নিরাপরাধ ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ কারাগারে : বাউফলে দুই শিশুকে দিয়ে মিথ্যা বলাৎকারের অভিযোগ

প্রকাশিত: ৩:৫৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২০

বার্তা ডেস্ক ॥ জেলের ভয় দেখিয়ে দশ ও এগারো বছরের দুই শিশুকে দিয়ে নিরাপরাধ ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধের বিরুদ্ধে বলাৎকারের অভিযোগ আনা হয়েছে। আর এই মিথ্যা অভিযোগের কারণে ওই বৃদ্ধ বর্তমানে কারাভোগ করছেন। বাউফল থানার ওসি ও বগা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ওই দুই শিশুকে দিয়ে এই মিথ্যা অভিযোগ করিয়েছেন। বুধবার রাতে রাকিব ও জুয়েল নামের ওই দুই শিশু তাদের অভিভাবকদেরসহ স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে উপস্থিত হয়ে এ বিষয়টি তুলে ধরে।

শিশু রাকিব ও জুয়েল জানায়, গত শনিবার (১২ জুলাই) সন্ধ্যার পর বগা তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মহিবুল্লাহ তাদেরকে ওই তদন্ত কেন্দ্রে ডেকে নেন। মহিবুল্লাহ তাদেরকে কালাম মৃধা নামের এক বৃদ্ধের বিরুদ্ধে বলাৎকারের অভিযোগ করতে বলেন। এ সময় তারা অপারগতা প্রকাশ করলে তিনি বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখান।

একপর্যায়ে জেলের ভয় দেখালে তারা ওই বৃদ্ধের বিরুদ্ধে বলাৎকারের মিথ্যা অভিযোগ করতে রাজি হয়। এরপর তাদেরকে তদন্ত কেন্দ্রে বসিয়ে রেখে ইনচার্জ মহিবুল্লাহ কয়েকজন পুলিশ সঙ্গে নিয়ে বগা বন্দরের জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর সামনের দোকান থেকে বৃদ্ধ কালাম মৃধাকে ধরে আনেন। এর কিছুক্ষণ পর শিশু রাকিবের বাবাকে বাড়ি থেকে তদন্ত কেন্দ্রে ডেকে এনে একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেন ইনচার্জ মহিবুল্লাহ। এর একদিন পর আবার তাদেরকে বাউফল থানায় ডেকে নেয়া হয়। সেখানে ওসির রুমে নিয়ে পুনরায় তাদেরকে কি বলতে হবে শিখিয়ে দেয়া হয়।

তাদের শেখানো কথা না বললে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত তাদেরকে জেলহাজতে থাকতে হবে বলে বগা তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মহিবুল্লাহ ও ওসি মোস্তাফিজুর রহমান ভয় দেখান। তাদেরকে মারধর করার কথাও বলা হয়েছে। এরপর তাদের মুখ থেকে শেখানো কথা মুঠো ফোনে ধারণ করা হয়েছে।

শিশু রাকিবের বাবা আদম আলী ব্যাপরী বলেন, গত সোমবার (১৪ জুলাই) রাতে বগা তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মহিবুল্লাহ আমাকে ০১৭৬৯৬৯৪১৯৯ নম্বর থেকে কল করে বাউফল থানায় যেতে বলেন। সাথে ছেলে রাকিবকেও নিয়ে যেতে বলেন। সেই অনুযায়ী ওই দিন রাত ৯টার দিকে আমি ও আমার স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ও ছেলে রাকিব বাউফল থানায় যাই। মহিবুল্লাহ স্যার আমাদের ডেকে ওসি স্যারের রুমে নিয়ে যান।

এ সময় আমি জানতে পারি বলাৎকারের মামলায় আমাকে বাদী করা হয়েছে। আমি ওসিকে বলি, স্যার এ ঘটনাতো সত্য নয়। আমার ছেলেও আমার কাছে বলেছে এ ঘটনা সত্য নয়, কেন আমাকে বাদী করেছেন? এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমার উপর ক্ষেপে যান। আমার স্ত্রীও একই কথা বললে ওসি তাকে লাথি মেরে থানা থেকে বের করে দেয়ার কথা বলেন। রাত ১টার দিকে আমি ও আমার স্ত্রী থানা থেকে চলে আসি।

পরের দিন মঙ্গলবার সকালে শুনি পুলিশ আমার ছেলেসহ জুয়েল নামের আরেক শিশুকে নিয়ে পটুয়াখালী কোর্টে গেছে এবং বুধবার দুপুরে থানা থেকে আমার ছেলেকে আমার কাছে ফেরত দিয়েছে।”

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, শিশু রাকিব বগা বন্দরে একটি খাবার দোকানে কাজ করে। আর শিশু জুয়েল একই বন্দরের রিয়াজ হাওলাদারে মুদির দোকানে কাজ করে। এই সুবাদে বগা তদন্ত কেন্দ্রে ইনচার্জ মহিবুল্লাহ তাদেরকে চিনতেন। মহিবুল্লাহ ওই বন্দরের জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর দোতলায় একটি রুমে থাকেন। ওই ডাকবাংলোর সামনে ছোট একটি ভাসমান দোকান দিয়ে তসবীহ, জায়নামাজ, টুপি ও আতর বিক্রি করতেন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ কালাম মৃধা। ইনচার্জ মহিবুল্লাহ ডাকবাংলোর সামনে থেকে দোকানটি সরিয়ে নিতে তাকে চাপ প্রয়োগ করেন। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার তাকে শাসিয়েছেন। এরপরেও তিনি ডাকবাংলোর সামনে থেকে দোকান সরাননি। আর এই কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ফাঁসানোর জন্য ওই অবুঝ দুই শিশুকে ভয় দেখিয়ে বৃদ্ধ কালাম মৃধার বিরুদ্ধে বলাৎকারের নাটক সাজিয়ে তাকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। বৃদ্ধ কালাম মৃধা বর্তমানে পটুয়াখালী কারাগারে রয়েছেন।

তার ছেলে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনিছুর রহমান বলেন, ভাসমান ছোট্ট এই দোকানের আয় দিয়ে বাবা আমাদের ৩ ভাই বোনকে লেখাপড়া করিয়েছেন, সংসার চালিয়েছেন। এখান থেকে দোকান সরিয়ে নেয়ার জন্য বগা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ একাধিকবার আমার বাবাকে চাপ প্রয়োগ করেছেন। তার কথা না শোনায় বাবাকে বৃদ্ধ বয়সে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে বাউফল থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সত্য নয়। নির্যাতিত দুই শিশু ১৬৪ ধারায় কোর্টে জবানবন্দি দিয়েছে। এখন বাইরে এসে কি বললো এর কোন দাম নেই। আসামীর পক্ষ থেকে সুবিধা নিয়ে কোনমহল এই প্রচার প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে। আমার কাছে ওই শিশুদের স্বীকারোক্তির ভিডিও ক্লিপ আছে।