বরিশালে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে বাড়ছে অশ্লীলতা

প্রকাশিত: ১০:৪০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০২০

শফিক মুন্সি ::

বরিশাল নগরীজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে একাধিক বিনোদন কেন্দ্র। নাগরিক ব্যস্ততা কাটিয়ে এসব জায়গায় ভিড় করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ।পরিবার – পরিজন কিংবা পরিচিত মানুষদের নিয়ে কিছুটা ভালো সময় কাটাতে এই জায়গা গুলোতে আসেন অনেকে। কিন্তু ইদানীং ঘুরতে আসার নামে বিনোদন কেন্দ্র গুলোতে বসছে অশ্লীলতার পসার। যা সমাজের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক বলে জানিয়েছেন সচেতন মহল। আর এসব অশ্লীলতা দূরীকরণে নজরদারি বাড়িয়ে আইনের প্রয়োগ বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

বরিশাল নগরীর বান্দ রোড এলাকার প্লানেট শিশু পার্ক, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক ও বঙ্গবন্ধু উদ্যান (বেলস পার্ক) অবসর সময় কাটানোর জন্য নগরবাসীর কাছে বেশ জনপ্রিয়। এর বাইরে বধ্যভূমি (ত্রিশ গোডাউন), শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত (দপদপিয়া) সেতু, ভোলা রোড (বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়) এলাকায় দর্শনার্থীর ভিড় থাকে চোখে পড়ার মতো। এদিকে নগরীর একটু বাইরে অবস্থিত দুর্গা সাগর যেকোনো বয়সী মানুষের কাছেই বেশ প্রিয়। শহর এলাকার বাইরে পার্শ্ববর্তী জেলা (ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা প্রভৃতি) সমূহ থেকেও অনেকে ঘুরতে আসেন এসব জায়গায়।

কিন্তু সম্প্রতি এসব বিনোদন কেন্দ্র গুলোতে নানা বয়সী (বিশেষ করে কিশোর ও তরুণ) বিপরীত লিঙ্গের জুটিদের অশ্লীল ও অসামাজিক কার্যকলাপ বেড়ে গেছে চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে দূর্গা সাগর, ত্রিশ গোডাউন,শিশু পার্কের ঝোপঝাড় থাকে এসব কার্যকলাপে লিপ্তদের দখলে। সন্ধ্যার পর দপদপিয়া সেতু, ভোলা রোড, মুক্তিযোদ্ধা পার্কের আলোক সল্প অবস্থা অশ্লীলতাকে বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ। অসামাজিক কার্যকলাপের সাথে সাথে এসব স্পটগুলো মাদক কারবারিদের জন্য উৎকৃষ্ট স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। আর নিত্যদিনের এসব ঘটনা চোখ এড়িয়ে যায় নি নগরীর সচেতন মহলের।

জনপ্রিয় এসব বিনোদন কেন্দ্র গুলোতে এমন অশ্লীল ও অসামাজিক কার্যকলাপ এবং রমরমা মাদক ব্যবসা বিব্রত করছে হাজারো সাধারণ দর্শনার্থীদের। পরিবার – পরিজন নিয়ে ঘুরতে এসে লজ্জাকর পরিস্থিতিতে পড়ার অভিজ্ঞতা হচ্ছে অনেকের। দপদপিয়া ব্রিজ এলাকার বাসিন্দা ও স্থানীয় ২৪ নং ্ওয়ার্ড বিট পুলিশিং কার্যক্রমের নাগরিক প্রতিনিধি আলতাফ হোসেন খাঁন এমন কার্যক্রমের সত্যতা পেয়েছেন। তিনি জানান, প্রায় প্রতি মাসে ব্রিজে ঘুরতে এসে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে নদীতে লাফিয়ে পড়ার ঘটনা ঘটে। এছাড়া সন্ধ্যার পর ব্রিজে আলোক স্বল্পতার কারণে সেখানে বৃদ্ধি পায় অশ্লীলতা। নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে কপোত-কপোতীরা এসে জড়ো হয় ব্রিজের দুপাশে। অনেকে উন্মুক্ত স্থানেই শুরু করে মাদক গ্রহণ। তখন আশপাশ দিয়ে পরিবার – পরিজন নিয়ে কারো হেটে যাবার মতো অবস্থা থাকে না।

নগরীর মুক্তিযোদ্ধা পার্কের নিরাপত্তা প্রহরী কুদ্দুস হাওলাদার জানিয়েছেন আরো ভয়াবহ তথ্য। তিনি জানান, বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পরও অনলাইন ক্লাস করার নাম করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় কিশোর কিশোরীরা। এরকম কয়েকটি জুটি সম্প্রতি পার্কে আপত্তিকর অবস্থায় ধরা পড়ে তার কাছে। পরবর্তীতে এসব কিশোর-কিশোরীর বাড়িতে ফোন দিয়ে অভিভাবকের জিম্মায় তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। অন্যদিকে মধ্যবয়সী পুরুষ – মহিলাদের কেউ কেউ বিপরীত লিঙ্গের কাউকে সাথে নিয়ে এখানে এসে আপত্তিকর নানা কার্যকলাপে জড়িত হয়। যা দেখে তারা পরকীয়ায় লিপ্ত বলে অনুমেয় হয় কুদ্দুসের কাছে।

আর সমাজের এমন ভঙ্গুর চিত্র সচেতন মহলের চোখ এড়িয়ে যায় নি বলে নিশ্চিত করেছেন সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ইমানুল হাকিম। তিনি বলেন,‘নাগরিক ব্যস্ততা থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে পরিবার নিয়ে বিনোদন কেন্দ্র গুলোতে একটু ঘুরে আসার কথা এখন ভুলেও মনে করি না। কারণ এসব জায়গায় উপস্থিত হলেই মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে যাওয়া একদল মানুষের অশ্লীল – অসামাজিক কার্যকলাপের দর্শক হতে হয়’।

আর আশেপাশের সর্বত্র এসব চিত্র মূলত পারিবারিক শিক্ষার ঘাটতি, সামাজিক – ধর্মীয় রীতিনীতি সম্পর্কে অজ্ঞতা আর প্রশাসনের ঢিলেমির কারণেই সৃষ্টি বলে জানিয়েছেন এই শিক্ষাবিদ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার্থে তাই অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন সহ সকলের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে বলেও জানান তিনি।আর প্রতিটি মা-বাবাকে তাঁদের উঠতি বয়সের সন্তান কি করছে সে ব্যাপারে বিশেষ খেয়াল রাখার আহবান জানান অধ্যক্ষ ইমানুল হাকিম।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে জানা গেছে। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার প্রলয় সিসিম বলেন,‘ বিনোদন কেন্দ্র গুলোর এমন অবস্থা অনেক আগেই আমাদের নজরে এসেছে। এক শ্রেণীর কিশোর কিশোরীর এমন বিপথগামিতা শুধু পুলিশ হিসেবে নয়, অভিভাবক হিসেবেও আমাদের উদ্বিগ্নতা বাড়িয়েছে। অসামাজিক কার্যকলাপ ও মাদক নির্মূলে এর আগে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এসব স্পটে’। তবে করোনাকালীন পরিস্থিতিতে ধারাবাহিক আইনি পদক্ষেপ অনিয়মিত হয়ে পড়লেও এখন থেকে এসব ব্যাপারে সজাগ থাকবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমনটাই জানালেন নগর পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

Sharing is caring!