বরিশালে ৩য় শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ : লটারিতে ভাগ্য পুড়েছে মেধাবীদের

প্রকাশিত: ১১:১০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৩, ২০২১

তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হবে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী

খান রুবেল ॥ সম্প্রতি লটারির মাধ্যমে তৃতীয় শ্রেণিতে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের ভর্তি কার্যক্রম নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন অধিকাংশ অভিভাবক। কেননা লটারি পদ্ধতিতে বেশিরভাগ মেধাবী ক্ষুদে শিক্ষার্থীই সরকারি স্কুলে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তবে যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার যোগ্যতা রাখে না সেসব শিক্ষার্থী সরকারি স্কুলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। এমনকি এবারে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির অপেক্ষায় থাকা ক্ষুদে শিক্ষার্থীরাও লটারিতে টিকে গিয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।
ফলে চলমান করোনা মহামারিকালে লটারির মাধ্যমে অটোপাস পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অধিকাংশ অভিভাবক।

এমনকি এ পদ্ধতির কারণে অধিকাংশ ক্ষুদে শিক্ষার্থীর মনোবল নষ্ট হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জানাগেছে, বরিশাল নগরীতে পাঁচটি সরকারি স্কুল রয়েছে। এগুলো হলো বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বরিশাল জিলা স্কুল, সরকারি শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত উচ্চ বিদ্যালয়, শহীদ আরজু মনি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এবং সরকারি বরিশাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতি বছর পাঁচটি সরকারি স্কুলেই নির্দিষ্ট সংখ্যক আসনের বিপরীতে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা ভর্তির সুযোগ পেতো। কিন্তু এ বছর মহামারি করোনার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অটো প্রমোশন পদ্ধতিতে ভর্তির নির্দেশ দেয় সরকার।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি ওইসব স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়মে আবেদন করা হয়। গত ১১ জানুয়ারি আবেদনকৃত শিক্ষার্থীদের অটো প্রমোশনের জন্য জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়নে লটারি করে ফলাফল ঘোষণা করে স্ব স্ব স্কুল কর্তৃপক্ষ। তবে প্রকাশিত ফলাফলে আশাহত হয়েছেন অধিকাংশ শিক্ষার্থীর অভিভাবক।

নগরীর ব্রাউন কম্পাউন্ড রোডের সাউদার্ন বাংলাদেশ স্কুল এর শিক্ষার্থী রাফি। এবছর তাকে সরকারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি’র জন্য আবেদন করা হয়েছিল। রাফি’র মা রেখা বলেন, ‘লটারি’র মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি’র কার্যক্রম মোটেই সন্তোষজনক হয়নি। কেননা আমার ছেলে ভর্তি পরীক্ষা দিলেও উত্তীর্ণ হতো। অথচ পছন্দের তালিকায় পাঁচটি স্কুলের নাম উল্লেখ করে আবেদন করার পরেও ভর্তি’র সুযোগ পেলো না।

রেখা বলেন, ‘শুধু আমার ছেলেই নয়, ওর স্কুলের সব থেকে যে মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে তারাও লটারিতে ভর্তি’র সুযোগ পায়নি। আমাদের এ স্কুলটি থেকে একজন মাত্র মেয়ে সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি’র সুযোগ পেয়েছে।

একইভাবে আক্ষেপ করেছেন বরিশাল নগরীর ওয়াইডব্লিউসিএ স্কুলের ক্ষুদে শিক্ষার্থী তানিমা ইসলাম এর মা তানিয়া। তিনি বলেন, ‘যাদের সরকারি স্কুলে ভর্তি’র সযোগ পাওয়ার কথা তারাই বঞ্চিত হয়েছে। যাদের ভর্তি’র সুযোগ পাওয়ার কথা না তারা ভর্তি’র সুযোগ পেয়েছে। এটা আমাদের অভিভাবক এবং এটুকু বাচ্চার জন্যও কষ্টদায়ক।
অপরদিকে, খোঁজ নিয়ে জানাগেছে নগরীর গির্জা মহল্লায় একজন ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ীর শিশু কন্যা এবার মডেল স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি’র সুযোগ পেয়েছে। অথচ ইতিপূর্বে তাকে কোন স্কুলেই ভর্তি করানো হয়নি। এ বছর তাকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করানোর কথা ছিল। এতটুকু শিশু যে স্বরবর্ণ কিংবা ব্যঞ্জন বর্ণও ঠিকভাবে চেনে না, সে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হলে লেখা-পড়ার উন্নয়ন কতটুকু ঘটবে এমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, ‘শুধু ওই একজনই নয়, এমন অনেক শিক্ষার্থীই এবার লটারির বদৌলতে প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণি’র শিক্ষা গ্রহণ না করেই সরকারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। আর যাদের সুযোগ পাওয়ার কথা সেসব বঞ্চিত ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের কোন স্কুলে ভর্তি করা হবে সে নিয়ে চিন্তায় আছেন তাদের অভিভাবকরা।
এসব বিষয়ে আলাপকালে বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহবুবা হোসেন বলেন, ‘এবারের লটারির বিষয়টি পুরোটাই সরকারি সিদ্ধান্তে হয়েছে। সুতরাং এ নিয়ে বলার কিছু নেই। তবে প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া-শোনা করেনি এমন শিক্ষার্থীকে তৃতীয় শ্রণিতে ভর্তির সিদ্ধান্ত অভিভাবকদের জন্য ভুল সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘ভর্তি ক্ষেত্রে শ্রেণি অনুপাতে এক বছরের ব্যবধান হলে সেটা মানিয়ে নেয়া যায়। তবে যে শিশু প্রথম কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়েনি তাকে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করা হলে সেটা ওই শিশুটির জন্যই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কেননা অতিরিক্ত চাপ নিতে তার জন্য সমস্যা হবে। যাঁর কারণে সে ক্রমশ আরও পিছিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, ‘এমন শিশুকে ভর্তি করা হলে আমাদের শিক্ষকদেরও বেগ পেতে হবে। এজন্য শিক্ষার্থীরা সতর্কতার সাথে কাজ করে এগিয়ে যেতে পারবে। তবে তার থেকে অনেক বেশি সংকটে পড়তে হবে শিশুটিকেই। তাই অভিভাবকদের এ ধরনের সিদ্ধান্তে যাওয়াটা আমি আশা করছি না। তাছাড়া যারা লটারিতে টিকেছে তাদের কাগজপত্র এখনও আমাদের হাতে এসে পৌঁছেনি। আগামী ১৬-১৭ জানুয়ারি অভিভাবকদের আমরা ডেকেছি। তাদের কাছ থেকে শিশুর জন্মনিবন্ধনসহ লেখাপড়ার যাবতীয় প্রমাণ গ্রহণ করা হবে। তখন শিশুটির বয়সের বিষয়টিও সচক্ষে দেখা যাবে।

এদিকে, ‘অপ্রাপ্ত বয়স্ক এবং নিচের ক্লাসে না পড়া শিক্ষার্থীদের তৃতীয় শ্রেণিতে সুযোগ পাওয়ার বিষয়টিতে কিছুটা হতবাক হয়েছেন বরিশাল জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) প্রশান্ত কুমার দাস। তিনি বলেন, ‘এমন ঘটনা আমি এই প্রথম (প্রতিবেদকের কাছ থেকে) শুনেছি। তবে এমনটি হওয়ার সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয় না। কেননা কেবল লটারি হয়েছে। এখনো ভর্তি কার্যক্রম বাকি রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘লটারির বিষয়টিতে স্থানীয় পর্যায়ে কোন হাত নেই। এটা পুরোটাই ঢাকা থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে করা হয়েছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে আমাদের যাচাই বাছাই টিম রয়েছে। যারা লটারিতে উত্তীর্ণ হয়েছে ওই টিম তাদের যাবতীয় বিষয়গুলো যাচাই বাছাইয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে। এখনো স্কুলে ভর্তি না হওয়া শিশুদের তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সে বিষয়টি আমরা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবো। সেখান থেকে এ বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত আসবে সে অনুযায়ী আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।