বরিশালে হোস্টেলে ভূত আতঙ্কে ৪ ছাত্রী হাসপাতালে : কলেজ বন্ধ ঘোষণা

প্রকাশিত: ১১:০০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২১

স্টাফ রিপোর্টার ॥ নগরীর রূপাতলী এলাকায় ভূত আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ছয় শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারানো চার শিক্ষার্থীকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সুস্থ হলে শনিবার বেলা ১২টার দিকে তাদেরকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। এর আগে শুক্রবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নগরীর রূপাতলী এলাকায় ২৫ নম্বর ওয়ার্ডস্থ জমজম নার্সিং কলেজের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার আবাসিক মেসে কয়েক দফায় ভূত আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়েন ওই শিক্ষার্থীরা। এর পর পরই ওই রাতে জমজম নার্সিং কলেজ এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন কর্তৃপক্ষ। তাই রাতেই হোস্টেল ছেড়ে চলে যান অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থী। বাকিরাও শনিবার সকালে স্বজনদের সাথে কলেজের মেস থেকে বিদায় নেন।

 

তাছাড়া খবর পেয়ে ওই রাতেই বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, থানা পুলিশ এবং সিআইডি’র টিম ওই কলেজটি পরিদর্শন করেছেন। তবে সেখানে আসলে কি হয়েছে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য খুঁজে পাননি তারা। আর কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছেন ভূত বলতে কোন কিছু নেই। শিক্ষার্থীরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তবে সবাই এখন সুস্থ আছেন বলে জানিয়েছেন জমজম নার্সিং কলেজের চেয়ারম্যান মাসুদুল হক।

আবার অসুস্থ হয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা দেয়া বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিট-২ এর মেডিকেল অফিসার ডা. মো. শাহিন বলেন, ‘ শুক্রবার রাতে জমজম নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী জামিলা আক্তার (১৮) তামান্না আক্তার (১৮), সেতু দাস (২১) ও বৈশাখী (১৮) নামের চার শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি হন। তারা কোন কিছু দেখে আতঙ্কিত হয়ে ছিলেন। সাধারণত এই রোগে চিকিৎসা তাদের পরিবার ও সহপাঠীরাই দিতে পারেন। তাই তাদের মানসিক শক্তি জোগাতে পরিবারের হেফাজতে পাঠানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

 

অসুস্থদের সহপাঠী মো. মেহেদী হাসান জানান, ‘কলেজের একাডেমিক ভবনের ৬ষ্ঠ তলায় একটি মাদ্রাসা ছিল। আর পশ্চম তলায় ছিল জমজম নার্সিং কলেজের ছাত্রী হোস্টেল। মাদ্রাসাটি সরিয়ে নেয়ায় সেখানে ম্যাটস্ ও নার্সিং অনুষদের ছাত্রীদের আবাসনের (হোস্টেল) ব্যবস্থা করা হয়। করোনার কারণে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পরেও পরীক্ষা ও ব্যবহারিক কাজের জন্য চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে কলেজ চালু হয়।

অসুস্থ হয়ে পড়া ছাত্রী সেতু দাস জানিয়েছেন, ‘করোনা শুরুর প্রথম দিকে তারা ওই হোস্টেলে আসেন। তখন তেমন কোন আলামত পাওয়া যায়নি। তাছাড়া বছর শুরুর কয়েক মাসের মাথায় করোনার কারণে কলেজ বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, পরীক্ষার কারণে আমরা ৩৫ জন শিক্ষার্থী চলতি বছরের জানুয়ারি হোস্টেলে আসি। এর পর থেকেই প্রতি রাতে হোস্টেল ভবনের ছাদে কারোর হাঁটা-চলার শব্দ পাওয়া যায়।

 

সেতু বলেন, ‘প্রথম দিকে আমরা বিষয়টিতে তেমন গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু এ সমস্যা দিন দিন প্রকট হতে থাকে। যে কারণে বিষয়টি কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। কিন্তু তারা মোটেই গুরুত্ব দেননি। বরং বিষয়টি গোপন রাখার জন্য বলেন। সবশেষ ঘটনার দিন অর্থাৎ শুক্রবার মিথিলা নামের শিক্ষার্থী জিন বা ভূতের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন। তার দেখাদেখি আরও চারজন অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

সেতু বলেন, ‘বিষয়টি জানতে পেরে হোস্টেল সুপারসহ কলেজ কর্তৃপক্ষ হোস্টেলে হুজুর এনে দোয়া-মোনাজাত করান। এর পরেও সন্ধ্যা ৭টার দিকে পুনরায় ছাদ থেকে গুম গুম শব্দ আসতে শুরু করে। তার মধ্যে মিথিলা নামের ছাত্রী মেসের বাথরুমে যান। সেখানে হাত ধোয়ার সময় দেখতে পান তার একটি হাতে পাশাপাশি তিনটি নখের আঁচড়। এটা দেখে ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি।
সেতু নামের ওই ছাত্রী আরও বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারিতে কলেজ খোলার পরে এমন আরও একটি ঘটনা জমজম নার্সিং কলেজের আবাসিক হলে ঘটেছে। তখন শিমু নামের এক ছাত্রী হঠাৎ করে দেখতে পান তার হাতে অনেক বড় একটি নখের আঁচড় লেগে আছে। তবে তখন বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি কেউ। আস্তে আস্তে জিনের উপদ্রব ভোগ করেন সকল শিক্ষার্থী।

 

হোস্টেল সুপার শাওনা আক্তার বলেন, ইতিপূর্বে শিক্ষার্থীরা বহুবার ছাদে মানুষের হাঁটাচলার শব্দ পাচ্ছে বলে আমাকে জানিয়েছে। আমি নিজেও হোস্টেলে থাকাবস্থায় গভীর রাতে একই শব্দ পেয়েছি। শব্দ পেয়ে কয়েকবার ছাদে উঠেও দেখেছি। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ছাদ থেকে নেমে আসার ঘণ্টাখানেক পরে আবারও সেই রহস্যজনক শব্দ ভেসে আসে।
জমজম নার্সিং কলেজের চেয়ারম্যান মাসুদুল হক বলেন, ‘ভূত বলে কিছু নেই। তবে জিন থাকতে পারে। সেটাও আমরা নিশ্চিত নই। কেননা ঘটনার রাতে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়লে আমি নিজে ওই রাতে হোস্টেলে অবস্থান নেই। কিন্তু তেমন কোন আলামতই পাইনি। খবর পেয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা এসেছেন। তারা ভালোভাবে খোঁজ খবর নিয়ে দেখেছেন। তারাও কিছু খুঁজে পাননি।

 

তিনি বলেন, সামনে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা। তারা এ নিয়ে অনেক চিন্তিত। হতে পারে এ নিয়েই চিন্তা করতে গিয়ে তারা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তবে দুই শিক্ষার্থীর হাতে থাকা জখম (আঁচড়) কিভাবে এলো সে বিষয়ে কিছু বলতে না পারলেও মাসুদুল হক বলেন, ‘অনেক সময় এলার্জির সমস্যার কারণে এটা হতে পারে। তবে শিক্ষার্থীদের হাতে যে দাগ রয়েছে সেটা দেখে নখের আঁচড়ই মনে হচ্ছে। এ বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে দেখতে পারে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘ইতিপূর্বে কলেজের ষষ্ঠ তলায় খিদমাতুল মাদীনা হিফজুল কুরআন মাদ্রাসা নামের একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। সেখানে এক থেকে দেড়শ ছেলে শিক্ষার্থী থাকতো। এ কারণে বাড়ি মালিকের সাথে চুক্তি অনুযায়ী এখান থেকে মাদ্রাসা সরিয়ে নিতে বলা হয়। তবে মাদ্রাসা থাকাবস্থায় এখন যে সমস্যার কথা বলা হচ্ছে তেমন কোন সমস্যার কথা আদৌ কেউ বলেনি।

 

তার পরেও বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের শান্ত রাখার জন্য আমরা আপাতত সাত দিনের জন্য কলেজ বন্ধ ঘোষণা করেছি। এ সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী কলেজে হুজুর বা ফকির ডেকে বান (জিন তাড়ানোর বিশেষ পদ্ধতি) মারার ব্যবস্থা করা হবে। আমরা আশাবাদী এতেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

যোগাযোগ করা হলে জমজম নার্সিং কলেজের ষষ্ঠ তলা থেকে চলে যাওয়া খিদমাতুল মাদীনা হিফজুল কুরআন মাদ্রাসা’র সুপার হাফেজ মাওলানা মুনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা টানা এক বছরও ওই ভবনে ছিলাম। কিন্তু সেখানে এ ধরনের কোন আলামত পাইনি। হতে পারে সেখানে সার্বক্ষণিক কোরআন তেলাওয়াত হতো সেকারণে আমরা কোন আলামত পাইনি। তবে সম্প্রতি ওই কলেজে যে ঘটনাটি ঘটেছে সে বিষয়টি আমিও শুনেছি। তবে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলতে পারছি না।