পূর্বের ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে কি বরিশাল উত্তর জেলা যুবদল ?

প্রকাশিত: ৭:৫৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২০

গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি  ::

বরিশাল (উত্তর) জেলা যুবদল আবারো কি তার পূর্বের ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে ? ভুল নেতৃত্ব নির্বাচনের ফলে কি আবারো থমকে যাবে দলটির এ জেলার সাংগঠনিক অগ্রযাত্রা? আগামীর নেতা নির্বাচনে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের রাজনীতির কাছে কি আবারো পরাজিত হবে দলটির যোগ্য নেতৃত্ব ? তা নিয়ে বরিশাল (উত্তর) রাজনৈতিক জেলার আওতাধীন পাঁচটি উপজেলায় দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা, পাশাপাশি ক্ষোভে ফুঁসছেন তারা। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দলটির বরিশাল বিভাগীয় কমিটির মতবিনিময় সভা।

এ সভা থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে অতি শীঘ্রই গঠন করা হতে পারে উত্তর জেলা যুবদলের নতুন আহবায়ক কমিটি। এমন আভাস দিচ্ছে দলের একটি নির্ভর যোগ্য সূত্র। এবারের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে পূর্বের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে আবারো মুখ থুবড়ে পড়বে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম, এ আশংকা দলের তৃণমূলের।

খোজ নিয়ে জানাগেছে, ২০১৭ সালের ২০এপ্রিল রাজধানী ঢাকার গাবতলীর একটি আবাসিক হোটেলের ম্যানেজার ও গৌরনদী পৌর ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক মোঃ মাহফুজ মোল্লাকে সভাপতি, হিজলা উপজেলা যুবদলের আহবায়ক দেওয়ান মনির হোসেইনকে সহ-সভাপতি, মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক সালাহউদ্দিন পিপলুকে সাধারণ সম্পাদক, হিজলা উপজেলা থেকে বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার ফুয়াদ দেওয়ানকে সহ সাধারণ সম্পাদক ও মুলাদী উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক মোঃ শাহ আলম হাওলাদারকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে বরিশাল (উত্তর) জেলা যুবদলের ৫ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়।

এর পর আর গত তিনি বছরে ওই কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হয়নি। ফলে যুবদলের গঠনতন্ত্রে উল্লেখিত জেলা কমিটিতে থাকা ১৫১টি পদের মধ্যে বাদ-বাকি ১৪৬টি পদ শুন্য রয়েছে গত তিন বছর ধরে। বরিশাল (উত্তর) জেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক মোঃ আকন কুদ্দুসুর রহমান নিজের প্রভাব খাটিয়ে তার ব্যক্তিগত স্টাফ মোঃ মাহফুজ মোল্লাকে উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি পদে বসালে দলের ভেতরে এক ধরনের অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। মাহাফুজকে সভাপতি বানাতে গিয়ে আকন কুদ্দুস দলটির গঠনতন্ত্রে উল্লেখিত কোন নির্দেশনাতো নয়ই, এমনকি কোন প্রকার সাধারণ নিয়ম নীতিও অনুসরণ করেননি বলে অভিযোগ করেছেন দলটির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা।

তাদের অভিযোগ, মাহফুজ মোল্লাকে সভাপতি করে কমিটি গঠনকালে আকন কুদ্দুসুর রহমান স্থানীয় সাধারণ যুবদল নেতাকর্মীদের মতামত বা জেলা যুবদলের ওই সময়ের বিদায়ী কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের কোন মতামত বা পরামর্শ নেননি।

এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন তৎকালীন উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি মোঃ কবির উদ্দিন আফসারী ও সাধারন সম্পাদক মোঃ বদিউজ্জামান মিন্টু। তারা বলেন, আমাদের মতামত ও পরামর্শ নিয়ে কমিটি গঠন করা হলে আজকের এ অচলাবস্থা দেখতে হতনা।

গৌরনদী উপজেলা যুবদলের সাবেক সাধারন সম্পাদক মোঃ সাইয়েদুল আলম সেন্টু খান অভিযোগ করে বলেন, যুবদলের ভেতরে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে দলের ভেতরের নিবেদিত প্রান দক্ষ ও যোগ্য নেতাদের বাদ দিয়ে আকন কুদ্দুসুর রহমান নিজের ব্যাক্তিগত স্টাফ ও বয়সের দিক থেকে অপেক্ষাকৃত তরুন এবং অদক্ষ যুবক মাহফুজ মোল্লাকে উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতির পদে বসান। ওই কমিটি গঠনের সময় দলের ভেতরে জ্যেষ্ঠতা লংঘন করা হয়েছে চরম ভাবে। বয়স ও একাডেমিক অবস্থান বিবেচনায় বর্তমান সভাপতি মোঃ মাহফুজ মোল্লা তার কমিটির সহ সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকের বয়সের চেয়ে অধিকতর নবীন। এ কারণে গত তিন বছরে উল্লেখিত পাঁচ নেতার মাঝে সমন্বয়নীনতার ফলে দলীয় কার্যক্রম একেবারে মুখ থুবরে পড়েছে। যুবদলের রাজনীতির পাশাপাশি মাহফুজ মোল্লা আকন কুদ্দুসুর রহমানের ব্যক্তিগত স্টাফ হিসেবে তার বিভিন্ন কনস্ট্রাকশন সাইটও দেখাশোনা করছেন। ফলে অধিকাংশ সময় তিনি জেলার রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অনুপস্থিত থাকেন। বিগত দুই বছরের দলীয় কর্মকান্ড ও দলের রাজনৈতিক কর্মসূচীতে মাহফুজ মোল্লার কমিটির চরম ব্যার্থতা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোন সফলতা নেই। অপরদিকে নেতৃত্বের যোগ্যতা ও দক্ষতার গুনে বরিশাল মহানগর ও বরিশাল (দক্ষিণ) জেলা যুবদলের দুটি কমিটি সফলভাবে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। কভিট ১৯ প্রতিরোধেও তাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুবদলের এক নেতা বলেন, বর্তমান কমিটির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি দেওয়ান মনির হোসেন একাধারে হিজলা উপজেলা বিএনপির ১নং যুগ্ম আহবায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি পেশায় একজন আইনজীবি। পেশাগত কারণে অধিকাংশ সময়ই দলীয় কর্মসূচীতে অনুপস্থিত থাকেন।

দুই বছর মেয়াদী বর্তমান কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে আরো এক বছর আগে। বিগত তিন বছরে তারা কোন উপজেলা প্রতিনিধি সভা করতে সক্ষম হয়নি।

গৌরনদী পৌর যুবদলের সাবেক সভাপতি মোঃ জাকির হোসেন শরীফ বলেন, সভাপতি মাহফুজ মোল্লা তার নিজ এলাকা গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলাতেও একটি প্রতিনিধি সভা করতে পারেননি। জেলা যুবদলের সভাপতি’র মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল পদে থেকেও বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে মাহফুজ মোল্লা তার নিজ এলাকা গৌরনদী-আগৈলঝাড়া উপজেলায় বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে প্রচার-প্রচারণা বা কোন রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশ নেননি। দলের ভেতরে অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ে জড়িয়ে তিনি বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

যুবদলের অপর এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিগত তিন বছরে দলীয় কর্মকান্ড পরিচালনায় সভাপতি মাহফুজ মোল্লা, সহ-সভাপতি দেওয়ান মনির হোসেইন, সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন পিপলু, সহ সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার ফুয়াদ দেওয়ান, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ শাহ আলম হাওলাদার এর মধ্যে কোন প্রকার সমন্বয় পরিলক্ষিত হয়নি। তাদের মাঝে মতের অ-মিলসহ চরম সমন্বয়হীনতার প্রকাশ ঘটেছে অহরহ। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক দলের ভেতরে তাদের নিজেদের ক্ষুদ্র রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে গিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ সম্প্রসারণ ও দলীয় সৃঙ্খলা তৈরীতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এতে তাদের নেতৃত্বের অ-দক্ষতার পরিচয় পুরোপুরি ফুটে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে বরিশাল (উত্তর) জেলার আওতাধীন গৌরনদী. আগৈলঝাড়া, মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ এ পাঁচ উপজেলায় যুবদলের বিভিন্ন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও তারা গ্রæপিংকে প্রাধান্য দিয়েছেন। গৌরনদী পৌর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোঃ কামরুজ্জামান খোকন অভিযোগ করে বলেন, উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি মোঃ মাহফুজ মোল্লা বয়সে একেবারেই তরুণ। সাবেক সভাপতির তুলনায় তার বয়সের পার্থক্য ১৭-১৭ বছরের।

দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৭ সালে গঠিত যুবদলের ওই জেলা কমিটিতে পাঁচ উপজেলা থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ, দক্ষ ও যোগ্য যুবদল নেতা এবং ছাত্রদলের বয়োজ্যেষ্ঠ সাবেক যোগ্য ও দক্ষ নেতাদের মধ্য থেকে কাউকে সভাপতি করা হলে দলীয় কর্মকান্ডে এমন স্থবিরতা দেখা দিতনা। কমিটি গঠনে দলের ভেতরের নিবেদিতপ্রান দক্ষ ও যোগ্য নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। পাশাপাশি চরম ভাবে লংঘন করা হয়েছে জ্যেষ্ঠতার। ফলে দলের বয়োজ্যোষ্ঠ দক্ষ ও যোগ্য নেতা-কর্মীরা দলের সাংগঠনিক কাজকর্মসহ রাজনৈতিক কর্মসূচীতে অংশগ্রহন করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। এ কারনে সংগঠনের কর্মকান্ডে যেমন স্থবিরতা নেমে এসেছে তেমনি যোগ্য ও দক্ষ নেতাকর্মীসহ তৃণমূলের সাধারণ কর্মীদের মধ্যেও নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

নেতাকর্মীদের অভিযোগ সম্পর্কে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে বরিশাল (উত্তর) জেলা যুবদলের সভাপতি মোঃ মাহফুজ মোল্লা তার নিজের ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পরে কল ব্যাক করার কথা বলে লাইনটি কেটে দেন।

অপর দিকে দলের তৃণমূলের সাধারণ কর্মী সমর্থকরা দাবি করছেন বর্তমান কমিটির সীমাহীন ব্যর্থতা দেখে ক্ষোভে ফুঁসছেন দলটির তৃণমূলের অসংখ্য নেতা-কর্মী। তারা বলছেন, দলের নেতৃত্ব নির্বাচনে পূর্বের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে দল থেকে গণপদত্যাগ করাসহ স্বার্থান্বেষী নেতাদেরকে রাজনীতির মাঠে প্রতিরোধ করা হবে।

Sharing is caring!