বানারীপাড়ায় অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর লাশ গুমের চেষ্টা: ঝালকাঠিতে শিক্ষিকার লাশ উদ্ধার

প্রকাশিত: ৬:০৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৬, ২০২০

রাহাদ সুমন ও ঝালকাঠি প্রতিনিধি ॥ বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলায় এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে হত্যার পরে লাশ গুমের চেষ্টা করেছে তার স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকেরা। এছাড়া ঝালকাঠি সদরে একটি নির্মানাধীন ভবনের পাছে অপর একটি ভবনের ছাদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এক শিক্ষিকার লাশ। স্থানীয়দের ধারনা ওই নারীকে হত্যার পরে ওপর থেকে নিচে ফেলে দেয়া হয়েছে। পৃথক দুটি ঘটনায় স্থানীয় থানা পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে বানারীপাড়ার ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের পাশাপাশি তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।

তাছাড়া ঝালকাঠিতে নারীর মৃত্যুর ঘটনার রহস্য উদঘাটনে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে স্থানীয় থানা পুলিশ। আমাদের বানারীপাড়া প্রতিনিধি রাহাদ সুমন জানিয়েছেন, ‘বানারীপাড়ায় যৌতুকের দাবিতে অনিমা (২৮) নামের এক অন্তঃস্বত্ত্বা এক গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যার পরে লাশ তাঁর গুমের চেষ্টাকালে স্বামী, ভাসুর ও জা’কে আটক করে পুলিশে দিয়েছে জনতা। এ ঘটনায় বুধবার দুপুরে নিহত গৃহবধূর ভাই গোপাল হালদার বাদি হয়ে ওই তিন জনের নামে এবং আরও দু’জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে বানারীপাড়া থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। আটককৃত মামলার আসামিরা হলেন- নরেন জয়ধর (৩৬), তার ভাই নারায়ণ জয়ধর (৪২) ও ভাইয়ের স্ত্রী কবিতা (৩৫)।

তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। মামলা সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিশারকান্দি ইউনিয়নের মরিচবুনিয়া গ্রামের প্রয়াত মতিলাল হালদারের মেয়ে অনিমার সঙ্গে বিশারকান্দি গ্রামের বৈকুন্ঠ জয়ধরের ছেলে নরেন জয়ধরের সঙ্গে হিন্দু প্রথা অনুযায়ী বিয়ে হয়। বিয়ের সময় বরকে স্বর্নালঙ্কার, আসবাবপত্র ও আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র সহ প্রায় দেড় লাখ টাকার মালপত্র ও নগদ এক লাখ টাকা যৌতুক হিসেবে দেওয়া হয়। বিয়ের পর থেকে নরেন জয়ধর তার ভাই নারায়ণ জয়ধর ও বৌদি কবিতার সহায়তায় এবং প্ররোচনায় অনিমার কাছে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা যৌতুকের দাবীতে শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন করে আসছিলো।

দাবিকৃত ওই যৌতুকের টাকা দিতে অনিমা অস্বীকৃতি জানালে নির্যাতন করেও তা আদায় করতে না পেরে গত এক বছর পূর্বে নরেন জয়ধর ঢাকায় চলে যায় এবং সেখানে অন্য একটি মেয়ে বিয়ে করে। এর কিছুদিন পরে আবারও বাড়িতে ফিরে এসে সে স্ত্রী অনিমার কাছে ১০ কাঠা জমি ও নগদ অর্ধ লাখ টাকা যৌতুক দাবী করে। এর মধ্যে অনিমা ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। ২৪ নভেম্বর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পূনরায় যৌতুকের দাবীতে নির্যাতন করার এক পর্যায়ে অনিমা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। রাতে লাশ গুম করার জন্য আসামীরা স্থানীয় মরিচবুনিয়া বাজার এলাকা অতিক্রমকালে এলাকাবাসী তাদের আটক করে উত্তমমধ্যম দিয়ে পুলিশে খবর দেন। রাত আড়াইটার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার ও তিন আসামীকে আটক করে থানায় নিয়ে আসেন। বুধবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ বরিশাল শেবাচিম হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বানারীপাড়া থানার ওসি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন হত্যা মামলা নেওয়ার পাশাপাশি অনিমার মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে ময়না তদন্তের জন্য তার লাশ বরিশাল মর্গে ও আসামীদের কোর্টের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
অপরদিকে থালকাঠি প্রতিনিধি জানান, ‘ঝালকাঠি শহরের পুলিশ ফাঁড়ির সামনে একতলা ভবনের ছাদ থেকে শাহনাজ আখতার (৪৪) নামে এক নারীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে স্থানীয়দের সহায়তায় লাশটি উদ্ধার করেন তারা। নিহত শাহনাজ আখতার নেছারাবাদ এলাকায় ইসলামী ফাউন্ডেশনের গণশিক্ষা কার্যক্রমের একজন শিক্ষক।

স্থানীয়দের ধারনা, ওই নারীকে হত্যার পর লাশ পাশের ছয়তলা ভবনের ছাদ থেকে একতলা ভবনের ছাদে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, ‘সকাল ১১টার দিকে জলিল তালুকদারের নির্মাণাধীন একতলা ভবনের ছাদে কিছু পড়ার শব্দ শুনে পথচারীরা গিয়ে আসেন। এসে দেখতে পান ছাদের ওপর ওই নারীর লাশ পড়ে আছে। তাৎক্ষনিকভাবে বিষয়টি থানা পুলিশকে অবহিত করেন স্থানীয়রা।

পরে ঝালকাঠি থানার এস.আই হযরত আলীর নেতৃত্বে একদল পুলিশ এসে ওই নারীর লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেন। এস.আই হযরত আলী বলেন, নিহত নারীর ডান পা ভাঙ্গা পাওয়া গেছে। পাঁচতলা বা ছয়তলার ছাদ থেকে পড়ে গেলে বা ফেলে দেয়া হলে যে ধরনের জখম হওয়ার কথা সে রকম হয়নি।

ঝালকাঠি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খলিলুর রহমান জানান, পাশের বেলায়েত মুন্সির ছয়তলা ভবনের ছাদ থেকে ওই নারীর একটি বোরখা ও পার্স ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। ব্যাগের মধ্যে তাঁর জাতীয়পরিচয়পত্রের ফটোকপি পাওয়া যায়। সেখান থেকে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।

মৃত নারীর নাম শাহনাজ আখতার। সে সদর উপজেলার দক্ষিণ পিপলিতা গ্রামের জালাল আহমেদের মেয়ে। তার স্বামী মাওলানা আব্দুল আহাদ নেছারাবাদ জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন। লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। কি কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, ময়না তদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরে জানা যাবে।

নিহতের দশমশ্রেণিতে পড়–য়া মেয়ে সাওদা সাথী জানান, তাঁর মা তাকে নিয়ে বুধবার সকাল দশটার দিকে ঝালকাঠি সোনালী ব্যাংক থেকে পাঁচহাজার টাকা উত্তোলন করেন। টাকা উঠিয়ে মা তাকে বাড়ি চলে যেতে বলেন এবং মা তাদের দুঃসম্পর্কের আত্মীয় বেলায়েত মুন্সির সাথে দেখা করতে ছয়তলা ভবনে যান। বেলা ১২ টার দিকে এক রিকসাওয়ালা জানান তার মায়ের লাশ পাওয়া গেছে।