বাড়িঘর ছেড়েছে বাঁধভাঙা জনপদ রাবনাবাদ পাড়ের শতাধিক পরিবার

প্রকাশিত: ৮:৩৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০

মেজবাহ উদ্দিন মাননু, কলাপাড়া প্রতিনিধি ::

সেই সিডরের রাতে শুরু, এরপর দুঃখ কষ্ট যেন আর থামছে না। রাবনাবাদ পাড়ের হাজারো জেলে-কৃষক পরিবারে বছরের ছয় মাসের পানিবন্দীদশার অবর্ণনীয় দূর্ভোগ এক যুগেও কাটেনি। এখন শুধু পানিবন্দী দশা নয়। যোগ হয়েছে অস্বাভাবিক জোয়ারের হানা। জলোচ্ছ্বাসে ভাসছে সবকিছু, বসত ঘরটি ডুবে যাচ্ছে। ভিজে যাচ্ছে চাল-ডালসহ ঘরের আসবাবপত্র পর্যন্ত। চালচুলা পর্যন্ত নেই শতকরা ৯০ জনের। গেল অমাবস্যার জোতে টানা পাঁচদিনে দুই দফা এমন দুর্ভোগে ছিল সকল মানুষ।

এখন জলোচ্ছ্বাসের তান্ডব থেমেছে। কিন্তু রাবনাবাদ নদী যেন নতুন করে ভাঙনের তান্ডব শুরু করেছে। বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধটির যেটুকু ছিল তাও এ কয়দিনে গিলে খেয়েছে। এসব চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নেই যে মানুষগুলো কতো কষ্টে আছে। উপোস, অর্ধাহার নিত্যদিনের পরিণতি। এদেরই এক অসহায় রেবেকা বেগম-রফিক মিরা দম্পতি। বসতি ছিল নয়াকাটা গ্রামে। জমি-জিরেত আবাদ করতেন। মাছ ধরতেন রাবনাবাদ নদীতে। জীবিকার যোগান দেয়া নদী গিলে খেয়েছে গোটা নয়াকাটা গ্রাম।

এখন আছে শুধু কাগজে কলমে। গেরস্ত পরিবার থেকে রেবেকা-রফিক দম্পতি ভূমিহীন হয়ে যায়। রেবেকা আবার প্রতিবন্ধী নারী। উপায় না পেয়ে বসতি করেন (ঝুপড়ি ঘর) বেড়িবাঁধের স্লোপে। নদীকেই অবলম্বন করে বেঁচে থাকার নতুন লড়াই শুরু করেন। তাও ২০০৭ সালের ভয়ঙ্কর সিডর সবকিছু লন্ডভন্ড করে দেয়। পরিণত হন ছিন্নমূল পরিবারে। তারপরও ভাঙাবাঁধের স্লোপে থাকার শেষ চেষ্টা করেছেন। পারেন নি।

এরপরে বছরের পর বছর নিত্যদিন, পূর্ণিমা-অমাবস্যায় ভাসছে বাড়িঘর। সবকিছু। আর পারছিলেন না। কাহিল হয়ে পড়েছেন। প্রকৃতির রুদ্ররোষের কাছে হেরে গেলেন। প্রায় তিন যুগের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। অবশেষে, প্রায় চার বছর আগে রফিক মিয়া স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সবকিছু ছেড়ে শ^শুর বাড়ি লালুয়ার গোলবুনিয়া গ্রামে গিয়ে বসতি গেড়েছেন। পরিবারটির ঠিকানা পাল্টে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ রাবনাবাদ। এখন ছয় জনের সংসার নিয়ে মানুষটি কৃষিকাজ করে জীবিকার চাকা ঠেলছেন।

নয়াকাটা গ্রামের আরেক দম্পতি আহসান মালকার-জায়েদা রঙ্গন। সবকিছু ছেড়ে পাঁচ জনের সংসার নিয়ে এখন আশ্রয় নিয়েছেন মৃত শ^শুর ছয়জদ্দিনের ধঞ্জুপাড়া গ্রামে। আহসান মালকার সাবকন্ট্রাক্ট কাজ করে সংসারের যোগান দিচ্ছেন। ছয় জনের সংসার নিয়ে সুলতান প্যাদা-জুলেখা বেগম দম্পতি নয়াকাটায় কৃষিকাজ করতেন। থাকতে দেয়নি রাবনাবাদ। বাধ্য হয়ে মহল্লাপাড়া গ্রামে ১৫ শতক জমি কিনে বাড়ি করে এখন সেখানে থাকছেন। সিডরের পরে এ দম্পতি নয়াকাটার ঠিকানা হারায়।

একইভাবে চারিপাড়ার জেলে মোশাররফ সরদার ছয় মাস আগে সপরিবারে চলে গেছেন মেরাউপাড়া গ্রামে। জেলে সবুজ মিয়া চারিপাড়ায় থাকতে বহুবার ঘর পাল্টেছেন। সিডরের পরেও দশ শতক জমি কিনে গ্রামটির মায়ায় পড়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। পাঁচ মাস আগে গ্রাম ছাড়তে হয়েছে রামনাবাদের গ্রাসে। এখন এ মানুষটির ঠিকানা মেরাউপাড়া গ্রামে। দশকানি গ্রামে চলে গেছেন আরেক জেলে বাদশা প্যাদা।

কামাল প্যাদা তার মা, স্ত্রী-সন্তানসহ সাতজনের সংসার নিয়ে এখন পাশের বালিয়াতলী ইউনিয়নে এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান নিয়েছেন। শাহীন হাওলাদার গ্রাম ছেড়ে বানাতি বাজার বেড়িবাঁধের কাছে আশ্রয় নিয়েছেন। জেলে মেছের মোল্লা স্ত্রী-পরিজন নিয়ে দুই মাইল দূরে চলে গেছেন। এভাবে ২০১৫ সালে আরও ১৫টি পরিবার এলাকা ছেড়েছে। সাবেক ইউপি মেম্বার মজিবর রহমানের দাবি এ পর্যন্ত কমপক্ষে এক শ’ পরিবার দু’টি গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। স্থানীয়রা আরও জানালেন শত পরিবার সিডরের পর থেকে রানাবাদ পাড়ের বাড়িঘর বসতি সব ছেড়ে চলে গেছেন। এখনও যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন শত পরিবার।

এখন নদীর পাড়, গ্রাম কিংবা জনপদ সব এক হয়ে যায় অমাবস্যা-পূর্ণিমার জোর পানিতে। চারদিকে পানি থৈ থৈ করে। বহু পরিবারের খালি ঘরটি পড়ে আছে। নিজেরা দুরে কোথাও গিয়ে থাকছেন। বাঁধভাঙা এ জনপদের দেড় হাজার পরিবারের দুঃখ লাঘবে সিডরের পর থেকে একবার ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে মেরামত করা হয়েছে। ব্লক না দেয়ায় যা হওয়ার তাই। মাটির বাঁধ ফের ভেসে গেছে। মানুষের বক্তব্য নুন আর তেল ছাড়া তাঁদের আর কিছুই কিনতে হতোনা। সব কৃষিক্ষেত থেকে তারা পেতেন। ফলাতেন ধান থেকে রবিশস্যসহ সকল ফসল, শাক-সবজি। বাড়িতে ছিল ফলফলাদির গাছে পরিপূর্ণ। মাছ ছিল পুকুর ভরা। হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু পালতেন সবাই। যেন সাজানো ছিল সবকিছু। আর এখন সেসব সুখের অতীত। ইট বিছানো রাস্তায় চলাচল করতেন। সব যেন হারানো অতীত।

পরিবারের কর্মক্ষম মানুষটি রাবনাবাদ থেকে ঘাটে নৌকা-ট্রলার বেধে রেখে ফিরতেন তাজা ইলিশ নিয়ে। নিত্যদিন কাটত মাছে-ভাতে। এ মানুষগুলোর এখন বেহাল দশার যেন শেষ নেই। এখন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার খাদ্য সহায়তার দিকে তাকিয়ে থাকেন মানুষগুলো। অতিসম্প্রতি টানা পাঁচ দিনের অস্বাভাবিক জোয়ারে চুলায় হাঁড়ি ওঠেনি। ভাটিতে ভাতের সঙ্গে আলু সিদ্ধ করেই দিন-রাত পার করছেন মানুষগুলো।

মানুষগুলো জীবিকার অবলম্বন হারানোর পাশাপাশি হারাচ্ছে বসতি। বদলে যাচ্ছেন যুগের পর যুগের চেনা ঠিকানা। মানুষের দুর্গতি চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নেই। দুঃখ-কষ্টের আহাজারিতে রাবনাবাদপাড়ের গ্রামের বাতাস ভারী হয়ে আছে। এখন বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। আর যাদের আর্থিক সঙ্গতি রয়েছে তারাও বাড়িঘর ছেড়ে ছয় কিলোমিটার দূরে বানাতিবাজারে গিয়ে পরিজন নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকছেন।

Sharing is caring!