বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের জন্য হাহাকার

প্রকাশিত: ৯:১৭ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০১৯

সেদিন আষাঢ়ী পূর্ণিমার চাঁদও মনে হচ্ছিল বিবর্ণ। কারণ, পূর্ণিমার সন্ধ্যায় তিস্তাপাড়ে ভাঙনের শিকার অনেক পরিবারের করুণ আর্তিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। সন্ধ্যায় তিস্তার পানির গর্জনে নদী তার ভয়ংকর রূপেরই জানান দিচ্ছিল। কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের কালীর মেলার পাশেই অনেকগুলো বাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। পূর্ণিমার সন্ধ্যায় লক্ষ্মী চৌকিদার জলের দিকে আঙুল নির্দেশ করে দেখাচ্ছিলেন কার বাড়ি কোথায় ছিল। কয়েকবার বাড়ি ভাঙার পর কালীর মেলায় তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই বাড়িও নদীগর্ভে ভেঙে যাচ্ছে। একটিমাত্র ঘর আর বাকি আছে। ওই ঘরে পরিবারের সবাই মিলে ঘুমাবেন।

তিস্তার কিনারে ভাঙনের মুখে ঘুমাতে ভয় করে কি না, জিজ্ঞাসা করতেই একজন মহিলা বললেন, ‘নিন্দ কি আর আইসে বাহে? রাইত জাগি পাহারা দেওয়া নাগে।’ পাশেই আরেকটি ঘর। ওই পরিবারেরও সবকিছুই ভেঙে গেছে। একটিমাত্র ঘর আছে। জানলাম ওই একটিমাত্র ঘরে ১২–১৪ জন রাত যাপন করেন। ভাঙনের শিকার মানুষগুলোর মুখে গভীর বিষাদের ছায়া। তাঁদের দিকে তাকানো যায় না।

পরদিন বন্যা পরিস্থিতির অবস্থা বোঝার জন্য যাচ্ছিলাম কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলায়। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার মধ্যকুমরপুর ইউনিয়ন পর্যন্ত কোনোরকম যাওয়া গেছে। তারপর আর যাওয়ার কোনো উপায় নেই। সড়কের যে অংশ পানির নিচে ডুবে যায়নি, তার দুপাশে ছোট ছোট প্লাস্টিকের ছাউনি তৈরি করা। এর কোনোটিতে গবাদিপশু, কোনোটিতে মানুষ রাত যাপন করছে। আমরা সংবাদমাধ্যমে যে ভয়াবহ দৃশ্য দেখি, তা খুবই সামান্য। পাকা সড়কে চলছে নৌকা। কলার ভেলায় করে গুরুত্বপূর্ণ মালামাল সরানো হচ্ছে। কেউ কেউ চৌকির ওপর চৌকি দিয়ে ঘরের ভেতরেই থাকছেন। কয়েক শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অসংখ্য পরিবারের অপরিহার্য জিনিসপত্র ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। শৌচাগার নেই। আমার এক বন্ধু নিত্য কুলু। বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা। তারা সংস্থার পক্ষে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করছে। সে বলছিল, বিশুদ্ধ পানি এবং শুকনো খাবারের চরম হাহাকার এখন বন্যাদুর্গত এলাকায়।

কুড়িগ্রাম জেলায় চরের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। এসব চরে যে মানুষগুলো আছে, তাদের অবস্থা উপলব্ধি করা কঠিন। শতকরা হারে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি গরিব লোক বাস করে কুড়িগ্রামে। ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ এখানে গরিব। গত মৌসুমে যাঁরা ধান চাষ করেছিলেন, তাঁরা ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তাঁদের হাতেও টাকা নেই। চলতি বন্যা তাঁদের আরও কাবু করে তুলবে। এবারের বন্যায় সব ফসল পানিতে ডুবে গেছে। যাঁরা মাছ চাষ করেছেন, তাঁদের পুকুরের মাছ এখন নদীতে। গবাদিপশুগুলোর খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকট চলবে অনেক দিন।

কুড়িগ্রামে বড়-মাঝারি-ছোট মিলে নদীর সংখ্যা প্রায় ৫০টি। এর মধ্যে আন্তসীমান্ত নদী ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, কালজানি, গদাধর, সংকোশ, গঙ্গাধর, জিঞ্জিরাম, হলহলিয়া, দুধকুমার, বারোমাসি, নীলকমল, ফুলকুমার, কালো, ধন্নী (ধরণী), তোরসা, গিরাই। এই বড় নদীগুলো ছাড়াও বর্ষায় ছোট নদীগুলোও অনেক বড় আকার ধারণ করে। প্রস্থে ব্রহ্মপুত্র ২০ কিলোমিটার, তিস্তা ১২ কিলোমিটার, ধরলা ৫ কিলোমিটার রূপ ধারণ করে। মাঝারি এবং ছোট নদীগুলো মিলে আরও প্রায় ১৫ কিলোমিটার প্রস্থে রূপ ধারণ করে। এ জেলায় বর্তমানে অর্ধশতাধিক কিলোমিটার প্রস্থে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এ বছরের বন্যা ভারত থেকে আন্তসীমান্ত নদী দিয়ে নেমে আসা পানিতে হয়েছে।

বন্যা এ বছরই যে প্রথম এমন হয়েছে তা নয়। প্রায় প্রতিবছর এ জেলায় বন্যা দেখা দেয়। এ বছর বেশি হয়েছে। সরকারিভাবে এই বন্যা প্রতিরোধের কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয় না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা হবে। এর হাত থেকে শতভাগ রক্ষা পাওয়ার উপায় নেই। কিন্তু বন্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমানে কুড়িগ্রামে যে নদীগুলো আছে, সেই নদীগুলো ২০ বছর আগেও যে পরিমাণ পানি বহন করতে পারত, এখন আর তা পারে না। কারণ, নদীগুলোর গভীরতা কমেছে এবং সে কারণেই প্রস্থে বেড়েছে। কুড়িগ্রামের ৫০টি নদীর পাড়ে গিয়ে আমি স্থানীয়দের কাছে শুনেছি, নদী আগে অনেক গভীর ছিল।   এক বছরের বন্যা আর ভাঙনে কুড়িগ্রামে যে পরিমাণ সম্পদ নষ্ট হয়, তার চেয়ে অনেক কম বরাদ্দ দিয়ে যদি নদীর গভীরতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া যেত, তাহলে নদীপারের লাখ লাখ একর জমি আবাদি হয়ে উঠত এবং বন্যাও অনেক কমে আসত। বন্যা প্রতিরোধের ন্যূনতম চেষ্টা না থাকার কারণেই আজ এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নদীর পরিচর্যাই সারা দেশের বন্যা কমিয়ে আনতে পারে।

Sharing is caring!