বরিশাল উত্তর জেলা যুবদলের কমিটি গঠন নিয়ে নয়া বিতর্ক

প্রকাশিত: ১১:০৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২১

বয়সের সীমাবদ্ধতায় বাদ যাচ্ছেন যোগ্যরা

খান রুবেল ॥ সাংগঠনিক দুর্বলতা, কমিটি বাণিজ্য, অসাংগঠনিক আচরণ, মাদক সম্পৃক্ততা এবং পদ বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের কারণে বাতিল করা হয়েছে বরিশাল উত্তর জেলা যুবদলের কমিটি। বিএনপি’র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী যুবদলের এ ইউনিটে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের তৎপরতা চলছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে চলতি মাসের মধ্যে উত্তর জেলা যুবদলের এ কমিটি ঘোষণা করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় সংসদ। নতুন করে গঠন হতে চলা যুবদলের এ ইউনিট কমিটিতে পদ পেতে এরই মধ্যে অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক বায়োডাটাও জমা দিয়েছেন অনেকে। তবে কমিটিতে যাদের নিয়ে আলোচনা চলছে তাদের নিয়ে নতুন করে সমালোচনার ঝড় শুরু হয়েছে। কেননা যুবদলের পদ পেতে মূল দল থেকে পদত্যাগ এবং অযোগ্য ও নিষ্ক্রিয় নেতারা বরিশাল উত্তর জেলা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির শীর্ষ পদ বাগিয়ে নিতে চাচ্ছেন।

 

শুধু তাই নয়, সাংগঠনিক দুর্বলতাসহ নানা অভিযোগের কারণে বিলুপ্ত হওয়া পূর্বের কমিটির শীর্ষ নেতারাই আবার নতুন করে আহ্বায়ক কমিটিতে নাম লেখাতে চাচ্ছেন। তারা তাদের পদ নিশ্চিত করতে জোরালো লবিং চালাচ্ছেন হাই কমান্ডে। পদে পেতে অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। এর ফলে তৃণমূলের ক্লিন ইমেজের ত্যাগী, যোগ্য এবং মেধাবী নেতাদের মধ্যে নতুন করে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।
জানাগেছে, গত বছরের অক্টোবরে সাংগঠনিক ব্যর্থতা এবং একাধিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে বরিশাল উত্তর জেলা যুবদলের সুপার ফাইভ কমিটি বাতিল করে কেন্দ্রীয় যুবদল। ওই কমিটি গঠনের পর পরই কেন্দ্র বরিশাল বিভাগীয় টিমের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব গঠনের জন্য পদপ্রত্যাশী নেতাদের আবেদন গ্রহণ শুরু করেন।

যুবদলের বরিশাল বিভাগীয় টিমের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, উত্তর জেলা যুবদলে যারা পদপ্রত্যাশী তাদের মধ্যে বেশীরভাগই বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত। আবার মূল দল বিএনপি’র শীর্ষ স্থানীয় পদে থেকে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন নেতাও রয়েছেন উত্তর জেলা যুবদলে পদ প্রত্যাশীর তালিকায়। এ কারণে পদ প্রত্যাশী ওইসব নেতাদের যুবদলের পদে আসাটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আবার অনেকে আবেদন করেছেন যারা যোগ্য এবং মেধাবী হলেও বয়সের সীমাবদ্ধতায় আটকে গেছেন।
যুবদলের ওই সূত্রটি আরও জানিয়েছে, উত্তর জেলা যুবদলের আহ্বায়ক পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে থাকা কাজী কামাল হোসেন মুলাদী উপজেলা পৌর বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। দীর্ঘ ১০ বছর এই দায়িত্বে আছেন তিনি। পদ প্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন দেওয়ান মনির হোসেন। যিনি হিজলা উপজেলা বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও উত্তর জেলা যুবদলের ব্যর্থ কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি। তিনি ঢাকা জজ কোর্টে আইন পেশায় নিযুক্ত। সেই সুবাদে রাজধানীতেই বসবাস তার।

পদ প্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন সদ্য বিলুপ্ত হওয়া উত্তর জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন পিপলু। যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের নেই। বাল্য বন্ধুর সুপারিশে রাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষ পদে আসীন হওয়া এই নেতা সাবেক কমিটির সভাপতির সাথে জোটবদ্ধ হয়ে অর্থের বিনিময়ে জেলা ও উপজেলা কমিটিতে পদ দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ বাণিজ্য করেন। এ অভিযোগের কারণেই উত্তর জেলা যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত করে কেন্দ্রীয় সংসদ। সেই পিপলুই আবার আহ্বায়ক কমিটির শীর্ষ পদের দাবিদার হয়েছেন।

 

যুবদলের একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘উত্তর জেলা যুবদলের কমিটিতে ইতিপূর্বে যারা আলোচনায় ছিলেন তাদের পদে আসার বিষয়টি অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ কারণে পিপলুকেই শেষ ভরসা হিসেবে দেখছেন একটি মহল। যারা সঙ্গবদ্ধভাবে সিন্ডিকেট তৈরি করে লবিং চালাচ্ছেন কেন্দ্রীয় হাই কমান্ডে। এরই মধ্যে গত শনিবার পিপলুকে কমিটির শীর্ষ পদে আনতে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতা টুকু’র কাছে ধর্না দিয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি রাজিব আহসান। তিনি যেকোন মূল্যে পিপলুকে উত্তর জেলা যুবদলের আহ্বায়ক বা সভাপতি করতে জোর অনুরোধ জানিয়েছেন যুবদলের ওই শীর্ষ নেতার কাছে।

 

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, নতুন করে উত্তর জেলা যুবদলের পদ প্রত্যাশী সালাউদ্দিন পিপলু’র বিরুদ্ধে মাদক সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে রয়েছে মাদক মামলাও। তার একটি মামলার সহযোগী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রাজিব আহসান। মূলত তারা এক সঙ্গেই ইয়াবা এবং মদসহ পুলিশের হাতে আটক হন।
অপরদিকে, সালাউদ্দিন পিপলু ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধাচরণের অভিযোগ রয়েছে। পিপলুর বড় ভাই লঞ্চ ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগ নেতা স্বপন জমাদ্দার ওয়ান ইলেভেনের সময়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে এক সভায় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সারাসরি অভিযোগ করেন। সেই সভায় তারেক রহমান ও তার পরিবারের কাছে নৌ-মন্ত্রণালয় জিম্মি ছিল এবং তারেক রহমানের গ্রেফতারের কারণে সেই জিম্মি দশা থেকে মুক্তি পান বলে বক্তব্য দেন। যা তখনকার সময় বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও পত্রিকায় প্রকাশ পায়।

এমনকি পিপলু নিজেও ওইসময় আরাফাত রহমান কোকোর মালিকানাধীন কোকো লঞ্চ কোম্পানির লঞ্চ মেহেন্দিগঞ্জের ঘাটে ভিড়তে দেননি বলে অভিযোগ স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের। তাছাড়া পিপলু’র আপন তিন ভাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় পর্যায়ে থানা এবং পৌর আওয়ামী লীগে পদ রয়েছে তাদের। পিপলু তার রাজনীতিতে বিরোধিতাকারীদের ভাইদের মাধ্যমে পুলিশ এবং নেতাদের দিয়ে দমন-নীপিড়ন করান তিনি।

 

তাদের হামলার শিকার হয়ে পঙ্গু জীবন যাপন করছেন মেহেন্দিগঞ্জ আর.সি কলেজের সাবেক ভিপি ও ছাত্রদল নেতা আসাদুজ্জামান লাভলু। পাশাপাশি পিপলুর বিরুদ্ধে যুবদলের কমিটিতে থাকাবস্থায় জেলা, বিভিন্ন উপজেলা এবং পৌরসভা কমিটি দেয়ার নাম করে নেতাকর্মীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ ওঠে। তদন্ত করে যার প্রমাণও পায় যুবদলের বিভাগীয় টিম।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সালাউদ্দিন পিপলুর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। অবশ্য ইতিপূর্বে সাংবাদিকদের দেয়া এক বক্তব্যে পিপলু দাবি করেন, রাজনীতিতে প্রত্যেকটা লোকের প্রতিপক্ষ থাকে। আমার প্রতিপক্ষরা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে। তাছাড়া কেন্দ্র যদি মনে করেন আমি যোগ্য তবে তারাই আমার পদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন।

 

এদিকে, যুবদলে পদ প্রত্যাশী ছাত্রদলের সাবেক কয়েকজন নেতা হতাশার সুরে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থেকে সংগঠনকে কিভাবে শক্তিশালী করতে হয় তা শিখেছি। এখন মূল্যায়নের দায়িত্ব দলের। এই মুহূর্তে দলের ত্যাগীদের মূল্যায়ন না করা হলে স্থানীয়ভাবে বিএনপিকে সঙ্কটের মধ্যে পড়তে হবে। আন্দোলন সংগ্রামে কর্মীর যোগান দেয়াও কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। তাই কমিটি দেয়ার ক্ষেত্রে বয়সের বিবেচনা না করে অবশ্যই সাংগঠনিক যোগ্যতা, রাজনৈতিক মেধা এবং দক্ষ নেতৃত্ব গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন পদ প্রত্যাশীরা।