বরিশাল ফিরেছে পুরনো রূপে, সচেতন মহলের উদ্বেগ

প্রকাশিত: ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০২০

শফিক মুন্সি ॥

বৈশ্বিক মহামারি করোনায় স্তব্ধ পুরো বিশ্ব। তবু জীবনঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হবার আতঙ্ক নিয়েই নতুনভাবে স্বাভাবিক হওয়া শুরু হয়েছে সবকিছু। তবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় শহর বরিশাল যেন একটু দ্রুতই ফিরেছে পুরনো রূপে। নগরীর মূল স্থানগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে তীব্র জনসমাগম বার্তা দিচ্ছে এমনই। কাঁচাবাজার, কমিউনিটি সেন্টার, রেস্তোরাঁ কিংবা সড়ক-মহাসড়ক, সর্বত্র অসচেতন জনাকীর্ণতা প্রকাশ করছে একটি কথাই। আর তা হলো, করোনা ভয় এখন আর এ অঞ্চলে বিরাজমান নেই। আর এমন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সচেতন মহল।

বরিশাল জেলায় করোনা ভাইরাসের আক্রমণে কোভিড ১৯ আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্ত হয় গত ১২ এপ্রিল। সেই থেকে চলতি মাসের গত ২৮ আগস্ট পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ছিয়ানব্বই জনে। এর মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন ৬০ জন। আক্রান্ত কিংবা শনাক্তের হার দিনকে দিন বাড়লেও কমেছে করোনা ভয়। যার সত্যতা পাওয়া যায় বরিশাল নগরী কিংবা একটু আশেপাশের এলাকার সর্বত্র। সামান্য প্রয়োজনে ভিড়ভাট্টা কিংবা জনসমাগম বাড়ছে চোখে পড়ার মতো। তবে প্রশাসন এখন আইনি পদক্ষেপের চেয়ে মানুষের ব্যক্তিগত সচেতনতা বৃদ্ধিতেই জোর দিচ্ছে বেশি।

গত সপ্তাহের শুক্রবার (২১ আগস্ট) বরিশাল নগরীর পুলিশ লাইনস রোডের একাধিক আধুনিক রেস্তোরাঁয় ছিল বিয়ে, সুন্নাতে খৎনা (মুসলমানি) সহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠান। এ সপ্তাহের শুক্রবারও (২৮ আগস্ট) একই চিত্র ফুটে উঠেছে সেসব জায়গায়। সেদিন বিকেলে (বাদ আসর) বরিশাল নগরীর ঐতিহ্যবাহী সাগরদী ইসলামিয়া মাদ্রাসার মসজিদ প্রাঙ্গণে হয়েছে ৭ টি বিয়ের (কাবিন) অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানগুলোতে মানুষের অতিরিক্ত সমাগম লক্ষ্য করা গেলেও লক্ষ্য করা যায় নি যথেষ্ট স্বাস্থ্য বিধি মানার কোন লক্ষণ।

এদিকে বরিশাল নগরীর রূপাতলী, বাংলাবাজার ও চৌমাথা কাঁচাবাজারে গত দুদিন (শুক্র ও শনিবার) সরেজমিনে গিয়ে পাওয়া গেছে আরো ভয়াবহ চিত্র। লোকে লোকারণ হয়ে ওঠা এসব জায়গায় গিয়ে বোঝারই উপায় নেই যে দেশে করোনা ভাইরাসের কোন উপস্থিতি আছে। পূর্ব রূপাতলী কাঁচাবাজারে করোনা প্রতিরোধক নিরাপত্তা সামগ্রী (মাস্ক, গ্লাভস ইত্যাদি) ছাড়াই বাজার করতে এসেছেন আসলাম শেখ (৩৭)। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ৭ বছর বয়সী কন্যা সন্তান। করোনা জীবাণু প্রতিরোধক সামগ্রী না নিয়ে বাজারে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, মাস্ক আনার কথা মনে ছিল না। আর ছোট্ট শিশুকে নিয়ে বাজারে আসার কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, করোনা সংক্রমণ রুখতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তাঁর সন্তান অনেক দিন যাবৎ বাড়িতে বন্দী। একঘেঁয়েমি কাটাতে একটু বাইরে নিয়ে এসেছেন।

অসচেতনতার এমন চিত্র মোটামুটি বরিশালের সর্বত্র। যেটা স্বীকার করেছেন বরিশালের সিভিল সার্জন ডাঃ মনোয়ার হোসেন নিজেও। এই চিকিৎসক বলেন, ‘নগরবাসীর করোনাকে তুচ্ছ করে অসচেতনভাবে বিভিন্ন জায়গায় একত্র হবার চিত্র আমার নজর এড়িয়ে যায় নি। সবার আচরণ দেখে মনে হয় দেশ থেকে করোনা জীবাণু প্রস্থান করেছে। কিন্তু আসলে বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। সকলে মিলে যদি এমন আচরণ করে তবে অচিরেই করোনা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে ভয়াবহ কিছু একটা ঘটবে’। বরিশাল নগরী জুড়ে জনসমাগমের চিত্রে তিনি উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহবান জানান।

আর এ ব্যাপারে বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার মোঃ সাইফুল ইসলাম জানান, করোনার বিস্তার, প্রতিরোধের উপায় এবং ভয়াবহতা সম্পর্কে জানে না এমন কোন মানুষ হয়তো নেই। তবে ব্যক্তিগত অবস্থানে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার বিষয়টিতে ঘাটতি দেখা যায়। কিন্তু যেকোনো ধরনের জনসমাগম রুখতে এবং করোনা জীবাণু সংক্রমিত হতে পারে এমন অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে বরিশাল জেলা পুলিশ তৎপর আছে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরো উল্লেখ করেন, অন্যের জন্য নয় নিজের স্বার্থেই সবাইকে করোনা জীবাণু প্রতিরোধে সচেতন হওয়া উচিত। নিজেকে সুস্থ রাখতে বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং বাইরে বের হলে করোনা প্রতিরোধক সামগ্রী (মাস্ক, গ্লাভস ইত্যাদি) ব্যবহার করা উচিত।

Sharing is caring!