বাবুগঞ্জে ভূমি অধিগ্রহণের খবরে রাতারাতি গড়ে উঠছে স্থাপনা : রহমতপুরের চেয়ারম্যান লাঞ্ছিত

প্রকাশিত: ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বাবুগঞ্জ উপজেলার মানিককাঠী এলাকাধীন বরিশাল বিমানবন্দরের পশ্চিম পাশে বেইজ ক্যাম্প স্থাপনের জায়গা পছন্দ করেছে এয়ার ফোর্স কর্তৃপক্ষ। বিগত সাড়ে তিন বছর ধরে জায়গা নির্ধারণ নিয়ে কার্যক্রম চলমান থাকলেও এখনো শুরু হয়নি ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণের অগ্রিম খবরে শুরু হয়েছে ছোট-বড় স্থাপনা নির্মাণ কার্যক্রম। অধিগ্রহণের জন্য চিহ্নিত সম্ভাব্য জমির মালিকরা মাত্র ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে শতাধিক ছোট-বড় স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। এমনকি ভূমি অধিগ্রহণে অধিক ক্ষতিপূরণের আশায় অনৈতিক উপায়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে গ্রহণ করছেন হোল্ডিং নম্বরও। যা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

তাছাড়া এমন পরিস্থিতিতে হোল্ডিং নম্বর পাওয়া নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে ইউপি চেয়ারম্যানসহ একটি চক্রের বিরুদ্ধে। আর এ নিয়ে গতকাল সোমবার রহমতপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সরোয়ার মাহমুদকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সহিদ মল্লিক। খবর পেয়ে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে ঘটনাটি মীমাংসা করা হয়েছে। যদিও এটিকে বড় কোন বিষয় নয় বলে দাবি করেছেন রহমতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সহিদ মল্লিক।

সরেজমিনে এবং স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ‘রহমতপুর ইউনিয়নের অধীনস্ত বরিশাল বিমানবন্দরের পশ্চিম পাশে মানিককাঠী এলাকায় বেইজ ক্যাম্প স্থাপনের জন্য জায়গা নির্ধারণ করেছে বিমানবাহিনী। এরই মধ্যে পছন্দের ওই জায়গা পরিদর্শন করে গেছে বিমানবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের একটি টিম। পছন্দের ওই জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে সরকারের অধীনে নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। এমন পরিকল্পনার ফলে গত ছয় মাস থেকে এক বছর ধরেই নির্ধারিত জায়গা জুড়ে একের পর এক গড়ে উঠছে ছোট-বড় স্থাপনা। যা অনেক বছর পূর্বে স্থাপন করা হয়েছে মর্মে দাবি করে অবৈধভাবে হোল্ডিং নম্বর গ্রহণ করছেন জমির মালিকরা।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, বাবুগঞ্জ উপজেলায় একটি চক্র রয়েছে যারা উপজেলার কোথাও ভূমি অধিগ্রহণের খবর পেলেই প্রস্তুতি নেয় স্থাপনা নির্মাণের। আর সুযোগ বুঝে সরকারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকা। এ চক্রটির মধ্যে অন্যতম হিসেবে বাবুগঞ্জ উপজেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহীন হোসেন, তার সহযোগী ইমরুল, টিপু, সোহাগ এবং কামালসহ বেশ কয়েকজনের নাম শোনা যাচ্ছে। অবশ্য এই চক্রটির সাথে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার অসাধু স্টাফদের জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন অনেকে। যাদের পরামর্শে অধিগ্রহণকৃত জমি এবং দাগ-খতিয়ান সবই পেয়ে থাকেন চক্রের সদস্যরা। চক্রের হোতা শাহীন হোসেনের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে বিভিন্ন মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ‘ভূমি অধিগ্রহণের খবর পেয়ে অতি সাম্প্রতিক সময়ে চক্রটির সহায়তায় একাধিক বাড়ি-ঘর এবং স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এদের মধ্যে মাত্র দু’দিন আগেই শাহিন টিপু, কামালসহ চারজন পূর্বের মেয়াদ দেখিয়ে রহমতপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অবৈধ উপায়ে হোল্ডিং নম্বর গ্রহণ করেছেন। এছাড়াও একাধিক ব্যক্তি হোল্ডিং নম্বর গ্রহণের জন্য আবেদন করলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে বন্ধ হয়ে গেছে হোল্ডিং বাণিজ্য।

প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ‘রহমতপুর ইউপি চেয়ারম্যান সরোয়ার মাহমুদ হোল্ডিং নম্বর দিতে স্বজনপ্রীতি করেছেন। ওয়ার্কার্স পার্টি’র নেতা-কর্মীদের অনৈতিক সুবিধা দিয়ে হোল্ডিং ট্যাক্স দিলেও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদেরটা আটকে দিয়েছেন। সোমবার দুপুরের দিকে রহমতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সহিদ মল্লিক এয়ারফোর্সের বেইজ ক্যাম্প স্থাপনের জন্য নির্ধারিত জমিতে থাকা স্থাপনার হোল্ডিং আনার জন্য যান। কিন্তু ইউপি চেয়ারম্যান সরোয়ার মাহমুদ তার সেই আবেদন গ্রহণ না করে হোল্ডিং দেওয়া হবে না বলে ফিরিয়ে দেন। এ নিয়ে উত্তেজিত আওয়ামী লীগ নেতা সহিদ মল্লিক ইউপি চেয়ারম্যানকে লাঞ্ছিত করেন। এমনকি তার গায়ে হাত তোলা হয়েছে বলেও দাবি ইউপি চেয়ারম্যানের। খবর পেয়ে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। এই ঘটনায় সরোয়ার মাহমুদ মামলার প্রস্তুতি নিলেও স্থানীয় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কামাল চিশতিসহ অন্যান্য সিনিয়র পর্যায়ের নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এমনকি ঘটনাটি মীমাংসাও করে দেন তারা।

এ প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ করা হলে রহমতপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সরোয়ার মাহমুদ বলেন, ‘গত ৮-১০ দিন আগে বিনামবাহিনীর লোকেরা জায়গা পরিদর্শন করে গেছেন। তখন তারা নাকি বলেছেন ওই জমি অধিগ্রহণ করা হবে। এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বেইজ ক্যাম্পের জন্য নির্ধারিত জায়গায় স্থাপনা গড়ে উঠতে শুরু করে। সেই সাথে ইউনিয়ন পরিষদে হোল্ডিং এর আবেদনও আসা শুরু হয়। তবে প্রথম দিকে বিষয়টি আমি বুঝে উঠতে পারিনি। তাই চারজনকে চারটি হোল্ডিং দিয়েছি। কিন্তু পরে সন্দেহজনক মনে হওয়ায় রোববার রাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবগত করি। তখন তিনি নতুন করে কোন হোল্ডিং না দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা সহিদ মল্লিক আমার কাছে হোল্ডিং নিতে চাইলে আমি ইউএনও’র নির্দেশনার কথা বলি। তাছাড়া হোল্ডিং পেতে হলে জেলা প্রশাসনের নির্দেশ লাগবে বলে জানাই। এটা বলতেই সহিদ মল্লিক ক্ষিপ্ত হয়। সে আমাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। খবর পেয়ে পুলিশ আসলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বিষয়টি মীমাংসা করে দিয়েছেন। তবে এ বিষয়টি আমি জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবগত করেছি। তিনি এ বিষয়ে লিখিত চেয়েছেন। মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত দিবেন বলেও জানিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান।

তবে বিষয়টি নিয়ে সহিদ মল্লিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ঘটনাটি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, আমরা চাচা-ভাতিজা। একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। তা আবার সামাধানও হয়েছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কামাল চিশতি জানিয়েছেন, ‘মারামারি হয়নি, একটু উত্তেজনা হয়েছে। বড় কথা হচ্ছে চেয়ারম্যান সরোয়ার মাহমুদ মুরব্বি মানুষ। সহিদ মল্লিক তার সাথে যে ব্যবহার করেছেন সেটা ঠিক হয়নি। এ কারণেই খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিষয়টি মীমাংসা করে দিয়েছি। সহিদ মল্লিক ক্ষমাও চেয়েছেন।

আওয়ামী লীগের এই নেতা অভিযোগ করে বলেন, ‘বাবুগঞ্জে একটি চক্রই রয়েছে, যারা ভূমি অধিগ্রহণের খবর পেলেই তাদের কার্যক্রম শুরু করে দেয়। জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার কিছু ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে অধিগ্রহণের অপেক্ষায় থাকা জমিতে নামমাত্র স্থাপনা নির্মাণ করে সরকার থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ আর্থিক সুবিধাভোগ করে। রাজনৈতিক কারণে চক্রটির পরিচয় বলতে অপারগতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি হোল্ডিং নিয়ে যে কা- ঘটেছে সেটার পেছনে ইউনিয়ন পরিষদ সংশ্লিষ্টদের লাভ-লোকসানের হিসাব থাকতে পারে। না হলে অধিগ্রহণের অপেক্ষায় থাকা জমিতে রাতারাতি গড়ে ওঠা স্থাপনায় হোল্ডিং দেওয়ার কথা নয়। তবে আওয়ামী লীগ নেতা সহিদ মিল্লক অন্যায় আবদার করেননি। আমার জানামতে তিনি যে বাড়ির জন্য হোল্ডিং নিতে চেয়েছেন সেই বাড়িটি গত পাঁচ বছর পূর্বে নির্মাণ করা। তিনি যৌক্তিকভাবেই হোল্ডিং পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন।

এ প্রসঙ্গে বরিশাল জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেন, ‘বেইজ ক্যাম্প স্থাপনের জন্য এয়ারফোর্স জমি পছন্দ করেছে। এটি নিয়ে গত সাড়ে তিন বছর ধরে কার্যক্রম চলছে। তবে এখনো ভূমি অধিগ্রহণ পর্যায় আসেনি। অধিগ্রহণের পূর্বে ভিডিও এবং ত্রিশ ধারার নোটিশ পরবর্তী অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হবে। এর আগে পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট জমির মালিকরাই ওই জমি ব্যবহার করবেন। এ ক্ষেত্রে তিনি তার জমিতে যা খুশি তাই করার অধিকার রাখেন। তাছাড়া হোল্ডিং দেওয়ার দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদের। এটিতে চেয়ারম্যানের অগ্রাধিকার রয়েছে। তিনি যাকে এবং যেভাবে খুশি হোল্ডিং নম্বর দিতে পারেন। তবে অধিগ্রহণকৃত জমিতে হোল্ডিং দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। এ বিষয়টি চেয়ারম্যান আমাকে জানিয়েছেন। তবে তিনি লাঞ্ছিত হয়েছেন কিনা সে বিষয়ে কিছু জানাননি বলে জেলা প্রশাসক দাবি করেছেন।