বরিশালে সংকটে মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষেরা, সামনে বাড়তে পারে অন্ধকার

প্রকাশিত: ১১:১৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০২০

শফিক মুন্সি ॥

মহামারি করোনার প্রভাবে উপার্জন হারানো মানুষদের ভিড় লক্ষ্য করা যায় আশেপাশে তাকালেই। আর্থিক ক্ষতি থেকে বাঁচতে কিংবা উৎপাদন কমে যাওয়ার দরুণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মী ছাটাই এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু করোনাকালীন সময়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা উপার্জন হারানো মানুষের সংখ্যা কত সে ব্যাপারে নির্দিষ্ট করে কেউ জানাতে পারে নি। সরকারের পক্ষ থেকে এসব মানুষদের পাশে দাঁড়াবার জন্য ঘোষণা করা হয়েছে বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ। কিন্তু কাদের এই সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এবং কিভাবে এসব প্রণোদনার যথাযথ ব্যবহার হবে সেটা নির্ধারণ করা যায় নি এখনো। তাই করোনার এই নতুন বাস্তবতায় দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে যত দ্রুত সম্ভব ভিন্নভাবে ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তানজিলুর রহমান ইবাদ (২৮) চট্টগ্রামের একটি ছোট তৈরি পোশাক কারখানার কর্মচারী ছিলেন। করোনাকালীন লকডাউনে দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকায় প্রথমে বেকার হয়ে পড়েন তিনি। পরবর্তীতে গত জুন মাসে কারখানার মালিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কর্মী ছাঁটাই করেন। মালিকের এই সিদ্ধান্তে কর্মসংস্থান হারান ইবাদ। বর্তমানে তিনি বরিশাল নগরীতে অবস্থিত তাঁর বাবার ভাড়া বাসায় থাকেন। আর ইবাদের স্ত্রী ও একমাত্র শিশুপুত্র থাকে তাঁর শ্বশুর বাড়িতে। আর্থিক অনটনে পড়েই পরিবারের দুজন দুজায়গাতে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

মোঃ মানিক (ছদ্মনাম) বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন দৈনিক মজুরি ভিত্তিক অস্থায়ী কর্মচারী। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলে তাকে উপার্জনহীন থাকতে হয়। করোনা প্রাদুর্ভাব রুখতে গত ১৭ মার্চ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। এমন অবস্থায় প্রথম দুমাস তিনি বেকার ছিলেন। পরবর্তীতে বন্ধ থাকা অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এসব দৈনিক মজুরি ভিত্তিক কর্মচারীদের দুরবস্থার কথা চিন্তা করে তাদের জন্য কিছু কাজের ব্যবস্থা করে। কিন্তু এসব কাজে তাঁর উপার্জন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অর্ধেকে নেমে গেছে।

তিনি বলেন, ‘ বিশ্ববিদ্যালয় খোলা থাকা অবস্থায় প্রতি মাসে সাড়ে সাত হাজার টাকার মতো মজুরি পেতাম। তাই দিয়ে স্ত্রী ও দুটি সন্তান নিয়ে বরিশালে ভাড়া বাসায় থাকতাম। বর্তমানে যে টাকা পাচ্ছি তাতে তিনবেলা খাবার যোগানোই কষ্টের। বাড়ি ভাড়া বাকি পড়েছে তিনমাসের’। আর কর্মসংস্থান হারানো ইবাদ বলেন, ‘ মাসখানেক যাবৎ হন্যে হয়ে নতুন চাকরি খুঁজছি৷ কিন্তু কোথাও সম্মানজনক কিছু করার মতো পাচ্ছি না। উপার্জন নেই বিধায় স্ত্রী ও এক বছর বয়সী বাচ্চাকে শ্বশুর বাড়িতে রাখতে বাধ্য হয়েছি’।

বাংলাদেশ সরকার করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্পসুদে ৩০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ সুবিধা প্রণয়ন করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে সর্বশেষ বাজেটে। এছাড়া ক্ষুদ্র (কুটির শিল্পসহ) ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য স্বল্পসুদে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ সুবিধা প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব সরকারি সহায়তা পাবার যোগ্য ব্যক্তিরা যেন সহজে এসকল সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন সেজন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

অন্যদিকে রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন বা ভাতা পরিশোধ করার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার একটি আপদকালীন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়নে কোন নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এখনো গ্রহণ হয় নি। এমনকি যারা এই মহামারিতে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন কিংবা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোন তথ্য কারো কাছে নেই। যে কারণে সরকারি এসব ঘোষণা এবং অর্থনৈতিক পুনঃ জাগরণের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত শুধুই ফাঁকা বুলি হিসেবে রয়ে যায় কিনা সেটাই ভাবাচ্ছে অনেককে।

করোনায় এমন কর্মসংস্থান হারানো কিংবা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা কত সে তথ্য সরকারি – বেসরকারি কারো কাছে নেই বলে জানালেন অর্থনীতিবিদ ও সরকারি বিএম (ব্রজমোহন) কলেজের শিক্ষক মোঃ আক্তারুজ্জামান খান। তবে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং সরকারি প্রণোদনা ও অন্যান্য সুবিধা কার্যকর করতে এসব ব্যক্তিদের তালিকা ও তথ্য সংরক্ষণ করে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আমরা আশেপাশে তাকালেই দেখতে পাচ্ছি অনেকে করোনায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকার থেকেও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের তথ্যসমৃদ্ধ কোনো তালিকা করা হয় নি’।

তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি-বেসরকারি সহায়তা করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছাতে হলে এখনই তাদেরকে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে কৃষি, শিল্প ও সেবাখাতের সঙ্গে জড়িত যারা কর্ম হারিয়েছে তাদেরকে কিভাবে পুনঃনিযুক্ত করা যায় সেটা নিয়ে এখনই নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় সামনেই উন্নয়ন এবং অর্থনীতির চাকা বন্ধ হয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে বাংলাদেশ।

মহামারি করোনার আঘাতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষদের রক্ষার্থে দুটি উপায়ের কথা জানালেন সমাজবিজ্ঞানী ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোঃ ছাদেকুল আরেফিন। তিনি জানান, করোনায় মানুষের উপার্জন চলমান রাখতে সরকার যেসব প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সেগুলোর প্রাপ্যতা যেন সহজলভ্য হয় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে৷ অন্যদিকে যারা নতুন কর্মসংস্থান খুঁজছেন তাদেরকে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় আত্মকর্মসংস্থান তৈরিতে জোর দিতে হবে। কারণ নতুন বাস্তবতায় ঘরে বসে উপার্জন চলমান রাখতে অনলাইন ভিত্তিক আউটসোর্সিং এবং ব্যবসার গুরুত্ব বাড়ছে। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু রয়েছে বলে জানান এই সমাজবিজ্ঞানী।

Sharing is caring!