তীব্র সেশনজটে আক্রান্ত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ক্ষোভে ফুঁসছেন শিক্ষার্থীরা


Deprecated: get_the_author_ID is deprecated since version 2.8.0! Use get_the_author_meta('ID') instead. in /home/ajkerbarta/public_html/wp-includes/functions.php on line 4861
প্রকাশিত: ১০:৫৭ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৪, ২০২০

শফিক মুন্সি ::

দক্ষিণ বঙ্গের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ খ্যাত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা (ববি) ভুগছেন তীব্র্র সেশনজট সমস্যায়। মূলত শ্রেণীকক্ষ – শিক্ষক সংকট, পরীক্ষা কমিটি এবং নিয়ন্ত্রক দপ্তরের গাফিলতি আর শিক্ষকদের সদ্বিচ্ছার অভাবে দীর্ঘায়িত হচ্ছে হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন। এরই মধ্যে চরম সংকটে পড়েছেন স্নাতক শেষ পর্বের শিক্ষার্থীরা। করোনা পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন পরীক্ষা আটকে থাকায় তাদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা। যে কারণে শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত রোধের সর্বশেষ উপায় হিসেবে আন্দোলনে যাবার চিন্তা করছেন তারা। তবে প্রশাসন দাবি করছে সমস্যা নিরসনে কাজ করছেন তারা।

 

সংকট আছে শিক্ষক আর শ্রেণীকক্ষের:
নিয়মিত ক্লাস না হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সেশনজটের অন্যতম বড় কারু। ক্লাস না হবার পিছনে মূলত ক্লাসরুমের অভাব এবং শিক্ষক সংকটকে দায়ী করেছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ টি অনুষদের ২৪ টি বিভাগে বর্তমানে ১৯৩ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। এছাড়া দুটি একাডেমিক ভবনে মোট ৩৪ টি ক্লাসরুম। বেশিরভাগ বিভাগের ক্লাস নেবার জন্যই বরাদ্দ মাত্র একটি কক্ষ। আর প্রতিটি বিভাগে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা কম।
এ ব্যাপারে গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী জিয়াউল হক জিহাদ বলেন,‘ প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের প্রতিটি বিভাগেই শিক্ষক ও শ্রেণীকক্ষের সংখ্যা কম। এর ওপর করোনার নয় মাসে শিক্ষা কার্যক্রম এক প্রকার বন্ধ। যে কারণে বড় ধরনের সেশনজটের সম্মুখীন হয়েছি আমরা’।

 

শিক্ষকদের সদ্বিচ্ছার অভাবকে দুষছেন কেউ কেউ :
প্রাণঘাতি করোনা সংক্রমণের হাত থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের কথা মাথায় রেখে গত মে মাস থেকে অনলাইন ক্লাস কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে অভিযোগ উঠেছে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নেবার কোন উদ্যোগ নেননি কিছু শিক্ষক। অন্যদিকে শিক্ষকদের মধ্যে অনেকে স্বাভাবিক সময়েও নিয়মিত ক্লাস নেবার ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। যে কারণে চরম সেশনজটে ভুগতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এমনকি এ ব্যাপারে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো পরিস্থিতিও নেই সেখানে। কারু ৪০ শতাংশ নম্বর বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের হাতে থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে পরীক্ষার ফলাফলে প্রভাব পড়ে বলে জানা গেছে।

 

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বিভাগের তিনজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, উপাচার্যের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তাদের বিভাগের একাধিক শিক্ষক বিগত ছয়মাসে অনলাইনে কোন ক্লাস নেন নি। অন্যদিকে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুদুর রহমান বলেন,‘ কিছু শিক্ষক আছেন যারা নির্ধারিত সময়ে ক্লাস কিংবা পরীক্ষা নেন না। যে কারণে গুটিকতক শিক্ষকের জন্য গোটা সেমিস্টার সমাপ্তিতে বিলম্ব হয়। এর প্রভাব পড়ে পুরো শিক্ষাজীবনে’।

 

অবহেলা আছে পরীক্ষা কমিটি এবং নিয়ন্ত্রক দপ্তরের :
বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ বিভাগে সেমিস্টার হিসেবে পড়ানো হয়। প্রতিবছর দুটি সেমিস্টার অনুষ্ঠিত হবার কথা হিসেব অনুযায়ী। স্নাতকের চার বছরে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শেষ করতে হবে ৮টি সেমিস্টার। এর বাইরে ইয়ার (৬০-৭০ শতাংশ নম্বরের বছরে একটি বার্ষিক পরীক্ষা) ব্যবস্থা চালু আছে কিছু বিভাগে।
প্রতিটি সেমিস্টার বা বার্ষিক পরীক্ষার জন্য বিভাগীয় শিক্ষকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয় প্রতিষ্ঠানটিতে। এই কমিটি নির্ধারিত সময়ে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন বিষয়ক সিদ্ধান্ত এবং ফলাফল প্রকাশ করে থাকে। এই কমিটিকে সহায়তা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর। বিশেষ করে প্রশ্নপত্র মডারেশন, পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ, উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য বহিঃশিক্ষকদের কাছে পাঠানো এবং ফলাফল প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই দপ্তরটি।

কিন্তু পরীক্ষা কমিটি আর দপ্তরের গাফিলতিতে বিলম্বিত হচ্ছে শিক্ষাবর্ষ এমন দাবি কিছু শিক্ষার্থীর। বাংলা, ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা এবং রসায়ন বিভাগের সাতজন শিক্ষার্থী এমনটা জানিয়েছেন। তারা জানান, একটি সেমিস্টার শুরু করে পরীক্ষা গ্রহণ এবং ফলাফল প্রকাশে প্রায় আট মাস অতিবাহিত করে পরীক্ষা কমিটি এবং নিয়ন্ত্রক দপ্তর। প্রতি সেমিস্টারে যদি গড়ে তিন মাস বিলম্ব হয় তবে স্নাতক শেষ করতে অতিরিক্ত দুবছর লেগে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

 

বাড়ছে শিক্ষার্থী অসন্তোষ :
ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা, মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান এবং কম্পিউটার ও প্রকৌশল বিজ্ঞান বিভাগের ২০১৪-১৫ সেশনের শিক্ষার্থীদের স্নাতক পর্যায়ের সর্বশেষ সেমিস্টার পরীক্ষা আটকে আছে প্রায় এক বছর। কিন্তু তাদের স্নাতক শেষ হয়ে যাবার কথা দু’বছর আগে। এই শিক্ষার্থীরা কদিন যাবত কয়েকবার করে বিভাগীয় শিক্ষক, চেয়ারম্যান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে তাদের সমস্যার কথা জানিয়ে সমাধান প্রত্যাশা করেছেন। দ্রুত সমাধান না আসলে আন্দোলনে যাবার চিন্তা করবেন তারা।
এ ব্যাপারে মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ হাফিজুর রহমান বলেন,‘ দীর্ঘদিনের সেশনজটে চাকরির বয়স হারাচ্ছি আমরা। স্নাতকের শেষ পরীক্ষা আটমাস যাবত আটকে থাকায় একের পর এক সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তি চলে গেলেও আবেদন করতে পারছি না। দ্রুত এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রশাসন সহায়তা না করলে আমরা আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবো’।

 

কি ভাবছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন :
শ্রেণীকক্ষ এবং শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়কে তাকিয়ে থাকতে হয় ইউজিসির (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন) দিকে। আর অনলাইন ক্লাস কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া সহ স্নাতক – স্নাতকোত্তর শেষ পর্বের শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

উপাচার্য ড. মোঃ ছাদেকুল আরেফিন জানান, চলতি সপ্তাহে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের বিষয়ে আলোচনা করা হবে। জরুরী ভিত্তিতে একাডেমিক কাউন্সিলের সভা আহবানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

তিনি আরো জানান, মহামারি পরিস্থিতিতে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে শিক্ষার্থীদের সুলভ মূল্যে ইন্টারনেট এবং ডিভাইস দেবার ব্যাপারটি প্রক্রিয়াধীন। এই বিষয়টি শিক্ষাজীবনের দীর্ঘসূত্রিতা রোধে ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

অন্যদিকে রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড.মুহসিন উদ্দীন জানান, বিগত দেড় বছর যাবত ইউজিসি প্রভাষক এবং সহকারী অধ্যাপক পদের নিয়োগের জন্য বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে ছাড়পত্র দেয় নি। অন্যদিকে অধ্যাপক এবং সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও যোগ্য প্রার্থী আবেদন করেন না। যে কারণে শিক্ষক সংকট বেশ বড় করে ধরা দিয়েছে।

তিনি বলেন,‘ বর্তমান একাডেমিক ভবনের সমমানের আরো তিনটি ভবন করার জন্য পরিকল্পনা ইউজিসিতে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ অনুযায়ী নির্মাণ কাজ শুরু হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকরা যেন নিয়মিত ক্লাস কার্যক্রম এগিয়ে নেন সে ব্যাপারে ইতোমধ্যে তদারকি শুরু হয়েছে’।