নৌ দুর্ঘটনা তদন্তে নেই অগ্রগতি !

প্রকাশিত: ৬:৩৯ অপরাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বরিশাল-ঢাকা সহ দক্ষিণাঞ্চলে নৌ-পথে গত ৫ বছরে নৌ দুর্ঘটনার পরপরই কখনো ৩ সদস্য, ৫ সদস্য ও ৭ সদস্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে দায়িত্ব দেয়ার পরে সেসকল তদন্তের প্রতিবেদন ও দোষী ব্যক্তি সহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত বিচার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে সেধরনের কোন নজির এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।

অন্যদিকে নৌ-পথে দুর্ঘটনা ঘটলে নৌ-যান সহ মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা রাখা হলেও সড়ক পরিবহনের দুর্ঘটনায় মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না রাখায় লঞ্চ মালিক সমিতির রয়েছে চরম ক্ষোভ এবং এধরনের সরকারের কালো আইন বাতিলের দাবী জনান।

অন্যদিকে সমুদ্র পরিবহন কর্তৃপক্ষ বড় ও ছোট নৌ-যানের সারেং, মাস্টার ও সুকানীদের কি ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে তারা সনদ প্রদান করে তা নিয়েও মালিক পক্ষের রয়েছে নানা অভিযোগ।

সূত্রমতে আমাদের দেশে লঞ্চডুবির ঘটনা নিয়মিত এবং অন্যতম ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলোর একটি। প্রায় প্রতিবছরই নৌপথে ছোট-বড় লঞ্চ বা ট্রলার দুর্ঘটনা অহরহ ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। সেই সাথে প্রতিবছরই লঞ্চডুবির ঘটনায় শত শত মানুষের মৃত্যু ঘটছে।

দেখা যায় ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রীবহন, চালকদের অদক্ষতা-অনভিজ্ঞতা, লঞ্চের নকশায় সমস্যা, লঞ্চের ফিটনেস তদারকির অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি কারণে লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। সর্বশেষ গতকাল সোমবার ২৯ জুন ২০২০ সকালেই ভয়াবহ লঞ্চডুবির ঘটনায় শিশু, মহিলা, পুরুষ সহ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জনের মত যাত্রীর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

গত ৫ বছরে পিছনের দিকে তাকালে দেখা যায় বিভিন্ন সময়ে বরিশাল-ঢাকা নৌপথ সহ দক্ষিণাঞ্চল ও বিভিন্ন নৌপথে ঘটেছে প্রাণহানি নৌ দুর্ঘটনা। সর্বশেষ ৫ বছরে দেশের ভয়াবহ লঞ্চ দুর্ঘটনার তথ্যমতে বরিশাল-ঢাকা নৌপথে ২০১৬ সালের ৫ জুলাই বরিশালের কীর্তনখোলা নদীতে ঢাকাগামী সুরভী-৭ লঞ্চের সঙ্গে ভোররাতে বরিশালগামী সরকারি নৌযান পিএস মাহসুদের সংঘর্ষের ঘটনায় ছয়জন নিহত হন। আহত হন ১৫ জন। হতাহত সবাই পিএস মাহসুদের যাত্রী।
২০১৭ সালের ২২ এপ্রিল বরিশাল সদর উপজেলার কীর্তনখোলা নদীর বেলতলা খেয়াঘাট এলাকায় বালুবাহী একটি কার্গোর ধাক্কায় এমভি গ্রীন লাইন-২ লঞ্চের তলা ফেটে যায়। লঞ্চটি তাৎক্ষণিকভাবে তীরের ধারে নেওয়ার কারণে দুই শতাধিক যাত্রী সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যায়।

২০১৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মা নদীর ওয়াপদা চেয়ারম্যান ঘাটের টার্মিনালে তীব্র স্রোতের মুখে ডুবে যায় তিনটি লঞ্চ। এতে একই পরিবারের তিন জনসহ লঞ্চ স্টাফ ও যাত্রীসহ ২২ জন লোক ছিল।

এমভি রিয়াদ ২০১৯ সালের ২২ জুন মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌরুটে এমভি রিয়াদ নামের একটি লঞ্চের তলা ফেটে অর্ধেক পানিতে ডুবে যায়। লঞ্চের তলা ফেটে পানি উঠতে শুরু করলে অন্য ট্রলার গিয়ে লঞ্চযাত্রীদের উদ্ধার করে নিরাপদে নিয়ে যায়।

২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি বরিশাল-ঢাকা নৌ-পথের মেঘনা নদীর চাঁদপুর সংলগ্ন মাঝ কাজীর চর এলাকার মাঝ নদীতে দুই লঞ্চের সংঘর্ষে দুই যাত্রী নিহত এবং আটজন আহত হন। হতাহতদের মধ্যে নিহত দুজনসহ আহত তিনজন এমভি কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চের এবং বাকি আহত পাঁচজন এমভি ফারহান-৯ লঞ্চের যাত্রী ছিলেন।

২০২০ সালের ২৯ জুন অর্থাৎ গতকাল সকালে রাজধানীর শ্যামবাজার এলাকা সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রকাশ্য দিবালোকে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটে। বড় একটি লঞ্চের ধাক্কায় ছোট যাত্রীবাহী লঞ্চ এ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জনের মত যাত্রীর সলিল সমাধি ঘটে। ঘটনার পরপরই নিহত যাত্রীদের লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে এঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই নৌ দুর্ঘটনার তদন্তের প্রতিবেদন কি পূর্বের মত অন্ধকারের বদ্ধঘরে বন্দি হয়ে থাকবে নাকি আলোর মুখ দেখবে তা এখন দেখার বিষয় হয়ে উঠেছে।

এব্যাপারে লঞ্চ মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ও সুন্দরবন নেভিগেশনের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, নৌপথে প্রায় সময়ে যে দুর্ঘটনা ঘটে তা মাস্টার-সুকানীর অদক্ষতা, গাফিলতির কারণেই বেশীর ভাগ সময়ে ঘটে থাকে।

এখানে এরা যদি একটু সচেতনতা অবলম্বন করে লঞ্চ পরিচালনা করে তাহলে এধরনের দুর্ঘটনা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

তিনি আরো বলেন, আমরা যদি সরকারী প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মাস্টার, সুকানী স্টাফ না রাখি তাহলে সরকার আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এখানে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এরাই আবার সরকারী সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সনদ নিয়ে আসে তাহলে এদেরকে তারা কি প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
সাইদুর রহমান রিন্টু আরো বলেন, আমরা একেকটি লঞ্চের পিছনে যে পরিমাণ টাকা খরচ করে যাত্রীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি সেখানেতো আমরা এই টাকা অন্যখ্যাতে লাগিয়ে ব্যবসা করতে পারি কিন্তু তারপরেও আমরা সাধারণ যাত্রীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি।

অন্যদিকে সড়ক পথেও মালিক পক্ষ যাত্রীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে সেখানেও দুর্ঘটনা ঘটে কিন্তু এখানে দুর্ঘটনা ঘটলে মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থ গ্রহণ করার কোন আইন সরকার রাখে নাই।

অথচ নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটলে সেখানে সবার আগে সরকার থেকে শুরু সব মহলে লঞ্চ মালিকদের নিয়ে টানা হেঁচড়া করে তাই আমরা প্রতিবারই এধরনের কালো আইন বাতিল করার জন্য আবেদন করে আসছি।

এছাড়া যাদেরকে দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়িত্ব দেয়া হয় তারাই বেশীর ভাগ সময় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করে না বলে তিনি দাবী করেন।

Sharing is caring!