ভুল এই নগরীর অনেকের! একটু জোয়ার কিংবা বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় বরিশাল

প্রকাশিত: ১:১০ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২২, ২০২০

শফিক মুন্সি  ::

টানা তিনদিন যাবৎ বরিশাল নগরীর পার্শ্ববর্তী কীর্তনখোলা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হচ্ছে। কার্যকর বেড়িবাঁধ ও নদীর স্বাভাবিক নাব্যতার কমতি থাকায় জোয়ারের পানি প্রবেশ করে তলিয়ে যাচ্ছে বরিশাল নগরীর অধিকাংশ জায়গা। অন্যদিকে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সক্রিয়তার অভাব, দখল – দূষণে খালের মৃত্যু ,জলাশয় ভরাট প্রভৃতি কারণে জমে থাকা পানি সরতে না পেরে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। চলতি মাসে এমন ঘটনা এই নিয়ে দ্বিতীয়বার ভোগাচ্ছে নগরবাসীকে। আর এমন জলাবদ্ধতার পিছনে ভুল আছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক দপ্তর এমনকি নগরবাসীরও। এমনটাই জানালেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা।

তবে পিছনের ভুল শুধরে এখনই সাবধান না হলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চল বাসযোগ্যতা হারাবে বলে আশংকা তাদের।

জানা গেছে, প্রতিনিয়ত নগরীর মধ্যকার জলাশয় (পুকুর, ডোবা প্রভৃতি) ভরাট করে অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে। সাথে সাথে নদীর পাড় দখল ও যেখানে সেখানে বর্জ্য ফেলার মনোভাব নগরবাসীর। এই শহরের বাসিন্দাদের এসব ভুলে জলাবদ্ধতা বর্তমানে বিগত দিনের চেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্যদিকে গত দুবছর যাবৎ বরিশালে নতুন কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ হয় নি। এছাড়া দখল – দূষণে মৃত খাল রক্ষায় কার্যকর দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি)। অন্যদিকে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহধারা অক্ষুণ্ন রাখতে এবং নাব্যতা রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে পিছিয়ে রয়েছে প্রশাসন।

বারবার এই নগরী জলাবদ্ধতার শিকার হবার পিছনে নগরবাসী ও স্থানীয় সরকারের উদাসীনতাকে দুষলেন অর্থনীতিবিদ ও ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ শিক্ষক আক্তারুজ্জামান খান। তিনি বলেন,‘ নগরীর আধুনিকায়নের জন্য কতটুকু পরিকল্পিত সড়ক কিংবা ড্রেনেজ ব্যবস্থা হবে সেটা এখানকার কেউ জানে না।কোনো বাসিন্দা তাঁর স্থাপনা তৈরির সময় ড্রেন কিংবা পাকা রাস্তার জন্য কতটুকু জায়গা ছাড়বে সেটা তাঁর অজানা।তাকে এ বিষয়ে কোনো দপ্তর থেকে অবহিতও করা হয় না। এছাড়া জলাশয় ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণে বাধা দেবার মতোও দায়িত্বশীল আচরণ কোন দপ্তর করে না’। এসব কারণে বৃষ্টি বা জোয়ারের জমা পানি সহজে অন্যত্র সরে না বলে জানান তিনি। এই সমস্যা এখনই সমাধানে সকলে সচেষ্ট না হলে দুর্যোগের ধারাবাহিকতায় শীঘ্রই এ জনপদ বসবাসের অনুপযোগী হতে পারেও বলে আশংকা তার।

নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নদীর নাব্যতা ধরে রাখার ব্যাপারে সকলের অসহযোগী মনোভাব জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বলে দাবি করেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক স্বর্ণালি মাহমুদ। তিনি বলেন,‘যেখানে সেখানে ময়লা ফেলার ফলে সেই আবর্জনা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে ড্রেনে ও খালে গিয়ে আটকে যায়। এই অবস্থায় জোয়ার বা বৃষ্টির জমে থাকা পানি সহজে সরতে পারে না। অন্যদিকে নদীর পাড় দখল করে নদীর প্রবাহধারা সংকুচিত করে ফেলা হচ্ছে। এতে করে অল্প জোয়ারেই পানি স্থলভাগে ঢুকে পড়ে’। এই সমস্যা সমাধানে নগরের বাসিন্দাদের যেখানে সেখানে বর্জ্য ফেলা ও নদী দখলের মনোভাব থেকে সরে আসার পরামর্শ দেন এই শিক্ষক। সাথে সাথে সরকার ও প্রশাসনকেও এ ব্যাপারে তদারকি করার আহবান জানান তিনি।
নদী ও খাল বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিপলু বলেন,‘এই বরিশাল নগরীর ভেতরে প্রবাহমান খাল ছিল ২২টি। গত ১০ বছর আগে জলাশয় (পুকুর ও ডোবা) ছিল প্রায় ১০ হাজার। এখন সেখানে ৫শত জলাশয় আছে কিনা সন্দেহ। জলাশয় ভরাট করে অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে নগরীজুড়ে। ড্রেন এবং খাল সংস্কার হচ্ছে না কার্যকরভাবে। যে কারণে বেশিরভাগ খাল বিলুপ্তির পথে। হ্রাস পেয়েছে নদীর নাব্যতা। এসব কারণে নগরীর পার্শ্ববর্তী কীর্তনখোলায় পানি বৃদ্ধি পেলেই স্থলভাগে প্রবেশ করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু সমস্যা সমাধানে সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় নগরবাসী দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগে পড়তে যাচ্ছে’। তিনি আরো জানান, এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে দ্রæত নদী ও খাল খননের মাধ্যমে গভীরতা বৃদ্ধি এবং শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।

আর বর্তমান জলাবদ্ধতা সমস্যার ব্যাপারে জনপ্রতিনিধিদের ব্যর্থতা তুলে ধরে সাধারণ মানুষদের সোচ্চার হবার আহবান জানিয়েছেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) বরিশাল জেলা শাখার সদস্য সচিব ডাঃ মনীষা চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘বিসিসি’র দায়িত্বে যারা আছেন তারা প্রতিবার বিশাল অংকের বাজেট প্রণয়ন করলেও কোনো দৃশ্যমান কাজ করেন নি শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে। গত দুবছরে নগরীতে নতুন কোন ড্রেন নির্মাণ হয় নি এবং দখল – দূষণে মৃত খালগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা নজরে আসে নি’।জনপ্রতিনিধিদের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ বর্তমান জলাবদ্ধতা সমস্যা বাড়িয়েছে। যা প্রতিহতে নগরবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে বলে জানান তিনি।

Sharing is caring!