প্রতারণার নয়া ফাঁদ ‘গ্লোবাল গেইন’

প্রকাশিত: ৫:৪৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৪, ২০২০

বশির হোসেন খান, ঢাকা:

নাম সর্বস্ব কয়েকটি ব্যবসা দেখিয়ে বড় লিমিটেড প্রতিষ্ঠান জাহির করে অবৈধ এম.এল.এম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং) বাণিজ্যের নামে প্রতারণা শুরু করেছে একটি চক্র। প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছে গ্লোবাল গেইন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। বিনা পরিশ্রমে ঘরে বসেই কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ইতোমধ্যে প্রায় শত কোটির অধিক টাকা সংগ্রহ করে ফেলেছে বলে গ্রাহক সূত্রে জানা গেছে। এরা যেসব ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলে মানুষের কাছ থেকে অর্থ নিচ্ছে, তার কোনোটিই প্রতিষ্ঠিত, ব্যবসা সফল নয় বলে জানা গেছে। তাছাড়া অনেক ব্যবসায় অংশীদার আছে বলে দাবি করলেও আদতে তা ভুয়া তথ্য। আর ব্যাংকের চেক কিংবা স্ট্যাম্প নয়, শুধুমাত্র ফটোকপি করা কোম্পানির প্যাডে পরিবেশক চুক্তিনামার ওপর ভিত্তি করেই লেনদেন হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

নাম গোপন রাখার শর্তে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানটি যারা শুরু করেছে, মাত্র ৬ মাস আগেও তারা ছিলেন একপ্রকার পথের ভিখারি। মানুষের কাছ থেকে সাহায্য কিংবা ধার নিয়ে সংসার চালাতে হয়েছে। কিন্তু এখন তারা আলিশান অফিসে বসছেন, থাকছেন আভিজাত্যে ঘেরা বাড়িতে, কোটি টাকার গাড়িতে চড়ছেন। আর মানুষকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখাচ্ছেন গাড়ি-বাড়ি-প্রতিষ্ঠানের মালিক বানিয়ে দেয়ার।

গ্লোবাল গেইনের মূল উদ্যোক্তা জাহিদুল ইসলাম। তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে আছেন। জাহিদুল ডেসটিনি বিলুপ্ত হওয়ার আগে সেটার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। অসংখ্য মানুষকে ডেসটিনিতে বিনিয়োগ করিয়ে হাতিয়েছেন বিপুল অর্থ। তার সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শর্টকাটে ধনী হওয়াই সার্বক্ষণিক লক্ষ্য তার। যে কারণে ডেসটিনি বন্ধ হওয়ার পর আরো বেশ কয়েকটি ছোট-মাঝারি ধরনের এম.এল.এম ব্যবসা করে মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে সুযোগ মত অফিস গুটিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছেন। কিছু দিন পর পর নতুন প্লানে আলিশান অফিস নিয়ে প্রতারণার কার্যক্রম শুরু করেন। প্রথমে মানুষের বিশ^াস অর্জন করেন মিষ্টি ভাষা, আভিজাত্যের চালচলন এবং সাময়িক সময়ের জন্য লেনদেন ঠিক রেখে। এরপর যখন বিনিয়োগকারী এবং অর্থের পরিমাণ বেড়ে যায়, হঠাৎ সব ফেলে উধাও হয়ে যান জাহিদুল ইসলাম। এবার টাকা হাতানোর তার নতুন ফাঁদ গ্লোবাল গেইন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে তার নামেই ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া।

প্রতিষ্ঠানটির সিইও’র (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) দায়িত্বে আছেন মোঃ সাইফুল ইসলাম। জাহিদুল ইসলাম মূল মালিক হলেও অফিসিয়াল কার্যক্রমে দেখা যায় সাইফুলকেই। গ্লোবাল গেইনের কর্মীরা অফিসে নতুন যাওয়া ব্যক্তিদের প্রথমে পুরো প্লান বুঝিয়ে বলেন। শেষে নেয়া হয় সাইফুল ইসলামের সামনে। তিনি সর্বশেষ ব্রিফিং দিয়ে তাদের প্রতারণা বাস্তবায়ন করতে সর্বোচ্চ মিথ্যা আশ^াসগুলো অনর্গল বলে যান।

জানা গেছে, আইন করে বাংলাদেশে এম.এল.এম ব্যবসা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যেসব শর্ত মেনে এই ব্যবসার কথা আইনে বলা হয়েছে, পুরাতন অনেক প্রতিষ্ঠানই তা মানতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এতো বছর পরেও সেই আগের পদ্ধতিতেই নিষিদ্ধ এই বাণিজ্য করে যাচ্ছে জাহিদুল-সাইফুল। এমনকি তারা প্রকাশ্যে ব্যবহার করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নাম। ওই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা একাধিক ব্যক্তির বক্তব্য এবং সরেজমিনে পরিচয় গোপন রেখে তাদের কার্যক্রম দেখতে গিয়ে জানা গেলো, প্রতিদিন প্রায় কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে সেখানে। তবে তাদের অনুমোদন বলতে আছে শুধু সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স। টাকা জমা নেওয়া এবং লভ্যাংশ দেওয়া, এমন ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার সামান্যতম বৈধতা না থাকলেও রাজধানী ঢাকার মধ্য বাড্ডা এলাকায় প্রকাশ্যেই চলছে এই প্রতারণামূলক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। তাদের ব্যবসায়ীক পরিকল্পনা দেখে যে কেউ আঁচ করতে পারবে, নতুন মোড়কে সেই পুরানো ‘হায় হায় কোম্পানি’ চালু হয়েছে। তবুও ঝুঁকিপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে সরল বিশ্বাসে ২০-৩০ লাখ এমনকি ৫-১০ কোটি টাকাও অনেকে বিনিয়োগ করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, বিগত ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে দেশে অনেকগুলো এম.এল.এম কোম্পানি চালু হয়। এর মধ্যে এক ডেসটিনি-ই গ্রাহকের কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাত করে। যার কর্মকর্তারা এখনো প্রতারণার মামলায় কারাগারে রয়েছে। এছাড়াও ছোট-মাঝারি ধরনের অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান পরিশ্রম ছাড়াই বিনিয়োগ করে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর করে অসংখ্য মানুষের শেষ সম্বলটুকুও নিয়ে নিস্ব করে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে অনেক সংসার ভেঙেছে, বহু মানুষ আত্মহত্যাও করেছে মানসিক চাপ সইতে না পেরে।

এই গ্লোবাল গেইন প্রতিষ্ঠানটির কর্মপরিকল্পনায় সেগুলোর থেকে ভিন্ন বা নতুন কিছুই নেই। তারাও ব্যবসার কথা বলছে। তবে ব্যবসা না করতে পারলে বিনিয়োগ করে ঘরে বসেই লাখ টাকায় পাওয়া যাবে শতকরা ১২ শতাংশ। আর ১০ লাখ বিনিয়োগেই প্রতি মাসে লাভ দেবে এক লাখ টাকার উপরে। যা কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের পক্ষেও সম্ভব নয়।

পরিচয় গোপন রেখে কয়েকজন সংবাদকর্মী প্রতিষ্ঠানটির অফিস মধ্য বাড্ডায় ট্রপিকাল মোল্লা টাওয়ার ভবনের ১৪ তলায় গিয়ে দেখা গেলো পুরো ফ্লোরজুড়ে তাদের কার্যক্রম। যা মনে করিয়ে দেয় বাড়ি-গাড়ির স্বপ্ন দেখিয়ে দেশের লাখ লাখ মানুষের হাজার কোটি টাকা লোপাট করা ডেসটিনির কথা। অফিসের চেহাড়াও সেরকমই। ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে গ্রুপ করে বসিয়ে মগজ ধোলাই করে বোঝানো হচ্ছে ‘লেফট হ্যান্ড সাইড, রাইট হ্যান্ড সাইড’ পদ্ধতি
সংবাদকর্মীদের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বোঝাতে বসেন আবদুল্লাহ নামের এক ব্যক্তি। গ্লোবাল গেইন সম্পর্কে তিনি জানান, এটি ব্যতিক্রম প্রতিষ্ঠান। এদের নিজস্ব কারখানায় বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদন হয়, রয়েছে ট্রাভেস্, পরিবহণ, রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। এছাড়া রয়েছে মার্কেট, গরুর ফার্ম ও মৎস্য চাষ, ডেভেলপার, মোবাইল এক্সেসরিজ ব্যবসা। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে ভ্যানে করে তরকারি বিক্রি করারও তাদের একটি প্রকল্প রয়েছে বলে জানিয়েছেন আবদুল্লাহ।

প্রথমে তিনি জানান, কনজ্যুমার পণ্যের ডিলারশিপ নিয়ে ব্যবসা করার কথা। এরপরে আসেন প্রতারণার আলোচনায়। আবদুল্লাহ বলেন, যদি কারো ব্যবসা করার মত সময় বা ইচ্ছা না থাকে, তাহলে তিনি এসব প্রকল্পে অর্থ লগ্নি করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তার লভ্যাংশের টাকা প্রকল্প ভেদে নিয়মানুযায়ী দৈনিক কিংবা মাসিক হারে পেয়ে যাবেন। আর টাকা বিনিয়োগের প্রমাণ সম্পর্কে বলেছেন, তারা কোনো চেক দেন না, তবে স্ট্যাম্পে চুক্তি করে নেন। তিনি আরো বলেন, আমাদের সঙ্গে র‌্যাব-পুলিশ-সেনাবাহিনীর লোকেরাও জড়িত। জানান, ঢাকার উত্তরা এলাকার র‌্যাব-১ এর প্রায় সব সদস্যরাই তাদের ডিউটির সময় বাদে গ্লোবাল গেইনের অফিসে পড়ে থাকে।

তবে আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, গ্লোবাল গেইন প্রতি এক লাখ টাকা বিনিয়োগে শতকরা ১২ শতাংশ মুনাফা দেয়- এমনটাই জানিয়েছেন তাদের কর্মী আবদুল্লাহ। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, কেউ ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেই মাসে পাবে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। হিসেব করে দেখা যায়, ১০ মাসেরও কম সময়ের মধ্যেই মূলধন উঠে আসবে। তারপরও আবার লভ্যাংশ প্রদান চালিয়ে যাবেন। আবার চাইলে মূলধন ফেরত দেবেন।

অনেকে বলেছেন, এমন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই এভাবে টাকা দেওয়া সম্ভব। কারণ তাদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে শুরুতে লেনদেন ঠিক রেখে লালসা বাড়িয়ে মানুষের কাছ থেকে বিপুল টাকা আদায় করে তা নিয়ে চম্পট দেওয়া।

কেননা, কোনো ব্যাংক বা সরকার অনুমোদিত অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানও এতো টাকা মুনাফা দেয় না। সেখানে তারা কি এমন ব্যবসা করছে যে এতো টাকা মুনাফা দেবে? আর তাতেই অনুমান করা যায়, এই প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ কি?

তবে প্রতারণার সত্যতা ফুটে উঠেছে সিইও সাইফুল ইসলামের শেষের বক্তব্যে। কর্মী আবদুল্লাহ সাংবাদিকদের কাছে প্লান উপস্থাপন শেষে সাইফুলের কাছে নিয়ে গেলে তিনি শুরুতে জানতে চান প্লান বুঝতে কোনো সমস্যা আছে কি-না। এরপর বলেন, আমরা অন্যদের মতো না। সরকার-প্রশাসন আমাদের যেন ধরতে না পারি, সে রকমেরই প্লান সাজিয়েছি। আমাদের সঙ্গে অনেক বর্তমান এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা আছে। পুলিশ-র‌্যাবের লোকজনও আছে। সুতরাং নির্দিধায় বিনিয়োগ করতে পারেন।

বিনিয়োগের প্রমাণ হিসেবে স্ট্যাম্পে চুক্তি স্বাক্ষর হয় বলে জানিয়েছিলেন কর্মী আবদুল্লাহ। কিন্তু সিইও সাইফুল ইসলাম সে কথা পাল্টে জানালেন, কোম্পানির ফটোকপি করা প্যাডে তারা পণ্যের ডিলারশিপের চুক্তি করে নিয়ে নেন টাকা। এভাবেই কোনো চেক বা স্ট্যাম্প ছাড়াই শুধু সাদা কাগজের ওপর কোম্পানির লেখার ওপর ভিত্তি করেই কোটি কোটি টাকা মানুষ বিনিয়োগ করেছে বলে জানালেন সাইফুল।

শেষে তিনি বললেন, স্ট্যাম্পে চুক্তি করতে গেলেই সরকার বা প্রশাসন বিনিয়োগের বিষয়টি জেনে যাবে। তাই ওই সব ঝামেলা এড়াতে আমাদের নিজস্ব প্যাডেই চুক্তি করি। আর ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য টাকা দিলেও তাদের ওই চুক্তিতে লেখা থাকে ‘পরিবেশক চুক্তিনামা’। এর ওপর ভিত্তি করেই সাধারণ মানুষ কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, র‌্যাবের এই প্রতারনা চক্রের সঙ্গে জড়িত নয়। যারা র‌্যাবের নাম ব্যবহার করে প্রতারনা করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থ্য নেওয়া হবে। এই ধরনের অভিযোগ এখনো পাইনি। তবে খোঁজখবর নিয়ে দেখছে।

উল্লেখ্য, গ্লোবাল গেইনের প্রতারণার বিষয়ে গভীর তদন্ত চলছে। শিগগিরই আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য নিয়ে স্ববিস্তর প্রতিবেদন আসছে।

Sharing is caring!