নানা অভিযোগ-সমালোচনার মধ্যেই কাল ঘোষণা হতে পারে জেলা ছাত্রদলের ৪০টি ইউনিট কমিটি

প্রকাশিত: ১:১৭ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৭, ২০২০

খান রুবেল ::

নানা অভিযোগ এবং সমালোচনার মধ্যেই এগিয়ে চলছে দীর্ঘ প্রত্যাশিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বরিশাল জেলার ৪০টি ইউনিটের কমিটি গঠন কার্যক্রম। এরই মধ্যে পদপ্রত্যাশীদের রাজনৈতিক আমলনামা যাচাই বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি আগামী ১৮ আগস্ট রাতের মধ্যে জেলার উপজেলা, পৌরসভা এবং কলেজ শাখা ছাত্রদলের কমিটি চ‚ড়ান্ত হতে পারে। এজন্য বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সুপার ফাইভ নেতারা ঢাকায় অবস্থান নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে কমিটি চূড়ান্ত হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে পদপ্রত্যাশীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড একে একে ছড়িয়ে পড়ছে। লবিংয়ের পাশাপাশি নিজেদের যোগ্যতার শীর্ষ তালিকায় রাখতে একে অপরের বিভিন্ন অপকর্ম প্রকাশ করছেন। কারোর বিয়ের খবর, কারোর বয়স সীমা আবার কারো কারো অসামাজিক কর্মকাণ্ডের গোপন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।

ফলে শেষ মুহূর্তে নেতৃত্ব বাছাই নিয়ে বিব্রত হয়ে পড়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি এবং জেলার শীর্ষ নেতারা। যদিও কমিটিতে অছাত্র, বয়সের গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়া এবং বিতর্কিতদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করতে স্বজন প্রীতির অভিযোগ উঠেছে খোদ সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে। এ কারণেই বয়সের সীমাবদ্ধতা পাশ কাটিয়ে নিজস্ব নীতিতে কমিটি করার সু-কৌশল ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগ থাকলেও নিয়মের বাইরে গিয়ে ছাত্রদলের কমিটিতে বিতর্কিত, বিবাহিত, অছাত্র কিংবা বয়সের গণ্ডিপেরনো নেতারা কমিটিতে সুযোগ পাবেন না বলে দাবি করেছেন জেলা ছাত্রদলের নেতারা।

তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ প্রতিক্ষার পরে ১৭ বছর পরে বরিশাল জেলা ছাত্রদলের অধীনস্ত ৪০টি ইউনিটের কমিটি গঠনের কার্যক্রম শুরু হয়। যার মধ্যে ১০টি উপজেলা, ৬টি পৌরসভা এবং ২৪টি কলেজ কমিটি রয়েছে। তবে কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই নানা অনিয়ম এবং অভিযোগ উঠে জেলা ছাত্রদলের সুপার ফাইভ কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে।

যা নিয়ে ইতিপূর্বে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়। যার ফলে কমিটি গঠনের শেষ মুহূর্তে সুপার ফাইভ কমিটির সকল পর্যায়ের নেতারা মিলেই ইউনিট কমিটি গঠন কার্যক্রমে এক হয়েছেন। তারা ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার কমিটি চ‚ড়ান্ত করার লক্ষ্যে সমন্বয় কমিটির সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। ওই আলোচনার মধ্যে দিয়ে উপজেলা, পৌরসভা এবং কলেজ কমিটিগুলো চূড়ান্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।

এ প্রসঙ্গে বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল রারী জানান, ‘কমিটির বিষয় নিয়ে আমরা সুপারফাইভ নেতারা সবাই বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছি। ১৮ আগস্ট বিষয়টি নিয়ে সমন্বয় সভা হবে। সেখানে কমিটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। তবে ওই দিনই কমিটি চূড়ান্ত হবে কিনা সে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

এদিকে, কমিটি ঘোষণার চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে আসলেও এ নিয়ে অনিয়ম এবং অভিযোগ দূর হচ্ছে না। বরং অনিয়ম এবং অভিযোগের পাশাপাশি স্বজনপ্রীতির পাহাড় আরও দীর্ঘ হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে যোগ্য এবং ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে অযোগ্য, বিবাহিত এবং বিতর্কিতদের নিয়েই বিভিন্ন ইউনিট কমিটি গঠনের পাঁয়তারা চালাচ্ছেন জেলা ছাত্রদলের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক। তারা নিজেদের অযোগ্য প্রার্থীদের যোগ্য করতে কেন্দ্রের নির্দেশনা উপেক্ষা করে নিজস্ব নীতিতে কমিটি গঠনের চেষ্টা করছেন।

ছাত্রদলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ‘ইউনিট কমিটি গঠনের ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ রোড ম্যাপ এঁকে দিয়েছেন। যা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে বিভাগীয় সমন্বয় কমিটি এবং জেলা’র নেতৃবৃন্দকে। কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী বিবাহিত, অছাত্র এবং বিতর্কিতরা কমিটিতে আসতে পারবেন না। তাছাড়া যারা ২০০৫ সালের পরে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন শুধুমাত্র তারাই কমিটিতে আসতে পারবেন।

তবে অভিযোগ উঠেছে, ওই রোড ম্যাপ অতিক্রম করে স্ব-ঘোষিত নিয়মে কমিটি’র প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করেছেন জেলা ছাত্রদলের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক। তারা তাদের প্রার্থীদের পদে আনতে ২০০৩ সালের এসএসসি ব্যাচের ছাত্রদেরও পদ দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ২০০৩ ব্যাচের হলেও অনিয়মিতভাবে পরীক্ষা দিয়ে ২০০৫ সালে উত্তীর্ণ ছাত্র নেতাদেরও কমিটি দেয়ার সু-কৌসল এঁটেছেন। তার মধ্যে জেলার নেতাদের পছন্দের তালিকায় থাকা পদপ্রত্যাশিদের রয়েছে বিয়ের যোগ্যতা এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ।

বরিশাল জেলার ১০টি উপজেলা, ৬টি পৌরসভা এবং ২৪টি কলেজ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে একই পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে বলে অভিযোগ বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে। তারা বলেন, যারা ২০০৩ সালের ব্যাচ হয়েও ফেল করতে করতে ২০০৫ সালে পাস করেছেন তাদের পুরস্কার স্বরূপ ছাত্রদলের পদ দেয়ার পরিকল্পনা চলছে। আর যারা নিয়মিত ছাত্র হিসেবে ছাত্রদলের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে করা হচ্ছে ষড়যন্ত্র।

এমনই একটি অভিযোগের প্রমাণও দিয়েছেন ছাত্রদলের ত্যাগি পদপ্রত্যাশিরা। তারা জানিয়েছেন, ‘বরিশালের হিজলা উপজেলা ছাত্রদলের পদপ্রত্যাশি মহাসিন সিকদার ২০০৪ সালে এসএসসি এবং ২০০৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাছাড়া দীর্ঘ ৫-৬ বছর পূর্বে রাজধানীর সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিয়ে করে দাম্পত্য জীবন পরিচালনা করছেন। কিন্তু তিনিই আবার ছাত্রদলের নিয়ম ভেঙে পদপ্রত্যাশি হয়েছেন।

এর আগে একই উপজেলার আরও এক পদপ্রত্যাশি ছাত্র নেতার অবৈধ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যা নিয়ে সংবাদও প্রকাশিত হয়। যদিও ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওটি ষড়যন্ত্র বলে অভিযুক্ত নেতার পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়েছে। কমিটি থেকে বঞ্চিত করতে ওই ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এবং তিনি বিবাহও করেননি বলে দাবি করা হয়েছে ওই ছাত্রনেতার পক্ষ থেকে।

এসব বিষয় নিয়ে ছাত্রদলের কমিটি গঠন সংক্রান্ত বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয় কমিটির আহবায়ক মো. জাকির হোসেন এর ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

তবে বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মাহফুজুর রহমান মিঠু বলেন, ‘কমিটি গঠন কার্যক্রম প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। আগামী ১৮ আগস্ট এ নিয়ে ঢাকায় বৈঠক হবে। তাই সুপারফাইভ কমিটির সকল নেতাই এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন। ঐ বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত করে কেন্দ্রের কাছে তালিকা জমা দেয়া হবে। তারা আপত্তি না করলে ওই দিনই কমিটি ঘোষণা হতে পারে। আর না হলে পরে ঘোষণা হবে।

তিনি বলেন, ‘কমিটিতে বিবাহিত এবং ছাত্রদের আসার কোন সুযোগ নেই। এজন্য ইতিপূর্বে আমরা গোপনে বিষয়টি তদন্ত করে দেখেছি। কিন্তু সেখানেও বাধার সম্মুখীন হয়েছি। কিন্তু এখন পদপ্রত্যাশিদের নিয়ে অভিযোগ এবং বিয়ের বিষয়টি এমনভাবে উঠে আসছে যে আমরাও বিব্রত হচ্ছি। অবশ্য বয়সের বিষয়ে কিছুটা ছাড় দেয়া হয়েছে এমন দাবি জানিয়ে ছাত্র দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাহফুজুর রহমান মিঠু বলেন, ‘যারা এসএসসি ২০০৩ সালের ব্যাচ অথচ অথচ পাস করেছেন ২০০৫ সালে তাদের ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া হবে। কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দাবি এই ছাত্র নেতার।