বরিশাল বিসিকের উন্নয়ন কাজ থামিয়ে দিতে মুখোশধারী চাঁদাবাজদের চক্রান্ত

প্রকাশিত: ৭:০৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০২০
smart

আবার বন্দুকযুদ্ধের ক্ষেত্রস্থলে পরিণত করার পাঁয়তারা!

খান রুবেল ॥ প্রতিষ্ঠার প্রায় ৬০ বছর পরে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে বরিশাল নগরীর কাউনিয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) এলাকায়। দীর্ঘ বছরের চলাচল অনুপযোগী জরাজীর্ণ সড়ক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কাজ চলছে সরকারের এই দপ্তরটিতে। প্রায় ২০ কোটি (ভ্যাট বাদে) টাকা চুক্তি সাপেক্ষে এই কাজের বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।

তবে অভিযোগ উঠেছে, সাবেক শিল্পমন্ত্রী আলহাজ্ব আমির হোসেন আমু’র দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও তাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় মুখোশধারী ও চিহ্নিত ছিঁচকে চাঁদাবাজরা। সরকারের এই উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের হিতৈষী সেজে চাঁদা দাবি করছে তারা। এমনকি বিসিক শিল্প নগরীর পরিবেশ উত্তপ্ত করতে দিচ্ছে মোটরসাইকেলের মহড়াও।

এসব কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। ফলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। আবার সময় বিলম্বের কারণে নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধিতে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। তবে এতো কিছুর পরেও প্রাণ শংকার পাশাপাশি কাজের স্বার্থে আইনের আশ্রয় নিতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

আর সেই সুযোগে পুরো ঘটনা অবগত হয়েও পুলিশ নিচ্ছে না আইনগত ব্যবস্থা। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অভিযোগ না পাওয়ার অজুহাতে চেপে যাওয়া হচ্ছে ঘটনাটি। যদিও পুলিশ বলছে বরিশাল মহানগরীতে চাঁদাবাজদের ঠাঁই নেই। নিয়ম অনুযায়ী পুলিশকে অবগত করা হলে চাঁদাবাজ সে যেই হোক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। চাঁদাবাজদের মূল উৎপাটন করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর কাজের সাথে সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে মোবাইল ফোনে অভিযুক্তদের কথোপকথন রেকর্ডিং এর পরামর্শ দিয়েছেন বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা।

স্থানীয় এবং বিসিক সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, ‘বরিশাল বিসিক শিল্প এলাকাটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজস্ব উদ্যোগে করা একটি প্রতিষ্ঠান। ১৯৬০ সালে কাউনিয়া এলাকায় ১৩১ একর জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল বিসিক শিল্প নগরী বাস্তবায়ন কার্যক্রম। এরপর ১৯৭৫ সালে স্থাপিত হয় বর্তমান বিসিক ভবন। তাছাড়া ১৯৮১ সালের ২৭ মার্চ থেকে শিল্প উদ্যোক্তা, প্রশিক্ষণ এবং শিল্পকারখানা গড়ে তোলার প্রতিষ্ঠান বিসিক এর কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়। এর পর থেকে ধীরে ধীরে বিসিকে শিল্প প্রতিষ্ঠান বাড়লেও বাড়েনি সুযোগ সুবিধা। নানা সমস্যা আর সম্ভাবনায় পতিত হয় বিসিক শিল্প এলাকা।

নগরীর কাউনিয়া বিসিক এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ‘বিসিক শিল্প এলাকা হলেও অপরাধের অভয়ারন্য ছিল এ ক্ষেত্রটি। মাদকের জমজমাট হাট বসতো এখানে। শুধু তাই নয়, অপরাধীদের অভয়ারন্য নির্জন বিসিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে সন্ত্রাসীদের বন্দুকযুদ্ধের (ক্রস ফায়ার) ঘটনাও রয়েছে একাধিক। ফলে এক সময় বিসিকের নাম শুনলেও আঁতকে উঠতো অন্য এলাকার মানুষ।

তবে পরবর্তীতে প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে পাল্টে যায় বিসিক। অপরাধীদের অভয়ারন্য নেই বাণিজ্যিক এই এলাকাটিতে। বিগত ১০-১২ বছরের ব্যবধানে র‌্যাব-পুলিশের কঠোর তদারকির ফলে নিয়ন্ত্রণে এসেছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। তবে বিসিক এর উন্নয়নের চিত্র সেই ১৯৬০ সালেই থেমে যায়। একের পর একে একে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও সুযোগ সুবিধা শূন্যের কোটায় রয়ে যায়। রাস্তা-ঘাট ভেঙে একাকার হয়ে পড়ায় যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বর্ষা মৌসুম এলেই ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে হাঁটু সমান জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। চার দিকে সীমানা প্রাচীরের অভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়ে। স্ট্রিট লাইট না থাকায় অন্ধকারপুড়িতে পরিণত হওয়া ছাড়াও রয়েছে বিদ্যুতের লুকোচুরির সমস্যা।

নানা সমস্যায় জর্জরিত বরিশাল বিসিক এলাকার ব্যবসায়ীদের মাঝে সম্ভাবনার আলো দেখান সাবেক শিল্পমন্ত্রী আলহাজ্ব আমির হোসেন আমু-এমপি। তিনি শিল্পমন্ত্রী থাকাবস্থায় বরিশাল বিসিক এলাকার উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তারই অংশ হিসেবে বিসিক এলাকার উন্নয়নে ৫২ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সালে ২০ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষে বিসিকের অভ্যন্তরীণ ১০ হাজার ৫০০ ফুট কার্পেটিং সড়ক, ১৭ হাজার ফুট ড্রেন, সীমানা প্রাচীর, গেট নির্মাণ ও পুকুর সংস্কার শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একই বছরের এপ্রিলে কার্যাদেশ পেয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ শুরু করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।

তবে শুরুতেই উন্নয়ন কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায় স্থানীয় মুখোশধারী চিহ্নিত ছিঁচকে চাঁদাবাজরা। বিসিককে এক সময়ের অপরাধের অভয়াশ্রম এবং বন্দুকযুদ্ধের ক্ষেত্রস্থলে ফিরিয়ে নিতে নিজেদের দেশের হিতৈষী ও ক্ষমতাসীন দলের লোক পরিচয় দিয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাছে চাঁদা দাবি করছে। কাজের ভুল ত্রুটির নাটক সাজিয়ে ঠিকাদারের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের জন্য হেনস্তা করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে তারা। ফলে চলমান উন্নয়ন কাজ মাঝ পথেই মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাথে সাথে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- ভেস্তে নেবার নিল নকশাও আঁকছে চক্রটি।

মঙ্গলবার বিকালে বিসিকে সরেজমিন পরিদর্শনকালে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের ভয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কাজ শুরুর পরে স্থানীয় কিছু লোক দেশের হিতৈষী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক প্রতিনিধি সেজে হুমকি-ধমকি দিয়ে হীন স্বার্থ আদায়ের চেষ্টা করছে। কখনো মোবাইল ফোনে আবার কখনো ব্যক্তি মাধ্যমে চাঁদা চাচ্ছে। তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় উন্নয়ন কাজ কিছু দিন বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়। শুধু তাই নয়, উন্নয়ন কাজে বাধা সৃষ্টি করতে ওই চাঁদাবাজ বাহিনী প্রায় দিনে এবং রাতে প্রকাশ্যে মোটরসাইকেলে মহড়া দিয়েছে। যা থানা পুলিশকে অবগত করা হলে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনও করেছে। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি থানা পুলিশ।

তারা বলেন, ‘গত এক মাস ধরে সড়ক সংস্কার কাজ চলছে। কিন্তু সড়ক সংস্কারের জন্য বালুর প্রয়োজন। ড্রেজারের পাইপ আনতে দেওয়া হচ্ছে না বিসিকে। আবার সড়কের অবস্থা খারাপ হওয়ায় বালুর ট্রাকও ঢুকতে পারছে না। অতিরিক্ত খরচ দিয়ে বালু আনতে হচ্ছে। যা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের জন্য লোকসান। কিন্তু সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের ভয় এবং কাজের স্বার্থে আইনী সহায়তা নিতেও পারছেন না তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, কাজ বন্ধ থাকায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে নানাভাবে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানকে। কেননা কাজের শুরুতে নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য যেমনটা ছিল তা এখন নেই। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির কারণে নির্মাণ সামগ্রীর দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। অথচ মূল্য বৃদ্ধি পেলেও নির্মাণ কাজের জন্য বরাদ্দ বাড়ছে না। ফলে এমন পরিস্থিতিতে লাভের মুখ দেখা নিয়েও চিন্তিত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।

অপরদিকে সরেজমিনে দেখাগেছে, ‘নির্মাণ কাজে বিলম্বতার কারণে বিসিকের প্রতিটি সড়কেরই বেহাল অবস্থা। একটি রাস্তাও চলাচল উপযোগী নেই। পণ্য খালাস এবং লোড করতে আসা পরিবহনগুলো চলাচল করতে পারছে না। কষ্ট করে বিসিকের সড়কে চলাচলের চেষ্টা করতে গিয়ে গর্তে চাকা দেবে যাচ্ছে। তা তুলতে আবার দিন চলে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে ঘটছে ছোটখাট দুর্ঘটনাও।

এদিকে বিসিক শিল্পনগরীর উন্নয়ন কাজের দায়িত্বে থাকা প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও শিল্পনগরী কর্মকর্তা মো. খায়রুল বশার বলেন, ‘উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। গত এপ্রিল থেকে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ শুরু করা হয়। এ কাজ বাস্তবায়নের মেয়াদ ছয় মাস। যা এরই মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ায় চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে কি কারণে কাজ বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে সে বিষয়ে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, একটু ঝামেলা ছিল তাই দেরি হয়েছে। তবে এখন আর কোন ঝামেলা নেই।

অপরদিকে বিসিক এর শিল্প সহায়ক কেন্দ্রের প্রধান মো. জালিস মাহমুদ বলেন, ‘বিসিকের ১৩১ একর জমিতে মোট ১৭৩টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া আছে। এর মধ্যে ১০১টি প্রতিষ্ঠান চলমান রয়েছে। এদের সমস্যা সমাধানসহ বিসিকের উন্নয়নের লক্ষ্যে সড়ক, ড্রেনেজ, সীমানা প্রাচীর এবং গেট নির্মাণ কাজ চলছে। এ কাজের পিডি’র দায়িত্বে আছেন শিল্পনগরী কর্মকর্তা মো. খাইরুল বাশার। কাজ নিয়ে কোন ঝামেলা আছে বা ছিল কিনা সেটা তিনি ভালো বলতে পারবেন। যদিও নতুন পিডি হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে আমি এখনো কাজ বুঝে নিতে পারিনি। কাজ বুঝে পেলে কোন প্রকার সমস্যা বা সম্ভাবনা থাকলে সেটা তখন বলা যাবে।

অপরদিকে মহানগরীর কাউনিয়া থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) আজিমুল করিম বলেন, ‘মোটরসাইকেল শোডাউনের ঘটনা ঘটেছে। তবে সেটা গত রোজারও আগে। খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিলাম। কিন্তু কেউ এ বিষয়ে অভিযোগ করতে রাজি হননি। তাছাড়া মৌখিকভাবে কেউ অভিযোগ করলে তার উপর ভিত্তি করা যায় না। অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) মো. খাইরুল আলম বলেন, ‘অনেক আগে এ ধরনের একটি ঘটনা আমি শুনেছিলাম। কাউনিয়া থানার ওসিকে এ বিষয়ে ব্যবস্থাও নিতে বলেছি। কিন্তু যাদের সাথে এ ঘটনা ঘটেছে তারা কেউ মামলা বা অভিযোগ করতে রাজি হননি। তাই পরবর্তী বিষয়টি নিয়ে আইনীভাবে এগোনো সম্ভব হয়নি। তবে ওসিকে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সরকারের কোন উন্নয়নে কেউ বাধা দিবে সেটা মেনে নেওয়া হবে না। সরকারি উন্নয়ন কাজ শতভাগ স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে আমরা পুলিশ বাহিনী সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবো। সরকারি কাজের সম্পদ পিঁপড়াও খেতে পারবে না। কেউ এক পয়সা খেলে তা আমরা বের করে দিব। আমি নিজে ওসিকে বলেছি কেউ মোটরসাইকেল শোডাউন ও চাঁদাবাজি করতে গেলে সে যেই হোক তাকে গ্রেফতার করার জন্য। তাকে গ্রেফতার করলে ইন্ধনদাতাও বেরিয়ে আসবে। সে ক্ষেত্রে তাকেও আইনের আওতায় আসতে হবে বলে জানান তিনি।

Sharing is caring!