জন্ম থেকেই জ্বলা বার্মিজরা ও অংসান পরিবারের ট্র্যাজেডি!

প্রকাশিত: ৮:৪৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২১

সোহেল সানি :: কী বিস্ময়! স্বাধীনতা লাভের পরও একটি দেশের নাম বদলে দিতে পারে একটি জাতি? না জাতি নয়, সামরিক সরকার স্বাধীনতার জনকসহ সহচরদের হত্যা করে এ নাম পাল্টে দেয়।
পৃথিবীর জাতিসংঘভুক্ত ২০৩টি স্বাধীন রাষ্ট্রের মধ্যে সেই রাষ্ট্রটি হচ্ছে – বার্মা। ২০৩টির মধ্যে সার্বভৌম ১৯৯টি ও নিরপেক্ষ একটি- সুইজারল্যান্ড। ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়া বার্মার নাম বদলে মিয়ানমার বা মায়ানমার।
বার্মিজ জাতিগোষ্ঠি নাম বদলের বিরুদ্ধে টু-টা শব্দ করেনি। বরং সামরিক সরকার দেশটির শাসক। স্বাধীনতা আন্দোলনের জনক অং সান এর নামও অসংখ্য। জাপানীরা যখন অং সানকে যুদ্ধমন্ত্রী করে বার্মাকে স্বাধীন জাতি হিসাবে গ্রহণ করে তখন অং সানের নাম পাল্টে হয় ওমোদা মনচি।

 

১৯১৫ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারি বার্মার ম্যাগো জেলার নাটমাউকে জন্মগ্রহণকারী অং সান গেরিলা যুদ্ধকালে নাম পাল্টে রাখেন বো তাইজা। চীন তাকে চিনতো চাইনিজ নামে তান লু সু। তিনি প্রধানমন্ত্রীত্বলাভে ব্যর্থ হয়ে যখন প্রতিরোধ আন্দোলনে নামেন তখনও আসল নাম পাল্টে নতুন নাম রাখেন উ নাঙ চো। এমনকি জেনারেল নে উইন সঙ্গে সময় অং সান কোড নাম সাত পি রূপে পরিচয় দিতেন। অং সান ছাড়া পৃথিবীর আর কোন জাতি রাষ্ট্রের জনকের এরকম মূল নাম আড়াল করার দ্বিতীয় উদাহরণ নেই। বিচক্ষণতা, দেশপ্রেম, অসাধারণ নেতৃত্ব এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকান্ডের কারণে অং সান সারা বার্মায় ‘থাকিন’ নামে পরিচিত। থাকিন শব্দের অর্থ প্রভু। এই প্রভুত্ব দ্বারা দাবি করা হয় যে, বার্মার জনগণই হচ্ছে স্বীয় দেশের প্রকৃত নিয়ন্তা, কোন বিদেশি শাসক নয়। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট পর্যন্ত আওয়ার বার্মা ইউনিয়ন নামের একটি সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল থাকাকালীন সারা বার্মায় বহু হরতাল পালন করেন। যা অং সানকে সারা বার্মায় Htaung thoun ya byei ayeidawbon (the ‘1300 Revolution, named after the Burmese calendar year) নামে পরিচিত করে তোলে। ডোবামা, আবসু, ড. বা মাউসের Sinyetha (Poor Man’s) পার্টির সমন্বয়ে Bama-htwet -yat Gaing (the Freedom Bloc) নামক সর্বদলীয় জাতীয়তাবাদী ঐক্যজোট গড়ে এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

 

১৯৩৯ সালের আগস্টে কমিউনিস্ট পার্টি অব বার্মা (সিপিবি) গঠনও করেছিলেন। ১৯৪০ সালের মার্চে অং সান ভারতের রামগড়ে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস অধিবেশনেও যোগদান করেন। ব্রিটিশ সরকার গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে অং সান বার্মায় পালিয়ে যান। প্রথমে তিনি চীনের সহায়তা প্রার্থনা করলেও মাঝপথে জাপানের সামরিক দখলদার বাহিনী তাকে জাপানে নিয়ে যায়। অং সান ওখানে বসে বার্মা স্বাধীন করার গোপন পরিকল্পনা আঁটেন। ফিউমিমারো সরকার আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দানের প্রতিশ্রুতি দিলে ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বার্মায় ফিরে আসেন। অং সান জাপান অধিকৃত থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বার্মা ইন্ডিপেনন্ডেন্স আর্মি (বিআইএ) প্রতিষ্ঠা করেন। অং সান চিফ অব স্টাফ ও মেজর জেনারেল পদে আসীন হন। ১৯৪২ সালের মার্চে বার্মার রাজধানী রেঙ্গুন জাপানীদের করতলগত হয়। জাপানী সামরিক বাহিনী বার্মার শাসনভার গ্রহণ করে। অং সান এ সময় বার্মা ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মির নাম পরিবর্তন করে বার্মা ডিফেন্স আর্মি (বিডিএ) রাখেন। এরপর জাপান সরকার অং সানকে আমন্ত্রণ জানায় তার দেশে। জাপান সম্রাট অং সানকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৪৩ সালের ১ আগস্ট জাপান বার্মাকে স্বাধীন জাতি ঘোষণা করে অং সানকে যুদ্ধমন্ত্রী নিয়োগ করে। আবারও সেনাবাহিনীর নাম পাল্টে রাখা হয় বার্মা ন্যাশনাল আর্মি (বিএনএ)। জাপানের প্রতি তার বিশ্বাসের স্থায়ীত্ব ছিল না। জাপানীদের বার্মিজদের সঙ্গে আচার-আচারণে অসন্তোষ দেখা দেয়ায় অং সান জাপানীদের তাড়ানোর জন্য ব্রিটিশদের সঙ্গে হাতে হাত রাখেন। গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে ১৯৪৫ সালের ২৭ মার্চ বার্মা ন্যাশনাল আর্মির নেতা হিসাবে অং সান জাপানী দখলদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। জাপান পরাজিত হয় ২৭ মার্চ। বার্মায় প্রতিরোধ দিবস হিসাবে দিনটি পালিত হলেও ১৯৬২ সালে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তা এর নাম পরিবর্তন করে সশস্ত্র বাহিনী দিবস রাখে। বার্মায় ব্রিটিশ সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করে ১৯৪৪ সালে Anti Fascist Organisation (AFO) বাহিনী গঠন করে। যা পরবর্তীকালে বিএনএ, কমিউনিস্ট সোসালিস্টদের সমন্বয়ে যৌথভাবে Anti Fascist People’s Freedom League (AFPFL) বাহিনী নামে পরিচিতি পায়।

 

বার্মায় জাতীয় বাহিনীর নাম পাল্টে ফেলা হয় আরও একবার। Patriotic Burmese Forces (PBF) রাখা হয়। নতুন খেলা জাপানী বাহিনী দেশ ত্যাগ করেছে। এ অজুহাতে বার্মিজ বাহিনীর সদস্যদের নিরস্ত্র করা হয়। ১৯৪৫ সালে সেপ্টেম্বরে সিলনে মাউন্টব্যাটেনের ক্যান্ডি কনফারেন্সে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে পিবিএফকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ব্রিটিশ বাহিনীর অধীনে বার্মিজ আর্মিতে পরিণত করা হয়। অং সানের নেতৃত্বে People’s Volunteer Organisation or PVO নামের একটি আধা সামরিক বাহিনী গঠন করা হয়। অং সানকে বার্মা সেনাবাহিনীর প্রধান করতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখান করেন। ১৯৪৫ সালের অক্টোবরে বার্মায় সামরিক শাসন কায়েম করে ব্রিটিশরা। ১৯৪৬ সালের জানুয়ারিতে অং সান AFPFL প্রেসিডেন্ট হন। নতুন গভর্নর হন স্যার হুভার্ট। তার অধীনে অং সান কাউন্সিল অব বার্মার চেয়ারম্যান হন। এ সময় দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। উইনস্টন চার্চিল অং সানকে বিদ্রোহী বিশ্বাসঘাতক হিসাবে আখ্যায়িত করেন। যদিও লর্ড মাউন্টব্যাটে জাপানীদের স্বাধীনতা লাভের
রাষ্ট্রিক পরিচয়ে অনেক রাষ্ট্রের নাম একাধিক হলেও মূল নামকে বহাল রেখেই অগ্রসর হচ্ছে।

যেমন ভারত/ইন্ডিয়া, ইংল্যান্ড/বৃটেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র/আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন/রাশিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্র বিভিন্ন নামে পরিচিতি গড়ে তুলেছে। আমাদের দেশ বঙ্গ,বাঙ্গালা, বাংলার পাশাপাশি ব্রিটিশরা বেঙ্গল নামে পরিচিতি দিয়েছিল। ১৯৪৭ সালে পূর্ব-পশ্চিমে বাংলা ভাগ হয়ে পূর্বাঞ্চল পূর্বপাকিস্তান নাম ধারণ করলেও এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ নামে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ইংরেজী বেঙ্গল নাম এখন অধুনালুপ্ত।

“অং সান হত্যাকান্ড যেভাবে”

মিয়ানমারের (বার্মা) জাতির পিতা অং সান ১৯১৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালের ১৯ জুলাই ইয়াঙ্গুনের সেক্রেটারিয়েট ভবনে নির্বাহী কাউন্সিল সভা চলছিল। সকাল সাড়ে দশটায় একদল সশস্ত্র আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য হঠাৎ সেক্রেটারিয়েট দেয়াল ভেঙ্গে সভাকক্ষে প্রবেশ করে। অং সান এবং মন্ত্রিসভায় ৬ সদস্যকে হত্যা করা হয়।

অং সানের ভাই মন্ত্রী, কেবিনেট সেক্রেটারি ও দেহরক্ষীও নিহত হন। বিরোধী দলের নেতা উ সও’র ফাঁসি হয়। কন্যা অংসান সূচি নোবেলে শান্তি জয়ী। ১৯৯০ সালে সামরিক সরকার এসে জাতির পিতার সবকিছু মুছে দিতে চাইলেও সে প্রয়াস বন্ধ হয়। অং সানের এক পুত্র অং সান রাজকীয় হ্রদে ডুবে মারা যায়। বড় পুত্র বোন অং সান সূচির রাজনীতির বিরোধী।

যদিও অং সান মিয়ানমারের পুতুল শাসক হিসাবে আর্বিভূত হন। আর নোবেল বিজয়ী সূচির শাসনামলে সে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয় রোহিঙ্গাদের। লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবতার মশাল জ্বালিয়ে দেন। বারবার তাগিদ দেয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনে সূচি সরকার কোনো আন্তরিকতা দেখায়নি। এরকম পরিস্থিতিতে সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশটিতে। সূচির দল জয়ী হলেও সেনাবাহিনী সে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে অং সান সূচিকেই ক্ষমতাচ্যুত করেছে। বিশ্বজুড়ে নিন্দার তোপের মুখে পড়লেও ভ্রুক্ষেপ করছে না সেনাবাহিনী। চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে আবারও এ বহুল আলোচিত সমালোচিত এ দেশটি।