দৌলতখানে সমুদ্রগামী জেলেদের দুর্দিন

প্রকাশিত: ২:৫৪ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২০

দৌলতখান প্রতিনিধি ॥ ভোলার দৌলতখানে বিশেষ মৎস্য ভিজিএফ এর তালিকায় সমুদ্রগামী জেলেদের নাম না থাকায় মেঘনা পাড়ের জেলে পরিবারে চলছে দুর্দিন, কাটছে মানবেতর জীবন। পেটের ক্ষুধায় লজ্জা ভুলে অসহায় জেলেরা ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে।

জানা যায়, সামুদ্রিক জলসীমায় ৬৫ দিন (২০ মে-২৩ জুলাই) মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সাগরে নিষেধাজ্ঞা, ডাঙায় করোনা ভাইরাস, মাছ শিকার বন্ধ জেলেদের এ দুরবস্থার কথা চিন্তা করে সরকার মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ভোলার দৌলতখানে ২০ হাজার ৬০৩ টি সমুদ্রগামী জেলে পরিবারকে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ১ম কিস্তিতে ৫৬ (ছাপ্পান্ন) দিনে ৫৬ (ছাপ্পান্ন) কেজি হারে মোট ১১৫৩.৭৭০ মেট্রিক টন খাদ্য (চাল) সহায়তা বরাদ্দ দিয়েছে। নির্দেশনা ছিলো পৌর মেয়র ও ইউপি চেয়ারম্যানগণ সমুদ্রগামী জেলেদের নাম মৎস্য তালিকায় সমন্বয় করে জেলেদের মাঝে চাল বিতরণ করবেন। এক্ষেত্রে তারা উক্ত তালিকায় সমুদ্রগামী জেলেদের নাম সমন্বয় না করেই পূর্বের তালিকা দিয়ে চাল বিতরণ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে করে খাদ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত সমুদ্রগামী জেলেরা।

পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডের ইউসুফ মিয়া, রফু মাঝি, নুরনবী মাঝি, সৈয়দপুরের জামাল মাঝি সহ ২০-২৫ জন সমুদ্রগামী বোটের মাঝি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ ২০ থেকে ২৫ বছর তারা সমুদ্রে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বছরে ৯ থেকে ১০ মাস সময় কেটে যায় সমুদ্রে। এ যাবত সরকার জেলেদেরকে যে সকল সহযোগিতা দিয়েছে তার কোনটিই তারা বা তাদের বোটের জেলেরা পাননি। তারা আরো জানান, আমরা জানতে পেরেছি সরকার সমুদ্রগামী জেলেদের দুর্দশার কথা চিন্তা করে ৬৫ দিনের জন্য চাল বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখি সেই তালিকাতেও আমাদের নাম নেই। শতকরা ৫ জন সমুদ্রগামী জেলে ছাড়া সবাই রয়েছে এই তালিকার বাইরে।

সমুদ্রগামী ট্রলার সমিতির সেক্রেটারি ফয়সাল জানান, সমুদ্রগামী জেলেদের জন্য যে চাল এসেছে তা আমরা জানি না এমনকি আমাদের মাঝি-মাল্লারাও জানেন না। কোন চেয়ারম্যান বা মেম্বার এ ব্যাপারে আমাদের সাথে যোগাযোগ করে নামের তলিকা চাননি।

মৎস্যজীবী নেতারা ােভ প্রকাশ করে বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে আমাদেরকে উপজেলা পর্যায়ে মৎস্যজীবী সমিতির দায়িত্ব দেয়া হলেও চেয়ারম্যান-মেম্বাররা আমাদের কে পাশ কাটিয়ে প্রকৃত জেলেদের কে বাদ দিয়ে মনগড়া তালিকা তৈরি করেছেন। যে তালিকায় মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, মাস্টার, মুদি দোকানদার, স্বর্ণকার, স্টেশনারী দোকানদার ও চেয়ারম্যান-মেম্বারদের আত্মীয়-স্বজনদের নাম রয়েছে। এতে করে প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকার করোনা পরিস্থিতিতে সমুদ্রগামী জেলেদের দুর্দিনের কথা চিন্তা করে যে মহৎ উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সুবিধাভোগী একটি মহলের জন্য তা ব্যাহত হচ্ছে। জেলে তালিকা সঠিক ভাবে যাচাই বাছাই করে প্রকৃত জেলেদের চাল দেয়ার জন্য তারা দাবি জানান।

খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শান্তি রঞ্জন দাস বলেন, অনেক ইউনিয়ন বরাদ্দের চাল নিয়ে গেছে। কিছু ইউনিয়ন আংশিক চাল তুলে নিয়েছে বাকি চাল গোডাউনে মজুদ রয়েছে। চেয়ারম্যানরা জেলেদের চাল উত্তোলনের পরেও আপনার গুদামে চাল রেখে গেছেন কেনো?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে চাল রাখার জায়গা না থাকায় এখানে রেখে গেছে। এসময় খাদ্য গোডাউন থেকে চাল নিতে আসা মদনপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ফারুক মিয়ার কাছে তালিকা সমন্বয় করে সমুদ্রগামী জেলের নাম রাখা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের সব জেলেরাই সাগরে মাছ ধরে। এসময় তার ইউনিয়নের ২-১ টি সমুদ্রগামী ট্রলারের নাম জানতে চাইলে তিনি তা বলতে পারেননি।

উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুল হাসনাইন জানান, নির্দেশনা ছিলো পূর্বের তালিকা হালনাগাদ করে তার সাথে সমুদ্রগামী জেলেদের নাম সমন্বয় করে একটি স্বচ্ছ তালিকা তৈরি করে উপজেলায় জমা দেয়ার। কিন্তু অনেক চেয়ারম্যানরাই তালিকা সমন্বয় না করে চাল বিতরণ করছেন। চাল বিতরণের তালিকা সংশোধনের জন্য আমি বিভিন্ন ইউনিয়নে গিয়েছি এবং তালিকা সংশোধন করে সমুদ্রগামী জেলেদের নাম যুক্ত করার জন্য চেয়ারম্যানদের বলেছি।
উপজেলায় সমুদ্রগামী জেলেদের বিশেষ ভিজিএফএর চাল বিতরণ করা হচ্ছে কিন্তু সেই তালিকায় অধিকাংশ সমুদ্রগামী জেলেদের নাম নেই, সে বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জীতেন্দ্র কুমার নাথ বলেন, চেয়ারম্যানদের কে তালিকা সমন্বয় করে চাল বিতরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কোন জেলে তালিকা থেকে বাদ পড়লে সে ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।