জেলা ছাত্রদলের দুই শীর্ষ নেতার গোপন মিশন! ১৫ বছর পরে ছাত্রদলের ইউনিট কমিটি গঠন প্রক্রিয়া

প্রকাশিত: ১১:৪৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৬, ২০২০

খান রুবেল ॥

ঈদে আগে কমিটি গঠনের গুঞ্জনে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে প্রায় নিষ্ক্রিয় বরিশালের বিভিন্ন উপজেলা, পৌরসভা ও কলেজ ছাত্রদল। রাজনৈকিত কর্মকাণ্ডে না থাকলেও সাংগঠনিক পদ পেতে লবিং-তদবির শুরু করেছেন পদ প্রত্যাশীরা। সকল অনিয়মের ঊর্ধ্বে থেকে দীর্ঘ ১৫ বছর পরে গঠন হতে চলা ইউনিট কমিটি স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদী জেলার নেতারা।

গণমাধ্যমকে দেয়া বক্তৃতায় এমনটি দাবি করা হলেও বাস্তবে ঘটছে ভিন্নটা। জেলার সুপার ফাইভ নেতাদের পাশ কাটিয়ে গোপনে ইউনিট কমিটির নেতৃত্ব বাছাইয়ের অভিযোগ উঠেছে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে। তারা কথিত ছাত্র নেতাদের দিয়ে টিম গঠন করে পদ প্রত্যাশীদের যাচাই-বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। যা জানেন না সুপার ফাইভের অপর তিন নেতা। ফলে তাদের এই কর্মকাণ্ড সংগঠন বিরোধী বলে দাবি করছেন তারা। এসব কারণে শুরুতেই কমিটি গঠন কার্যক্রম নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

যদিও প্রকৃত ছাত্র নেতা এবং ত্যাগীদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিতেই গোপনে প্রাথমিক যাচাই বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলে দাবি বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মাহফুজ আলম মিঠু এবং সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান’র।

জানাগেছে, কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী দীর্ঘ বছর পরে বরিশাল বিভাগের প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা, থানা এবং কলেজ কমিটি গঠন কার্যক্রম শুরু করেছে স্ব স্ব জেলা ও মহানগর ছাত্রদল। এর অংশ হিসেবে বরিশাল জেলায়ও চলছে কমিটি গঠনের প্রস্তুতি।

এরইমধ্যে গত ২০ জুলাই বরিশাল জেলার ১০টি উপজেলা, ৬টি পৌরসভাসহ এর আওতাধীন কলেজ কমিটিতে পদ প্রত্যাশী ছাত্র নেতাদের জীবনবৃত্তান্ত গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি উপজেলা এবং পৌর বিএনপির নেতা ও জেলা ছাত্রদলের কাছে দেয়া হয়েছে সুপারিশপত্র। এখন বাকি যাচাই-বাছাইয়ের।
এদিকে সম্প্রতি ছাত্রদলের ইউনিট কমিটি গঠনের লক্ষ্যে ছাত্রদলের বিভাগীয় সাংগঠনিক টিম লিডারদের উত্থাপিত প্রস্তাবনার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সমন্বয় পরিষদ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ সংক্রান্তে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহ দপ্তর সম্পাদক আজিজুল হক সোহেল স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে সিদ্ধান্তের বিষয়ে একাংশে উল্লেখ করা হয়েছে- কোন অধীন ইউনিট কমিটি প্রস্তুত করার পূর্বে ঊর্ধ্বতন কমিটির কেবল সভাপতি, সম্পাদক নন বরং সুপার ফাইভের সাথে সমন্বয় করার জন্য বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমকে নির্দেশ দেওয়া গেলো।

কেন্দ্র থেকে এমন নির্দেশনা থাকলেও তা অনুসরণ করছেন না ছাত্রদলের বরিশাল জেলা সভাপতি মাহফুজুল আলম মিঠু এবং সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান। তারা সুপার ফাইভ নেতাদের সাথে কোন প্রকার যোগাযোগ না করে গোপনে কমিটির বিষয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ উঠেছে, গত শনিবার ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মনোনীত আল আমিন মৃধা, কাদের, রাফিন, ফাহিমের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধি টিম মুলাদী উপজেলা ভিজিট করে। তারা ওই উপজেলা, পৌরসভা এবং কলেজ ছাত্রদলে পদ প্রত্যাশী নেতাদের বিষয়ে খোঁজ খবর নেন। সেখানে দাবি করেন তাদের জেলা ছাত্রদল কর্তৃক টিম গঠন পূর্বক মুলাদী উপজেলার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এমন পরিচয়ে তারা ওই উপজেলায় পদ প্রত্যাশী নেতাদের সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ছাত্রদলের একাধিক নেতা অভিযোগ করেছেন, কোন একটি স্বার্থান্বেষী মহলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গোপনে তথা কথিত টিম গঠন করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছেন।

তবে কমিটি গঠন বিষয়ে জেলা ছাত্রদল থেকে পৃথক কোন টিম গঠন করা হয়নি বলে দাবি করেছেন জেলা ছাত্রদলের সুপার ফাইভ নেতারা। জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তৌফিক আল ইমরান বলেন, ‘আমি দলীয় কাজে ঢাকায় ছিলাম। সেখান থেকে শনিবার বরিশালে এসেছি। কমিটি গঠন বা যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত কোন টিম গঠনের বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। আমার সাথে এ বিষয়ে কোন আলোচনাও করেননি সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক। তারা এমনটি করে থাকলে সেটা সংগঠন বিরোধী কর্মকা- বলে আমি মনে করি। হতে পারে যারা মুলাদীতে যাচাই বাছাইয়ের জন্য ওদের পাঠিয়েছেন তারা নিজেদের স্বার্থেই পাঠিয়েছেন।

অপরদিকে জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি তারেক আল ইমরান বলেন, ‘আমি বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি মুলাদী উপজেলায় প্রতিনিধি টিম পাঠানো হয়েছে। অথচ জেলা ছাত্রদল এখন পর্যন্ত কোন টিম গঠন করেনি। আর টিম গঠন করে থাকলে সেখানে অবশ্যই সুপার ফাইভ নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সেটা না করে জেলা ছাত্রদলের কমিটিতেই নেই এমন কর্মীদের নিয়ে টিম গঠন হাস্যকর এবং সংগঠন বিরোধী কর্মকা-। এ বিষয়ে বিভাগে যা টিম লিডারের দায়িত্বে আছেন তাদের অবগত করা হবে বলেও জানিয়েছেন এই নেতা।

এদিকে জেলা ছাত্রদলের প্রতিনিধি টিম হিসেবে কয়েকজন ছাত্রদল কর্মীর মুলাদী উপজেলা পরিদর্শনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন ওই উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি ছত্তার খান। তবে বিষয়টি ছাত্রদলের হওয়ার এ নিয়ে তিনি কোন প্রকার বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

যদিও পুরো বিষয়টি স্বীকার করেছেন জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান। তিনি বলেন, আমরা কোন টিম গঠন করিনি। আমাদের কাছে বিএনপির প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করা বিভিন্ন নেতাদের কাছ থেকে একাধিক সুপারিশ এসেছে। তার মধ্যে অনেক অছাত্র রয়েছেন। সেগুলো সরেজমিনে খোঁজ খবর নেয়ার জন্যই ওদের মুলাদী পাঠানো হয়েছে।

জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মাহফুজুল আলম মিঠু বলেন, ‘কমিটি স্বচ্ছভাবে করার জন্যই গোপনীয়তা রক্ষা করে সরেজমিনে বিষয়টি খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন টিম গঠন করা হয়নি। আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই-বাছাই শুরুর বিষয়টি পদ প্রত্যাশীরা জানতে পারলে তারা সতর্ক হয়ে যাবেন। তাই কাউকে কিছু না জানিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘মুলাদী উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি ছত্তার খান একটি সুপারিশ পাঠিয়েছেন। সেখানে দু’জন বিবাহিত এবং একজন অছাত্র’র নাম রয়েছে। এ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্যই কয়েকজন কর্মীকে সেখানে পাঠানো হয়, পদ প্রত্যাশীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেয়ার জন্য।

তবে এ বিষয়টি সুপার ফাইভ কমিটির অন্য নেতাদের অবগত করা হয়নি কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘তৌফিক আল ইমরানের যাওয়ার কথা ছিল ওই টিমের সাথে। ওর সাথে যোগাযোগ করা হলে সে ব্যক্তিগত কারণে যেতে পারবে না বলে আমাকে জানিয়ে দেয়। এছাড়া তারেক আল ইমরানকে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি বলে দাবি মিঠুর। পরে সুপার ফাইভ কমিটির সাথে বসে আলোচনা করে টিম গঠন করে এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।

তবে টিম গঠন বা প্রতিনিধি প্রেরণের বিষয়ে সভাপতি ও সম্পাদক মিথ্যাচার করছেন বলে দাবি জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি তারেক আল ইমরান ও সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তৌফিক আল ইমরানের।