দেওয়ায় খুব রেগে যান মাহাথির মোহাম্মদ।

ফেব্রুয়ারি-২৪
মাহাথির পদত্যাগ করেন। তবে ২০১৮ সালের নির্বাচনে মহাথির তার সাবেক দল—যে দলের হয়ে তিনি টানা ২২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন, সেই দলের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে আনোয়ারের সঙ্গে জোট করে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ওই দলের সঙ্গে আবার কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এমন অভিযোগ ওঠায় মর্মাহত হন মাহাথির।

একইদিনে রাজার সঙ্গে দেখা করতে গেলে রাজা নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে অন্তবর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী থাকার নির্দেশ জারি করেন। তবে মাহাথিরের মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া হয়। তার পদত্যাগের ফলে ক্ষমতাসীন পাকাতান হারাপান জোট ভেঙ্গে যায়। মাহাথিরের দল জোট থেকে বেরিয়ে আসে।

ফেব্রুয়ারি-২৫
রাজপ্রাসাদ ফরমান জারি করে, পরবর্তী ধাপে কি করা যায় তা নির্ধারণ করতে সুলতান আবদুল্লাহ আহমাদ শাহ পার্লামেন্টের নির্বাচিত ২২২ জন আইনপ্রণেতার সঙ্গে আলোচনা করবেন। ঐক্যের সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেন মাহাথির, দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলের আইনপ্রণেতাদের তাতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান তিনি।

কিন্তু ২০১৮ সালের নির্বাচনে মাহাথিরের জোট ক্ষমতাসীন যে জোটকে হারিয়েছিল সেই জোট মাহাথিরের এমন সরকার গঠনের প্রস্তাব খারিজ করে দিয়ে নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানায়।

ফেব্রুয়ারি-২৬
পদত্যাগের পর প্রথমবারের মতো মুখ খোলেন মাহাথির মোহাম্মদ। তার সিদ্ধান্তের কারণে দেশে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এর জন্য ক্ষমা চান।

বর্ষীয়ান এই নেতা বলেন, কোনো একক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ততা নেই এমন একটি সরকার গঠনের যে প্রস্তাব তিনি দিয়েছেন, তা যদি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পায় তাহলে পূর্ণ মেয়াদের জন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবেন তিনি।

আনোয়ার ইব্রাহীম মাহাথিরের প্রস্তাবকে ‘পেছন দরজা দিয়ে গঠিত সরকার’ অভিহিত করে এমন ধারণা খারিজ করে দেন। সদ্য ভেঙে যাওয়া ক্ষমতাসীন জোটের তিনটি দল তাকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে আনোয়ার ইব্রাহীমকে মনোনীত করে। পুরনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে এটা ছিল তাদের শোডাউন।

ফেব্রুয়ারি-২৭
মাহাথির রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং এরপর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রাজার সিদ্ধান্তে আগামী ২ মার্চ (আজ রোববার) সংসদের বিশেষ এক অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী হতে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন কার প্রতি রয়েছে তাই দেখা হবে। মাহাথির জানান, যদি কেউই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায় তাহলে আগাম নির্বাচন হবে।

মাহাথিরের মন্তব্য এবং তার বর্ণিত প্রক্রিয়াটির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে অবিলম্বে সন্দেহ তৈরি হতে থাকে চারপাশে। আনোয়ার ইব্রাহীম নেতৃত্বাধীন দলটি বলছে,আনোয়ার নেতৃত্বাধীন দলগুলো বলে, নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের সংসদীয় অধিবেশন আহ্বান রাজার অধিকার এবং ক্ষমতার প্রতি চ্যালেঞ্জ। তবে রাজপ্রাসাদ কোন মন্তব্য করেনি।

ফেব্রুয়ারি-২৮
রাজার কাছ থেকে ফরমান জারি না হওয়া পর্যন্ত ২ মার্চ সংসদের বিশেষ অধিবেশন আয়োজনের অনুরোধ প্রত্যাখান করেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার। রাজা সকল এমপির সঙ্গে সাক্ষাতের পর রাজপ্রাসাদ জানায়, কোনো একজন সাংসদের নতুন সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন আছে এমন বিষয়ের ওপর আস্থা নেই রাজার।

রাজপ্রাসাদ জানায়, বিশেষ সংসদীয় অধিবেশন নয় তবে কোনো রাজনৈতিক নেতা প্রধানমন্ত্রী হতে যথেষ্ট সমর্থন দেখাতে পারেন কিনা তার খোঁজ অব্যাহত থাকবে। এরপর মাহাথিরের দল বারসাতু সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুহিদ্দীন ইয়াসিনকে তাদের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী মনোনীত করে। উমনো এবং ইসলামিক দল পিএএস তাকে সমর্থনের কথা জানায়।

ফেব্রুয়ারি-২৮
মাহাথির বলেন, তিনি তার সাবেক জোট পাকাতান হারপানের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য লড়বেন এবং তিনি বিশ্বাস করে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন তিনি পাবেন। জোটের পক্ষ থেকে মহাথিরকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য পূর্ণ সমর্থন দেওয়া হয়। মাহাথির এবং আনোয়ার ইব্রাহীম পুনরায় মিত্র হয়ে যান।

তারপর এদিন বিকেলে রাজা মালয়েশিয়ার পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুহিদ্দীন ইয়াসিনের নাম ঘোষণা করেন। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতাদের সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা হয়। রাজপ্রাসাদ জানায় আগামীকাল সকালে (আজ রোববার) মুহীদ্দিন শপথ নেবেন।

দেশটির সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৭২ বছর বয়সী মুহিদ্দীন বলেন, মালয়েশিয়ার মানুষ রাজপ্রাসাদের এই সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন। তাকে সমর্থন দেয় উমনো এবং প্যান-মালয়েশিয়ান ইসলামিক পার্টি (পিএএস)—যে দল দুটি ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচেনে আনোয়ার ইব্রাহীম ও মাহাথিরের ‘আশার জোটের’ কাছে পরাজিত হয়েছিল।

সন্ধ্যার পর আনোয়ার ইব্রাহীম বলেন, পার্লামেন্টে পাকাতান হারপানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, ১১৪ জন আইনপ্রণেতা মাহাথিরকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দিয়েছেন। মাহাথির মোহাম্মদ এরপর বলেন, চিঠির মাধ্যমে এই সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনের কথা রাজাকে জানানো হবে।

মার্চ-১
মুহিদ্দীনের সমর্থনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে একটি জরুরি সংসদ অধিবেশন করার প্রতিশ্রুতি দেন মাহাথির মোহাম্মদ। তবে তিনি জিততে পারবেন না বলে পরে স্বীকার করেন। মহাথির আরও জানান, মালয়েশিয়ার রাজা আর কোনোদিন তাকে দেখতে পাবেন না।

মাহাথির অভিযোগ তুলেছেন, প্রধানমন্ত্রিত্ব পাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চক্রান্ত করে আসছেন মুহিদ্দীন ইয়াসিন এবং সাবেক ক্ষমতাসীন দল সংশ্লিষ্ট সরকার তাদের রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করার জন্য প্রস্তুত থাকবে কিনা; সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন মাহাথির। মুহিদ্দীন আজ মালয়েশিয়ার অষ্টম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।