ভুয়া করোনা রিপোর্ট বাণিজ্য : ডা. সাবরিনার পথেই রাজিব মিয়া!

প্রকাশিত: ৩:২২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০২০

বশির হোসেন খান, ঢাকা:

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত (কোভিড-১৯) রোগীদের ভুয়া রিপোর্ট প্রদানের অভিযোগ উঠেছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক মেডিকেল টেকনোলজিস্টের বিরুদ্ধে। জেকেজি চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনার পথে হাটছে রাজিব মিয়া। অর্থের বিনিময়ে এই রিপোর্টগুলো সরবরাহ করতেন বলে জানা গেছে। অভিযুক্তের নাম রাজিব মিয়া। দীর্ঘদিন যাবত সে এই ধরনের অপর্কম করে আসছিল। রোগীদের ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে অধিদফতরেকর পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

জানা গেছে ২-৩ দিন আগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আইনশৃংখলা বাহিনীর একটি দল তাকে নিয়ে গিয়েছিল। রাজিব সম্প্রতি বিশেষ বিবেচনায় অধিদফতরে নিয়োগ পেয়েছেন। এর আগে তিনি আইইডিসিআর’এ অস্থায়ী ভিত্তিতে নমুনা সংগ্রহের কাজ করতেন। সেখানে তিনি রোগীদের নমুনা সংগ্রহের সময় টাকা নেওয়াসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজিব গুলশান নিকেতন আলিশান বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করে বলে জানা গেছে। এর নেপথ্যে কারা জড়িত তা খুজতে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোভিড-১৯ সংক্রান্ত ১০টি পৃথক টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য সচিব ডা. রেজওয়ানুল হক শামীমের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজিব নামে এক টেকনোলজিস্ট অপরাধ করেছে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অধিদফতরের সহকারী পরিচালককে (আইন) প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি তাদের কাজ শুরু করেছে। জানা গেছে, সম্প্রতি রাজধানী ধানমন্ডির একটি বাসার ৫ থেকে ৬ জনের নমুনা সংগ্রহ করেন এই রাজিব। এরপর নমুনাগুলো অধিদফতরে জমা দেন। অধিদফতর থেকে নমুনাগুলো আইইডিসিআর’এ পাঠানো হয়। কয়েক দিন পরে ওই পরিবারের একজন ছাড়া বাকিদের নমুনা পরীক্ষার ফল আইইডিসিআর থেকে পাঠানো হয়। পরিবারের এক সদস্যর ফল না পেয়ে তারা রাজিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। রাজিব নিজে থেকে একটি ফল তৈরি করে নিজের ইমেল থেকে পাঠিয়ে দেন। পরে ওই সদস্যের নামে আইইডিসিআর থেকে ফল পাঠানো হয়। দেখা যায়, নির্দিষ্ট ব্যক্তির শরীরে কোন করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) পাওয়া যায়নি, অর্থাৎ নেগেটিভ। অথচ রাজিবের পাঠানো রিপোর্টে লেখা ছিল পজেটিভ।

আইইডিসিআর থেকে ফল পাওয়ার পর ওই পরিবারের পক্ষ থেকে রাজিবের পাঠানো ফলের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে আইইডিসিআর কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেন রাজিবের ফলাফলটি ভিত্তিহীন, তারা বিষয়টি অধিদফতরের নজরে আনেন। এরপরেই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

আইইডিসিআর ও অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, রাজিব মিয়া সম্প্রতি নিয়োগপ্রাপ্ত ১৪৫ জন মেডিকেল টেকনোলজিষ্টের একজন। অধিদফতরের নিয়োগ তালিকায় তার নাম ছিল ১৯ নম্বরে। নিয়োগের জন্য অধিদফতরের পরিচালকের (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) তালিকায় তাকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। নিয়োগের পর তার পদায়ন হয় বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তবে নিয়োগের পরও তাকে সংযুক্তিতে অধিদফতরে রেখে কোভিড রোগীদের নমুনা সংগ্রহে জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল।

এর আগে বিপ্রজিত তালুকদার নামের আইইডিসিআরে অপর এক টেকোনলজিস্টের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠে। তখন আইইডিসিআর কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করে পুলিশে সোপর্দ করেন।

ঢামেক সূত্র জানায়, ঢামেক হাসপাতালের মূল ভবন বাদে নতুন ভবন ও পুরাতন বার্ন ইউনিটে চলছে করোনা রোগীদের চিকিৎসা। চলতি বছর ২ মে থেকে বার্ন ইউনিটে শুরু হয় করোনা রোগী ভর্তি কার্যক্রম। এরপর অতিরিক্ত রোগী হওয়ায় হাসপাতালের নতুন ভবনেও চালু করা হয় করোনা ইউনিট। হাসপাতালটিতে করোনা ইউনিট চালু করার পর গত ২৬ আগষ্ট পর্যন্ত করোনা ইউনিটে ১৬০২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

হাসপাতালটির বর্তমান শয্যাসংখ্যা পুরাতন বার্ন ইউনিট মিলিয়ে ২ হাজার ৯০০। তবে নতুন ভবনের করোনা ইউনিটে ভর্তি রয়েছে ১৯১০ এবং পুরাতন বার্ন ইউনিটে ভর্তি রয়েছে ৩০০ জন করোনা পজিটিভ ও সাসপেক্টেড রোগী। আর হাসপাতালটির মূল ভবনে ভর্তি রয়েছে অন্যান্য সব বিভাগ মিলিয়ে ২৩০২জন (নন পজিটিভ)।

অভিযুক্ত রাজিব বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয়। আমি তো ডাক্তার নয়। যে আমি রিপোর্ট দিবো।
ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসক ডা. মজিবুর রহমান বলেন, করোনা রিপোর্ট নিয়ে কোনো তালবাহানা চলবে না। রাজিব বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে এর সঙ্গে আরো কেউ জড়িত আছে কিনা।

এ ব্যাপারে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক বিষয়, হাসপাতলের করোনা রিপোর্ট রাজীব ইচ্ছে মত দিয়ে টাকা আয় করছে। রাজিব যে সব রিপোর্ট দিয়েছে তা সব ভুয়া। রাজিব এর বিরুদ্ধে ব্যাবস্থ্য নেওয়া হবে।

সম্প্রতি জেকেজি’র ব্যাপারে বিশদ তদন্ত করতে গিয়েই উঠে আসে ডা. সাবরিনা ও তার প্রতারক স্বামী আরিফ চৌধুরীর নাম। তদন্ত করে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে কোনো পরীক্ষা না করেই প্রতিষ্ঠানটি ১৫ হাজার ৪৬০ জনকে করোনার টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট সরবরাহ করেছে। একটি ল্যাপটপ থেকে গুলশানে তাদের অফিসের ১৫ তলার ফ্লোর থেকে এই মনগড়া করোনা পরীক্ষার প্রতিবেদন তৈরি করে হাজার হাজার মানুষের মেইলে পাঠায় তারা। প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় থেকে জব্দ ল্যাপটপ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর করোনা টেস্ট জালিয়াতির এমন চমকপ্রদ তথ্য মেলে। এতে দেখা গেছে, টেস্টের জন্য জনপ্রতি নেওয়া হয় সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা। বিদেশি নাগরিকদের কাছে জনপপ্রতি একশ’ ডলার। এ হিসাবে করোনার টেস্ট বাণিজ্য করে জেকেজি হাতিয়ে নিয়েছে সাত কোটি ৭০ লাখ টাকা।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত সাবরিনার হাত ধরেই করোনার স্যাম্পল কালেকশনের কাজটি ভাগিয়ে নেয় অনেকটা অখ্যাত জেকেজি নামে এই প্রতিষ্ঠান। প্রথমে তিতুমীর কলেজে মাঠে স্যাম্পল কালেকশন বুথ স্থাপনের অনুমতি মিললেও প্রভাব খাটিয়ে ঢাকার অন্য এলাকা আর অনেক জেলা থেকেও নমুনা সংগ্রহ করছিলেন তারা। গত ২৪ জুন জেকেজির গুলশান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে আরিফসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। দু’জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। জেকেজির কার্যালয় থেকে ল্যাপটপসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি জব্দ করে পুলিশ। এ ঘটনায় তেজগাঁও থানায় মোট চারটি মামলা দায়ের করা হয়। সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের নমুনা সংগ্রহের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তি ছিল জেকেজির। পরে ওই চুক্তি বাতিল করা হয়।

Sharing is caring!