বাসদের মানবতার কার্যক্রমে বাধা: দফায় দফায় হামলা, সংঘর্ষ : কলেজ অধ্যক্ষ অবরুদ্ধ

প্রকাশিত: ৯:৪৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৯, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার ॥ করোনা পরিস্থিতিতে সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের মানবতার সেবা কার্যক্রমে বাধা ও এক সমর্থককে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিনভর উত্তেজনা, হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসময় বাসদ কার্যালয় ভবনের কথিত মালিক বরিশাল সিটি কলেজের অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ ও যুবলীগ নেতা এক আইনজীবীকে মারধর করেন বাসদের কর্মীরা।

বুধবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত বরিশাল নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডস্থ ফকিরবাড়ি রোডে শিক্ষক ভবনের সামনে এই হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

পরে পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলেও এলাকা জুড়ে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। ফলে পরবর্তী অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ফকিরবাড়ি রোড এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

বাসদ বরিশাল জেলা কমিটির সদস্য সচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তী জানান, ‘ফকিরবাড়ি রোডের হাসান ইমাম চৌধুরীর মালিকানাধীন মাতৃছায়া শিশু কানন ভবন পাঁচ বছরের চুক্তিতে ভাড়া নিয়েছেন বরিশাল সিটি কলেজের অধ্যক্ষ সুজিৎ কুমার দেবনাথ।

তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ থাকে। এ কারণে ওই ভবন সুজিৎ কুমার দেবনাথ এর অনুমতি নিয়ে সেখানকার ৪টি কক্ষে করোনাকালীন মানবতার সেবামূলক কার্যক্রম শুরু করে বাসদ।

মনীষা অভিযোগ করেন, ‘অধ্যক্ষ সুজিৎ কুমার দেবনাথ ভবনটিতে মানবতার কার্যক্রম চালানোর জন্য ভাড়ার পাশাপাশি পাঁচ লক্ষ টাকার চুক্তির প্রস্তাব দেন। কিন্তু বাসদের পক্ষে এত টাকা দেয়া সম্ভব না হওয়ায় তারা ভবনের মূল মালিকের সঙ্গে কথা বলেন এবং কোন প্রকার টাকা ছাড়াই ভবনটি ব্যবহারের অনুমতি দেন।
বাসদের এই নেত্রী বলেন, ‘মূল মালিকের সাথে অধ্যক্ষ সুজিৎ কুমার দেবনাথ এর যে চুক্তি ছিল তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তাই তার সাথে কোন প্রকার চুক্তি না করতে বাসদ নেতৃবৃন্দকে বলেন বাড়ির মালিক। বিষয়টি জানতে পেরে অধ্যক্ষ সুজিৎ কুমার কক্ষ খালি করে দেয়ার জন্য বলেন।

এ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। যা নিয়ে ইতিপূর্বে বসদের করোনাকালীন মানবতার সেবা কার্যক্রম বন্ধের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। তাছাড়া একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অধ্যক্ষ সুজিৎ কুমার দেবনাথ বাসদ নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে থানায় ডায়েরি করেন।
এদিকে বাসদ জেলা কমিটির সভাপতি প্রকৌশলী ইমরান হাবিব রুমন বলেন, ‘এই কার্যালয়ে আমাদের বিনামূল্যে মানবতার বাজার এবং অক্সিজেন ব্যাংক এবং মানবতার অ্যাম্বুলেন্স কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। এ কারণে এখানে সার্বক্ষণিক কর্মীদের থাকতে হচ্ছে।

হঠাৎ করেই মঙ্গলবার রাতে অধ্যক্ষ সুজিৎ কুমার এসে কার্যালয়ের পানির লাইন বন্ধ করে দেয়ার পাশাপাশি চলাচলের রাস্তা আটকে দেন। খবর পেয়ে বুধবার সকাল ১০টার দিকে বাসদের সমর্থক অবিভক্ত বাংলার কৃষি, সমবায় ও শিক্ষা মন্ত্রী হাসেম আলী খানের নাতি এবং জেড আই খান পান্নার ভাই নজরুল ইসলাম খান এসে বাধা দেন।

নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, ‘আমি এসে রাস্তা এবং পানির লাইন বন্ধ করার কারণ জানতে চাই অধ্যক্ষ সুজিৎ কুমার দেবনাথ এর কাছে। তিনি রাস্তা আটকে দেয়ার কারণে বুধবার রাতে করোনা উপসর্গে অসুস্থ রোগীর অক্সিজেন প্রয়োজন হলেও তা নিয়ে বের হতে পারেননি বাসদের কর্মীরা। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে অধ্যক্ষ সুজিৎ ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে মারধরসহ মাটিতে ফেলে গলা চেপে ধরে হত্যার চেষ্টা করে। খবর পেয়ে বাসদের অন্যান্য নেতা-কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে আমাকে উদ্ধার করেন।

এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাসদ নেতা-কর্মীরা অধ্যক্ষ সুজিৎ কুমার দেবনাথকে একটি কক্ষের মধ্যে অবরুদ্ধ করে হামলার চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে থানা পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে অধ্যক্ষকে তাদের হেফাজতে নেয়ার পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। পরে পুলিশের উপস্থিতিতেই অধ্যক্ষের ভাই যুবলীগ নেতা ও বরিশাল আদালতের এপিপি সুভাশীষ ঘোষ বাপ্পির উপর হামলা করেন বাসদ কর্মীরা। এসময় তাকে মারধর করে পাঞ্জাবী ছিঁড়ে ফেলেন।

খবর পেয়ে আইনজীবীর অনুসারী স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে অধ্যক্ষ এবং আইনজীবীকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। তখন ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের সাথে বাসদ কর্মীদের বাকযুদ্ধ এবং হাতাহাতি ও সংঘর্ষ হয়। পরে পুলিশ এবং স্থানীয় কাউন্সিলর ও মহানগর যুবলীগের আহ্বায়কসহ অন্যান্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

তবে এ নিয়ে সকাল থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত ফকিরবাড়ি রোড এলাকায় দফায় দফায় উত্তেজনা, হামলা এবং সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় অধ্যক্ষ ও তার ভাইকে প্রায় চার ঘণ্টা পরে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত করে নিয়ে যায় পুলিশ।

এদিকে হামলার অভিযোগ প্রসঙ্গে বরিশাল সিটি কলেজের অধ্যক্ষ সুজিৎ কুমার হালদার বলেন, ‘আমি কোন ধরনের হামলা বা মারধর করিনি। বরং নজরুল ইসলাম খান নামের ওই ব্যক্তি এসে আমার সাথে দুর্ব্যবহার এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। এমনকি আমার ভাইয়ের উপরেও হামলা করে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘বাসদের মানবতার কার্যক্রমের নামে এখানে অসামাজিক কার্যকলাপ চালানো হয়েছে। বার বার নিষেধাজ্ঞার পরেও বাসদের আহ্বায়ক ইমরান হাবিব রুমন এখানকার একটি কক্ষে বেড রুম বানিয়েছে। যেখানে বিভিন্ন বস্তি থেকে আসা নারীদের নিয়ে যাওয়া হয়। তাছাড়া তাদের করোনা প্রতিরোধ কার্যক্রমের ফলে এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। তাই তারা এই কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। এ কারণেই তাদের এই ভবন ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে। ভবন ছাড়বে বিধায় একের পর এক নাটক তৈরি করছে তারা।

ভবন ভাড়ার এবং পাঁচ লাখ টাকা চাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মূল মালিকের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে আমার। এখন আমার চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও সেটা আমার আর মালিকের ব্যাপার। এখানে বাসদের দুই নেতার কি আসে যায়। তাছাড়া বাড়ির মূল মালিকও চাচ্ছেন এখানে যাতে করোনা সম্পর্কিত কোন কার্যক্রম না হয়। তারাও আমাকে বাসদের এই কার্যক্রম এখান থেকে গুটিয়ে নেয়ার জন্য বলেছেন।

তবে ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, ‘অধ্যক্ষ সুজিৎ কুমার দেবনাথ অধ্যক্ষ নামের একজন চাঁদাবাজ। সে একজন অধ্যক্ষ হয়েও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। আমরা তার বিচার চাই। তাছাড়া বাসদ সমর্থকের উপর হামলার ঘটনায় আইনের সহায়তা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

অপরদিকে ঘটনাস্থলে থাকা ১৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর গাজী আক্তারুজ্জামান হিরু বলেন, ‘বাসদ করোনা পরিস্থিতিতে এখানে যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে তা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে ভয় কাজ করছে। তারা মনে করছেন এ কার্যক্রমের মাধ্যমে এলাকাবাসীর মধ্যে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়বে। তাই তারা এখান থেকে বাসদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। আমরাও চাই এখান থেকে এই কার্যক্রম অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হোক।

অপরদিকে ঘটনাস্থলে থাকা বরিশাল কোতয়ালী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. নুর ইসলাম বলেন, ‘উভয় পক্ষের কাছ থেকেই পাল্টা পাল্টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে কয়েক দফা হাতাহাতি ও সংঘর্ষ হয়েছে। তবে পুলিশের উপস্থিতির কারণে সেটা বড় আকার ধারণ করতে পারেনি। স্থানীয়দের নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।

ওসি বলেন, ‘দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে দুপুর দুইটার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। পরে বিষয়টি নিয়ে উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) স্যার দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে সুষ্ঠু সমাধান দিয়েছেন। ওই ভবনে বাসদের চলমান কার্যক্রম আগামী এক মাস চালিয়ে নেয়ার জন্য বাসদকে নির্দেশনা দিয়েছেন উপ পুলিশ কমিশনার। এরপরে ভবনের মূল মালিকের সাথে কথা বলে আলোচনা সাপেক্ষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে বলেছেন। পাশাপাশি বাসদ সমর্থক নজরুল ইসলামের উপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত অধ্যক্ষ ক্ষমা চেয়েছেন। একইসাথে আইনজীবীরন উপর হামলার যে ঘটনা ঘটেছে সেজন্য বাসদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে সৃষ্ট বিরোধের সমাধান করা হয়।

Sharing is caring!