বাকেরগঞ্জে প্রধান শিক্ষকের বেতন বন্ধ, পালিয়ে বেড়াচ্ছেন সভাপতি

প্রকাশিত: ১১:১৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক নিজামুল কাদিরের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ আত্মসাৎ ও কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

অপরদিকে মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামী হয়েও বহাল তবিয়াতে রয়েছেন বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এম.এ. রহমান। চেক জালিয়াতির মামলায় তাকে সাজা প্রদান করেছেন আদালত। বর্তমানে তিনি পলাতক রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনক ভাবে গ্রেফতার করছে না বাকেরগঞ্জ থানা পুলিশ।

এদিকে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছে ম্যানেজিং কমিটি’র কোন সদস্য মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি হলে তার সদস্য পদ বাতিল হবে। নিয়ম এমনটা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটছে না। দ-প্রাপ্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও তিনি সভাপতি পদেই বহাল রয়েছেন।

জানাগেছে, শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে স্কুল প্রতিষ্ঠাতা কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরির পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগের প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ১১ জুন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে প্রমাণ পায়।

যার স্মারক নং ৩৭.০২.০০০০.১০৭.৯৯.৪৪৩.১৯/৭৮৯ কারন দর্শনের জন্য বলা হয়েছে। সহকারী পরিচালক মাধ্যমিক উইং কাওছার হোসেন স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে বলা হয়, বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিজামুল কাদিরের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন উৎস্য হতে প্রাপ্ত আয় সমূহ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিধি অনুসরণ না করা, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী মো: শাহ আলম শরীফ এর পরিবর্তে শাজাহান শরীফকে চাকুরিতে রাখা এবং বিদ্যালয়ের আয় ব্যয়ের হিসাব সঠিক ভাবে না করার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। নোটিশে আরো উল্লেখ করা হয়, তার বেতন ভাতা কেন স্থগিত করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়। একই সাথে স্থায়ীভাবে তার বেতন ভাতা কেন বন্ধ করা হবেনা তারও কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে নোটিশে।

অপরদিকে, বাকেরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এম.এ. রহমান এর বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ১৭ অক্টোবর বরিশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চেক জালিয়াতির অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন নগরীর ভাটিখানা এলাকার শেখ মো: আল আমিন শেখ। যার মামলা নং সি আর ১৫৩/ ১৭ কাউনিয়া থানা।

মামলা সূত্রে জানাযায়, ভাটিখানা এলাকার মো: আল আমিন শেখ এর সাথে শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এম.এ. রহমান ব্যবসায়িক সম্পর্কে তাকে ৫ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা ধার হিসেবে দেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ৩০ জুলাই বাদীর বাসায় গিয়ে ব্যাংক আল ফালাহ এর ৫ লক্ষ ৬০ হাজার টাকার একটি চেক প্রদান করেন। যার চেক নং ঈঅ-৪১১২০০৫। চেক প্রদানের ৭দিন পর টাকা দিয়ে চেক ফেরত নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

সাত দিন পরেও টাকা পরিশোধ না করায় ব্র্যাক ব্যাংক বরিশাল এ অ্যাকাউন্টের বিপরীতে অনলাইনে ক্যাশ করার জন্য জমা দেন বাদী। চেকটি অনলাইনে ডিজঅনার হয়। বাদীর আইনজীবীর মাধ্যমে এম.এ রহমানকে লিগ্যাল নোটিশও প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে টাকা না পেয়ে বাদী একটি চেক প্রতারণা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় বিচার কার্য শেষে চলতি বছরের ১০ মার্চ বরিশাল যুগ্ম দায়রা জজ ২য় আদালত আসামী রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের বাসিন্দা মৃত আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদারের ছেলে এম.এ.রহমানকে ১৩৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও চেকটিতে উল্লেখিত টাকার সমপরিমাণ ৫ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিপত করা হয়। একই সাথে আসামী এম.এ.রহমান এর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন আদালত। তবে রায় ঘোষণার আগে থেকেই পলাতক রয়েছেন এম.এ.রহমান।

এবিষয়ে মামলার বাদী আল আমিন আদালতের মাধ্যমে মামলার রায় ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পরও আসামী গ্রেপ্তার না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। একই সাথে আসামীকে গ্রেপ্তারের দাবিও জানান।

এবিষয়ে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের সাথে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে যোগাযোগ করা হলে শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দুর্নীতির অভিযোগে প্রধান শিক্ষক নিজামুল কাদির এর বিরুদ্ধে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে কারণ দর্শানোর বিষয়টি স্বীকার করেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোশারেফ।

তিনি বলেন, নিজামুল কাদির নোটিশ পেয়েছেন এবং নোটিশের জবাবও পাঠিয়েছেন। তবে গত জুলাই মাসে এমপিও’র তালিকায় প্রধান শিক্ষকের নাম নেই। তার বেতন ভাতাও বন্ধ রয়েছে। একই সাথে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন।

বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের স্কুল পরিদর্শক প্রফেসর মো: আব্বাস উদ্দিন জানান, ২০০৯ সালের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী ম্যানেজিং কমিটির কোন সদস্য যদি কোন মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামী হন তাহলে তিনি তার সদস্য পদ হারাবেন। এম.এ রহমানের বিষয়ে তিনি জানান, তার বিরুদ্ধে যদি কোন মামলায় সাজা হয়ে থাকে আর সেই প্রমাণাদি বোর্ড কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করা হলে বোর্ড শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ও সাজার বিষয়ে বাকেরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: আবুল কালাম জানান, তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

Sharing is caring!