জীবনের আলোয় ফিরলেন তারা

প্রকাশিত: ১০:২৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১, ২০২০

শফিক মুন্সি ॥

গত এক বছরে বরিশাল জেলায় ছয় শতাধিক ছিন্নমূল, ভাসমান এবং পরিবারহীন দুঃস্থ – অসহায় মানুষকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হয়েছে। সরকারি এই প্রকল্পের আওতায় বরিশাল সমাজকল্যাণ অধিদফতরের আওতাধীন বিভিন্ন কেন্দ্রে এসব মানুষের পুনর্বাসন চলে। ১৮ বছরের কম এমনই ৩৫ জন মেয়ে বর্তমানে আছে নগরীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার কালিজিরা নামক স্থানে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে। যারা অতীতের অন্ধকারে নিমজ্জিত জীবনের ইতি টেনে বর্তমানে ফিরেছে আলোর ধারায়।

রূপসা খাতুনের (ছদ্মনাম) বয়স ১৮ ছুঁই ছুঁই। এরই মাঝে প্রায় তিনটি বছর তাঁর কেটেছে দেশের বিভিন্ন বেশ্যালয়ে। অতঃপর পুলিশ ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায় পতিতাবৃত্তি থেকে মুক্তি পান গতবছর। তারপর সরকারি সহায়তার অংশ হিসেবে এই পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্থান পেয়ে ভাগ্য ফিরেছে তাঁর। বর্তমানে সেলাই মেশিনের কাজ শিখছেন তিনি। স্বপ্ন দেখছেন প্রশিক্ষিত টেইলার্স কর্মী হিসেবে আত্ম নির্ভরশীল হয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার।
এই পুনর্বাসন কেন্দ্র নিবাসী মরিয়ম আক্তার (১৫) ছদ্মনামের আরেক কিশোরীর সঙ্গে কথা হয়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করা এই কিশোরী বর্তমানে বুটিক শিল্পের কাজ শিখছে। পরিবারহীন ছিন্নমূল এই কিশোরীর কাছে পুনর্বাসন কেন্দ্রের সকলেই নতুন পরিবার। সকলের ভালোবাসা আর প্রশিক্ষকদের সহায়তায় নিজেকে বাস্তবতার নির্মম লড়াইয়ে কঠিন যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলছে সে।

মরিয়ম কিংবা রূপসার মতো অন্য সবাই পুনর্বাসন কেন্দ্রের সুন্দর পরিবেশ এবং নতুন ভাবে বাঁচতে শেখার সুযোগ পেয়ে আপ্লুত। এমনকি দেড় কাঠা আয়তনের এই সবুজ জায়গাটুকুকেই তারা তাদের আপন নীড় হিসেবে গ্রহণ করেছে সাবলীলভাবে। গত সোমবার বেলা দেড়টার দিকে পুনর্বাসন কেন্দ্রের ডরমিটরিতে গিয়ে দেখা যায় সেখানে দুপুরের খাবারের তোড়জোড় চলছে। খাবারের তালিকায় আছে ভাত, সবজি, তেলাপিয়া মাছ ও ডাল। তথ্য নিয়ে জানা গেলো প্রতিদিন সকাল সাড়ে আটটায় নাস্তা, দুপুর দেড়টায় দুপুরের খাবার ও রাত নটার মধ্যে রাতের খাবার পরিবেশন করা হয় সেখানকার নিবাসীদের জন্য।

এছাড়া প্রত্যেক নিবাসীর জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে সেলাই – বুটিক প্রশিক্ষণ এবং সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষার। এখানে আশ্রয় গ্রহণকরা সকলে যেন আত্মনির্ভরশীল হতে পারে সে সুযোগ সৃষ্টির জন্যই এমন উদ্যোগ। অতীতের কালো অধ্যায়ের স্মৃতি ভুলে তাঁরা যেন মানসিকভাবে শক্তি অর্জন করতে পারে সেজন্য রাখা হয়েছে কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা। এছাড়া যেকোনো রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের জন্য রয়েছে ছোট্ট মেডিকেল সেন্টার।
বরিশাল জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে মূলত চারটি কেন্দ্রে তরুণ, কিশোর ও শিশু বয়সীদের পুনর্বাসিত করা হয়। এগুলো হলো নগরীর রূপাতলী এলাকার শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, দক্ষিণ আলেকান্দা ও আমতলা মোড় এলাকার সরকারি শিশু পরিবার এবং কালিজিরা এলাকার এই সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমানের তদারকিতে এসব প্রতিষ্ঠান সফলভাবে দেখভালের দায়িত্বে আছেন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আল মামুন তালুকদার, প্রবেশন কর্মকর্তা সাজ্জাদ পারভেজ, সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জাবির আহমেদ প্রমুখ। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে বর্তমানে এসব পুনর্বাসন কেন্দ্র গুলো থেকে প্রশিক্ষিত জনসম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিটি কেন্দ্রে বৃদ্ধি পেয়েছে জীবন যাপনের মান।

নগরীর কালিজিরায় প্রতিষ্ঠিত পুনর্বাসন কেন্দ্রটির তত্ত্বাবধায়ক সাজ্জাদ পারভেজ জানান, এই কেন্দ্রটি থেকে এর আগে ২৪৯ জন মেয়েকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ চাকরি কিংবা ব্যবসার মাধ্যমে করেছে আত্মকর্মসংস্থান কেউবা বিয়ে করে বর্তমানে ঘরকন্না সামলাতে ব্যস্ত। তবে সবাই যেন একটা সুন্দর জীবনে প্রবেশ করতে পারে সেই প্রচেষ্টা থাকে তাদের। আর তাদের এই প্রচেষ্টাকে আন্তরিকতার সঙ্গে তদারকি করেন জেলা প্রশাসক।
এদিকে গত মঙ্গলবার এই পুনর্বাসন কেন্দ্রের ভবন সংস্কারকাজের উদ্বোধনকালে জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান বলেন,‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময় সামাজিক নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেন। সেই আলোকে বরিশাল জেলায় এ পর্যন্ত আমরা ছয়শোর বেশি ছিন্নমূল, পরিবারহীন, ভবঘুরে কিংবা বিভিন্ন কারণে অসহায় মানুষদের পুনর্বাসনের কাজ করছি। এদের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েরা এখানে থাকে। তাদেরকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে আমরা অঙ্গিকারাবদ্ধ’।

Sharing is caring!