ঝালকাঠিতে ‘স্বর্ণ কিশোরী’ সারার ওপর হামলাকারী জুবায়ের কারাগারে

প্রকাশিত: ৬:৪৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৩, ২০২০

আককাস সিকদার, ঝালকাঠি প্রতিনিধি ::

ঝালকাঠির ‘স্বর্ণ কিশোরী’ নাছরিন আক্তার সারার ওপর হামলা ও ইভটিজিং মামলার আসামী রোভার স্কাউট জুবায়ের আদনানকে (২৩) কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ঝালকাঠির সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে বিচারক এ.এস.এম তারেক শামস জামিন আবেদন না মঞ্জুর করে জুবায়েরকে জেল হাজতে পাঠানোর আদেশ দেন।

জুবায়ের বরগুনা সদর উপজেলার নিশানবাড়িয়া গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে। বর্তমানে তাঁর বাবা ঝালকাঠি সদর উপজেলার ছিলারিশ গ্রামে একটি মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জুবায়ের ঝালকাঠি শহরের একটি কলেজের স্কাউটস’র টিম লিডার। মামলা সূত্রে জানা যায়, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় গত ২ অক্টোবর স্বর্ণ কিশোরী সারার বাসায় ঢুকে তাঁর ওপর হামলা করেন জুবায়ের আদনান।

এ ঘটনায় ওই দিন রাতে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে ঝালকাঠি থানায় মামলা দায়ের করে নাছরিন আক্তার সারা। গত ৯ অক্টোবর আসামি জুবায়েরকে গ্রেপ্তারের দাবিতে ঝালকাঠি থানার সামনে অনশন করে সারা। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আসামি গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রুতি পেয়ে অনশন স্থগিত করে সারা। একইদিন ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। ডিবির একাধিক টিম জুবায়েরকে গ্রেপ্তারের জন্য বরিশাল, ঝালকাঠি ও রাজাপুরে অভিযান চালায়। ডিবি পুলিশের অভিযানে বারবার অবস্থান বদল করে দিশেহারা জুবায়ের আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন।

জুবায়েরের বাবার নালিশি অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন! :
সারার ওপর হামলার ঘটনায় মামলা দায়েরের পরে পাল্টা একটি অভিযোগ দিয়েছেন হামলাকারী আদনানের বাবা একটি মসজিদের ইমাম জাকির হোসেন। গত ৫ অক্টোবর আদালতে দায়ের করা নালিশি অভিযোগে সারা, তাঁর বোন আখিনুর আক্তারসহ চারজনকে বিবাদী করা হয়। অভিযোগটি নিয়ে সারা ও তাঁর পরিবারসহ বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, জুবায়ের আদনানকে ডেকে নিয়ে সারার বাসায় বসে মারধর করা হয়েছে। জুবায়েরের বাবা একজন মসজিদের ইমাম হয়ে এ ধরনের ‘মিথ্যা’ একটি ঘটনা সাজিয়ে নালিশি অভিযোগ দেওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছে সারা।

সারার বোন আঁখিনুর আক্তার বলেন, আমার বোনকে ঘরের ভেতরে ঢুকে মারলো জুবায়ের। অথচ ওর বাবা মসজিদের ইমাম হয়েও আমাদের সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন। এ অভিযোগ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি। জুবায়ের আদনানের বাবা ঝালকাঠি সদর উপজেলার পোনাবালিয়া ইউনিয়নের ছিলারিশ গ্রামের একটি মসজিদের ইমাম জাকির হোসেন ঝালকাঠির ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লার কাছে বলেছেন, সারার পরিবার তাঁর কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল।

তিনি সারাদের বাসায় তাঁর মেয়েকে পাঠিয়ে ৮ দিন পরিবারের নানা বিষয়ে পর্যবেক্ষণে রাখেন। মেয়েটি ৮ দিন সারাদের বাসায় থেকে খোঁজখবর নিয়ে তাকে জানায়, সারাদের কোন জমিজমা নেই। তাদের আর্থিক অবস্থা ভাল না। এক কথায় ওরা গরিব। এ জন্য তিনি বিয়েতে রাজি হননি। পুলিশ সুপার এ বক্তব্য শোনার পরে জুবায়েরের বাবাকে বলেন, আপনি একজন মসজিদের ইমাম হয়ে বিয়ের আগেই যৌতুকের চিন্তা করেছেন। এটা কি ঠিক করেছেন! এ প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারেননি যুবায়েরের বাবা। ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

এ ব্যাপারে নির্যাতনের শিকার নাছরিন আক্তার সারা বলে, আমার ওপর হামলাকারী জুায়ের আদনানকে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। আমার মামলার বিচার না হওয়া পর্যন্ত তাকে যেন জামিন না দেওয়া হয়, আদালতের কাছে আমি এ অনুরোধ করছি।

জুবায়ের বিরুদ্ধে দরিদ্রদের ২৫০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ :
যুবায়ের আদনান ঝালকাঠির টেনকিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি স্কাউটস’র সঙ্গে জড়িত। তিনি ওই কলেজের স্কাউটস’র দলনেতা। এ সুবাদে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ২৫০০ টাকা প্রদানে পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষের তালিকা করার জন্য জুবায়ের আদনানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তালিকা অনুযায়ী মোবাইলফোনে বিকাশ অথবা নগদ এ টাকা আসার পরে যুবায়ের দরিদ্র কয়েকজন ব্যক্তির কাছ থেকে কৌশলে পিন নম্বর নিয়ে নিজের অ্যাকাউন্টে টাকা ট্রান্সফার করেন। বিষয়টি দরিদ্র ওই ব্যক্তিরা প্রথমে বুঝতে পারেননি, পরে জানতে পেরে স্থানীয় পৌর কাউন্সিলরদের কাছে অভিযোগ করেন।

এক কাউন্সিলর দায়িত্ব নিয়ে জুবায়েরের কাছ থেকে দুইজনের টাকা ফেরত এনে দেন। এ বিষয়টি সোমবার একটি অনুষ্ঠানে পৌরসভার এক কাউন্সিলর জেলা প্রশাসকের কাছে জানান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিকসহ অন্যরা বিষয়টি জানতে পেরে হতবাক হয়ে যান।

জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নিবেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া জুবায়ের একমাস আগে উত্তরকিস্তাকাঠি আবাসনে একটি বিরোধকে কেন্দ্র করে হামিদা আক্তার নামে এক নারীর কাছে ঝালকাঠি থানার ওসির কথা বলে দশ হাজার টাকা দাবি করেন। ওই নারী বিষয়টি ওসিকে জানালে ওসি জুবায়েরকে ডেকে ভর্ৎসনা করেন।

Sharing is caring!