পিছিয়ে গেলো বরিশালের লকডাউন !

প্রকাশিত: ৪:০১ অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০২০

শফিক মুন্সি ॥ করোনা সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণ করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ‘রেড জোন’ ঘোষণাকৃত বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) বিভিন্ন এলাকা লকডাউন (অবরুদ্ধ) করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। এমন সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে লকডাউন কার্যকর করার বিভিন্ন পরামর্শও দিয়েছিল এখানকার সচেতন মহল। প্রাথমিকভাবে নগরীর ১২ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ড দুটি গতকাল মঙ্গলবার থেকে লকডাউন করার ঘোষণাও দেন বিসিসি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। কিন্তু লকডাউন শুরু হবার মাত্র কয়েকঘণ্টা আগে অজ্ঞাত কারণে স্থগিত করা হয় এই কার্যক্রম। যে কারণে পেছাতে হচ্ছে বরিশালের লকডাউন কার্যক্রম। কিন্তু এই বিলম্বে উদ্বিগ্নতা জানিয়েছেন স্থানীয় জনগণ। নগরবাসীর চাওয়া প্রয়োজনীয় সহায়তার সংস্থান করে কার্যকর লকডাউন করা হোক।

বিসিসি’র একটি সমর্থিত সূত্র জানাচ্ছে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার কারণে লকডাউনের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে হয়েছে তাদের। সাধারণত লকডাউনকৃত এলাকার সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়সমূহ বন্ধে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু ঐ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ না করে স্থানীয় দুটি এলাকায় লকডাউন ঘোষণা করায় শেষ পর্যন্ত স্থগিত করতে হয়েছে বিসিসি’র প থেকে মাইকিং করে জানিয়ে দেয়া লকডাউনের ঘোষণা। তবে এটাই উপযুক্ত কারণ কিনা সে বিষয়ে মুখ খোলেনি দায়িত্বশীল কোন মহল। যে কারণে বরিশাল মহানগরীর উদ্বেগজনক করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা অনেকটা খোলাখুলিভাবে সামনে এসেছে সবার। আর লকডাউনের ঘোষণা দিয়েও কার্যকর করতে না পারায় অসন্তুষ্ট নাগরবাসী কার্যকর লকডাউনের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি।

বরিশাল জেলার করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গঠিত সরকারি কমিটির প্রধান এখানকার জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান। জেলার যেকোনো এলাকা লকডাউন করতে তাঁর সম্পৃক্ততা ও নির্দেশনার প্রয়োজন। সিটি করপোরেশনের দুটি ওয়ার্ড কেন লকডাউন করা গেলো না এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল তাকে। তিনি জানান, যেকোনো কারণেই হোক আপাতত লকডাউন করা যায় নি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে লকডাউনের বিষয়ে কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। তাদের অনুমোদন পেলে লকডাউন করা যেতে পারে।

লকডাউনের ঘোষণা হওয়া ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোঃ আতাউর রহমান জানান, হঠাৎ করে গত রোববার রাত থেকে সিটি মেয়রের পে মাইকিং করে জানিয়ে দেয়া হয় মঙ্গলবার থেকে পরবর্তী ২১ দিন লকডাউন থাকবে তাদের এলাকা। এসময় ওষুধের দোকান ছাড়া সবকিছু বন্ধ থাকবে এবং কেউ বাইরে বের হতে পারবে না। কিন্তু এই লকডাউনে তাদেরকে কোন ধরনের খাদ্য বা জরুরী সহায়তা দেয়া হবে কিনা এমন কোন ঘোষণা আসে নি। এদিকে মাসের শেষে এমন ঘোষণা আসায় প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী মজুদ করে রাখতে আত্মীয়ের কাছ থেকে টাকা ধার করে গত সোমবার রাতে নিকটবর্তী রূপাতলী বাজারে ছুটতে হয় তাকে। কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় অনেক জিনিস কিনতে পারেন নি তিনি। কারণ হঠাৎ লকডাউনের ঘোষণা আসায় এলাকার বিত্তশালীরা সমস্ত কিছু আগেই কিনে নিয়েছেন। প্রয়োজনীয় সহায়তা না দিয়ে শুধুমাত্র লকডাউনের ঘোষণা দিয়েই নিজেদের দায়িত্ব সমাপ্ত করায় স্থানীয় প্রশাসনকে অবিবেচক আখ্যা দেন তিনি।

স্থানীয় ১২ নম্বর ওয়ার্ডেও ২৩ জুন থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত লকডাউনের ঘোষণা দিয়ে মাইকিং করে সিটি করপোরেশন। এখানকার বাসিন্দা ফজলুল হক আন্তর্জাতিক একটি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত আছেন। দায়িত্ব পালন করতে তাকে এই পরিস্থিতিতেও প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলায় যেতে হয়। তিনি জানান, একটি এলাকা লকডাউন করতে হলে সেই এলাকার চাকরিজীবীদের জন্য ছুটির ব্যবস্থা করতে হয়। এই কাজটা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় করে থাকে। আমাদের এলাকা লকডাউন ঘোষণা করলেও ছুটির কোন বন্দোবস্ত করে দিতে পারে নি কেউ। লকডাউনের কথা আমার ঊর্ধ্বতনদের জানালে তারা আমাকে ছুটি দিতে অস্বীকৃতি জানান। যে কারণে সত্যি সত্যি লকডাউন হয়ে গেলে আমাকে কঠিন সমস্যায় পড়তে হতো।

বরিশালের করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লকডাউন জরুরী হলেও সমন্বয়হীনভাবে লকডাউন করতে গেলে মানুষজনকে বিপাকে ফেলা হবে বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন মহল। সরকারি প্রতিটি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে এবং লকডাউন ঘোষণাকৃত এলাকার মানুষদের প্রয়োজনীয় সহায়তার সংস্থান করে তবেই লকডাউন কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তারা। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) বরিশাল জেলা সদস্য সচিব ও চিকিৎসক মনীষা চক্রবর্তী। তিনি বলেন, বিগত দিনে বরিশালের প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা এখানকার করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যে ধরনের অপরিপক্ক ও বিবেচনাহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই লকডাউনের সিদ্ধান্তও তেমনই একটি সিদ্ধান্ত ছিল। তিনি জানান, লকডাউনে আটকা পড়ে যাদের উপার্জন বন্ধ তারা কি খাবেন সে ব্যাপারে চিন্তা করা দরকার। এছাড়া সেখানকার মানুষেরা জরুরী প্রয়োজনে কিভাবে বাড়ির বাইরে যাবেন সে ব্যাপারেও পরিকল্পনা প্রয়োজন।

তিনি উল্লেখ করেন, যদি কার্যকর লকডাউন করে মানুষকে বাঁচাতে চান তবে যারা লকডাউন করবেন তাদের উচিত খাদ্য সামগ্রী সহায়তা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং লকডাউনকৃত এলাকার সকলের করোনা পরীা করে যারা যারা আক্রান্ত তাদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। অন্যথায় শুধুমাত্র কিছু এলাকায় মানুষের ঢোকা বা বের হওয়া নিয়ন্ত্রণ করে বরিশালের করোনা সংক্রমণ রোধ করা যাবে না।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বরিশাল জেলা কমিটির সভাপতি প্রফেসর শাহ শাজেদা বেগম বলেন, লকডাউন নিয়ে সংশ্লিষ্টরা যা শুরু করেছেন তাতে ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে’ এমন চিত্রের অবতারণা হয়েছে। লকডাউন কার্যকর করতে বিভিন্ন পর্যায়ে যাদের অংশগ্রহণ দরকার (জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী ইত্যাদি) তাদের নিজেদের মধ্যেই সমন্বয়হীনতার কারণে প্রতিদিন আশংকাজনক হারে এখানে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, যদি দ্রুত বরিশালে লকডাউন কার্যকর না করা যায় তবে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে বলে মনে করছি।

Sharing is caring!