বাকেরগঞ্জে ১৮ মাস ধরে উপকারভোগী নারীদের চাল খাচ্ছেন চেয়ারম্যান-মেম্বার!

প্রকাশিত: ৫:১২ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বাকেরগঞ্জ উপজেলার ৭নং কবাই ইউনিয়নে ভিজিডি’র উপকারভোগী নারীদের চাল আত্মসাত ও অসহায় কর্মহীনদের আর্থিক সাহায্যের বরাদ্দকৃত অর্থ লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বারের বিরুদ্ধে।

ভজিডি’র তালিকায় নিজের নাম ও স্বামীর নাম থাকলেও ঠিকানা পরিবর্তন করে অন্য কোন ব্যক্তির মাধ্যমে এই সুবিধা আত্মসাত করা হচ্ছে। এছাড়াও অসহায় কর্মহীনদের আর্থিক সাহায্যের বরাদ্দকৃত অর্থ লুটপাটের জন্য মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে ভিজিডি’র উপকারভোগী নারীরা এই চাল পাওয়া থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।

এমন অভিযোগ এনে আজ শনিবার সকাল সাড়ে ১১টায় বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলন করেন বাকেরগঞ্জ উপজেলার ৭নং কবাই ইউনিয়নের ভিজিডি’র উপকারভোগীরা। উপকারভোগীদের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ভুক্তভোগী ওই এলাকার মোঃ কামাল উদ্দিন সিকদারের স্ত্রী আমিনা বেগম।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দুই বছর মেয়াদী অসহায় দুস্থ নারীদের জন্য প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে ভিজিডি’র চাল বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে। সেই হিসেবে আমরা ৭নং কবাই ইউনিয়নের দুস্থ, অসহায় নারীরা এই চাল পাওয়া থেকে বঞ্চিত।

দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস ধরে সরকারের এই কার্যক্রমে আমাদের নাম রয়েছে যা আমরা জানতাম না। একাধিকবার স্থানীয় চেয়ারম্যান জহিরুল হক তালুকদার ও প্যানেল চেয়ারম্যান আরাফাত ইসলাম এর কাছে গিয়েও আমরা ফিরে এসেছি। তারা আমাদের আশ্বাস নয় বরং তালিকায় নাম নেই বলে ফিরিয়ে দিয়েছেন। পরে একটি মাধ্যমে আমরা জানতে পারি আমাদের নামে বরাদ্দকৃত চাল ঠিকানা পরিবর্তন করে নেয়া হচ্ছে। ওই তালিকার ১৯ নং সিরিয়ালে আমার (আমিনা) নাম আছে।

তিনি বলেন, আমরা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তালিকা সংগ্রহ করে এবিষয়ে নিশ্চিত হই। সেখানে আমি একা নই। আমার মত ১১১ নং সিরিয়ালে লক্ষ্মীপাশা গ্রামের ফারুক সিকদারের স্ত্রী মোসাঃ হাওয়া বেগম, ১৮৮ নম্বরের আমেনা বেগম, ১৮৯ নম্বরের আকলিমা সহ আমেনা বেগম, আসমা রয়েছেন। এছাড়াও আরো অনেকে রয়েছেন যাদের প্রত্যেকের নিজের, স্বামী, পিতার নাম ঠিক থাকলেও ঠিকানা পরিবর্তন করে কার্ড বিতরণ করা হয়েছে।

অপরদিকে অসহায় কর্মহীনদের আর্থিক সাহায্যের বরাদ্দকৃত ২৫০০ টাকা দেয়ার জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে ভোটার আউডি কার্ড সংগ্রহ করা হয়। সেখানেও মোবাইল নম্বর পাল্টে দিয়ে টাকা তুলে নিচ্ছে।

চূড়ান্ত তালিকা অনুসারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তালিকায় ৬৮৯ নম্বর সিরিয়ালের বাকেরগঞ্জের শিয়ালঘূণী গ্রামের হারুন অর রশিদের স্ত্রী হালিমা বেগম এর নাম থাকলেও সেখানে মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছে ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার ভবানীপুরের মিলন চন্দ্র দাসের। তালিকার মোবাইল নম্বরে ফোন করলে মিলন চন্দ্র দাসের স্ত্রী পাপড়ি রানী দাস ফোন রিসিভ করেন।

তালিকার ৭১৫ নম্বর সিরিয়ালের আর একজন মোঃ জাহিদ হাসান। যিনি ঢাকায় চাকরি করেন। সেখানে তার ভাই মিরাজ ফোন রিসিভ করেন এবং জানান জাহিদ তার ভাই। আর এই ফোনটি মিরাজের।

তালিকার ৭২৮ নম্বর সিরিয়ালের বাকেরগঞ্জের শিয়ালঘূণী গ্রামের কবীর হাওলাদার লেখা থাকলেও সেখানে ফোন করে জানাযায় ফোন নম্বরটি মোঃ জামালের। যিনি কুমিল্লা চকবাজার এলাকার বাসিন্দা।

এছাড়াও তালিকার ৭৩৪ নম্বর সিরিয়ালে বাকেরগঞ্জের শিয়ালঘূণী গ্রামের দিলিপ দাস এর পরিবর্তে মংলার সুতাখালী এলাকার আসরাফ গাজীর স্ত্রী আনোয়ারা ফোন রিসিভ করেন।

এমনি আর একজন তালিকার ৭৫০ নম্বর সিরিয়ালের মোঃ আলো বেপারীর স্ত্রী মঞ্জু বেগমের ফোন নম্বর এর পরিবর্তে নুরুল ইসলামের ছেলে আসরাফুল যার বাড়ি রাজশাহীর পৌটা খাসের হাট এলাকায়, তার ফোন নম্বর দেয়া আছে। তালিকা অনুসারে এমন ১১ জন ব্যক্তির নাম ঠিকানায় অন্য কোন ব্যক্তির মোবাইল নম্বর দেয়া হয়েছে। আবার অন্যজেলার বাসিন্দাও রয়েছেন। এই ১১জন ছাড়াও আরো অনেকে রয়েছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

অভিযোগের বিষয়ে বাকেরগঞ্জের ৭নং কবাই ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মোঃ জহিরুল হক তালুদকার বলেন, ভিজিডি’র উপকারভোগী মহিলাদের সংখ্যা ২৪৯ জন। তাদের প্রত্যেককে কার্ড প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও কর্মহীনদের আর্থিক সাহায্যের বরাদ্দকৃত অর্থের ৪ এর ১ অংশ এখনো পাওয়া যায়নি। পর্যায়ক্রমে তাদের কে দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, অভিযোগের বিষয়টি আমি জানি। অনেকে কার্ড পাওয়ার পর সেই কার্ড বিক্রি করে দেয়। আবার একজনের কার্ড অন্য গ্রামেও দিয়েছে। এখানে অনিয়ম হলেও দুর্নীতি করা হয়নি। তাছাড়া মেম্বাররা আমার কাছে তালিকা নিয়ে আসেন। কর্মহীনদের আর্থিক সাহায্যের বরাদ্দকৃত অর্থের জন্য ৯৫২ জনের তালিকা দেওয়া হয়েছে। সেখানে হয়তো মোবাইল নম্বর ভুল করা হয়েছে। এক্ষেত্রে যদি আমার কোন ঘনিষ্ঠ লোকের নাম ও মোবাইল নম্বর থাকে তাহলে এর দায় দায়িত্ব আমি নিতে রাজি আছি।

এবিষয়ে বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাধবী রায় বলেন, তিন দিন পূর্বে আমি বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে অভিযোগটি পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। বাকেরগঞ্জ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা বিষয়টি তদন্ত করছেন।